সে ফাঁদে পা দেয় না ফটিক। পিছলে বেরিয়ে যায়। কিন্তু আশ্বাস দিয়ে রাখে। ফাঁকতালে মোটরের ইঞ্জিনটা মদনার কাছ থেকে ভালোমতো চিনে নিতে থাকে।
ফটিকের আসল জায়গা হচ্ছে তার মাসি। সারাদিন শুদ্ধাচার আর শুচিবাই। ঘরে গুরুর ছবি আছে–দিনের বেশিরভাগ সেখানে বসে থাকে। ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত এ সব হচ্ছে। মাসির সারাদিনের সঙ্গী। তবু ফটিক হচ্ছে মাসির বুকের পাঁজর। সারাদিন ফটিকের কথা ভেবে ভেবে সারা। ফটিক তাই নিশ্চিন্ত আছে।
কিন্তু নিশ্চিন্তে থাকতে দেয় না মাসির ভাগনে শ্রীপতি। কালো মতো ক্ষয়া চেহারা, বয়স চল্লিশ–টল্লিশ হবে, একসময়ে ঠিকাদারি করত, এখন কী করে কে জানে। অভাবী লোক, বড়। বদমেজাজি, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে একদা আত্মহত্যা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে-হাঁটতে সেই রামরাজাতলা পর্যন্ত চলে যায়। তারপর একটা নির্জন জায়গা দেখে রেল লাইনে গলা দিয়ে শুয়ে থাকে। কিন্তু কপাল খারাপ। আগে থেকে শুয়ে থাকার ফলে একটু ঘুমভাব এসে গিয়েছিল বুঝি। হঠাৎ ট্রেনের হুইশিলের শব্দে আঁতকে উঠে আঁ–আঁ করতে-করতে কেমন। হয়ে গেল, লাইন থেকে আর গলা তুলতে পারে না। বিশ গজ দূরে গাড়িটা থামিয়ে বদরাগি ড্রাইভারটা তেলকালি মাখা ভূতের মতো নেমে এসে ঘেঁটি ধরে যখন তুলল তাকে তখন সে বিড়বিড় করে বলছে, হ্যাঁ মরে গেছি। হ্যাঁ-হ্যাঁ নিশ্চয়ই মরে গেছি! ড্রাইভার সাহেব মুগুরের মতো হাতে দু-চারটে থাপ্পড় বসাতেই শ্রীপতি সজ্ঞানে আসে। তারপর সে কী দৌড়! তাই শ্রীপতির আর মরা হয়নি। জ্যান্ত শ্রীপতি তাই এসে মাঝে-মাঝে ফটিককে শাসায় কবে কাটছ বলো দেখি ফটিকচাঁদ? আমাকে জানো তো, সালকের এক নম্বর মস্তান হচ্ছে এই শ্রীপতি সমাদ্দার। ঘাড়ে ধরে বের করব যদি নিজে থেকে না-যাও। মাসির ওপরেও টং করে যায় সে-মামি, আমি কিন্তু উকিল মোক্তার করব না। ওই ফটকের যদি ভালো চাও তো ওকে পাঠিয়ে দাও দেশে। আমার মামার ভিটেয় কাউকে চেপে বসতে দেব না।
ফটিক এসব অবস্থায় ভারী অসহায় বোধ করে। ভাবে, এমন সুখের জায়গা ছেড়ে আবার বুঝি সত্যিই তাকে বর্ধমানের বাড়িতে ফিরে যেতে হয়। কিন্তু মাসির মুখের রেখায় নড়চড় হয় না। শ্রীপতি যেন সামনে নেই, এমনভাবে মাসি তাকে অগ্রাহ্য করে, ঘরের কাজ সারে। শ্রীপতি পাড়া মাত করে ফিরে যায়। ওই রোগা, ফরসা ছোট্ট, বুড়ি মাসির কোথায় যেন একটা ভারী জোর আছে। সেই জোরটা যেন সব সময়ে ঘিরে রাখে ফটিককে। তাই একদিন শ্রীপতি এলে ফটিক তাকে উলটে শুনিয়ে দেয়–ভারী তো মাস্তান, ইঞ্জিনের ড্রাইভার চড়িয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছিল। আবার মাস্তান!
–তবে রে আট আঙুলে, অলক্ষুণে। বলে তেড়ে আসে বটে শ্রীপতি, কিন্তু সহসা উদ্যত হাত থামিয়ে কেবল তড়পাতে থাকে। মারে না। ঠিক সাহস পায় না বোধ হয়।
মাসির কী বা আছে! অল্প কিছু জমি, সামান্য টাকা, কিছু সোনাদানা। তার ওপরেই সকলের চোখ। মাসিই কেবলমাত্র উদাসীন। এ তত্বটা বুঝতে পারে ফটিক। নিজের ওপর ঘেন্না হয় মাঝে মাঝে। সেও তো ওই ভরসায় আছে।
হারাধনের কালীর স্থানে সেদিন প্রণাম সেরে বেরিয়েই যদু মোক্তারের সঙ্গে দেখা। বুড়ো হাড়ে হারামজাদা, রোগা খিটখিটে চেহারা, চোখে বুদ্ধির চিকিমিকি। ফটিককে দেখে বলে কী বাবা ফটিক, শুনেছ?
–কী?
–তোমার বাড়া ভাতে ছাই। মাসি যে সম্পত্তি সব দেবোত্তর করে দিল। কথাটা বিশ্বাস হয় না ফটিকের। চেয়ে থাকে। বুড়ো তার মুখের দিকে ভারী খুশি–খুশি ভাবে চেয়ে থাকে। কারও কোনও গর্দিশ হলে যদু মোক্তারের ভারী আনন্দ। বলে–তোদের বাড়ি থেকেই আসছি উইলে সাক্ষী দিয়ে। তোর মাসির ভিটেয় গুরুর মঠ হবে। এবার নিজের রাস্তা দ্যাখ।
কথাটা মাসিকে মুখোমুখি জিগ্যেস করতে লজ্জা পায় ফটিক। মাসিও যেচে কিছু বলে না। মনটা ভারী দমে যায় তার। চার বছর বয়স থেকে মাসির কাছে সে এত বড়টি হল। সবাই জানে, সে মাসির ছেলের চেয়েও বেশি। আট আঙুলের ফটিককে মাসি কত স্নেহে ভালোবাসায় দশ আঙুলের মানুষের মতে সবকিছু শিখিয়েছে। তবে মাসির এটা কীরকম ব্যবহার?
হারাধনের কাছে দুঃখ করে ফটিক–এমনটা হবে জানলে কোনও শালা এসে এতকাল পড়ে থাকত!
–দুঃখ করিস না ফটিক। মঠ যদি হয় তো, মাসিকে বল আমায় যেন সেবাইত করে। তোরটা পুষিয়ে দেব।
মদনা ফটিককে ধরে বলে–তখনই বলেছিলুম, কদমতলার জায়গাটা দুজনে নিই আয়, কাঁচা পয়সা লুটে নিতাম।
খবর পেয়ে শ্রীপতিও আসে। ফটিকের সঙ্গে দেখা হয় চৌরাস্তায়। নরম গলায় বলে–বুড়ির মাথাটাই গেছে বিগড়ে। দেবোত্তর আবার কীরে! না হয় তোর নামেই থাকত সম্পত্তি, আমরা দু ভাইয়ে ভোগ করতুম? হাজার পঞ্চাশেক নগদ, সোনাদানা মিলে আরও ধর হাজার ত্রিশ-চল্লিশ ইস ভাবা যায় না!
ভাবতে-ভাবতে নিজের আট আঙুলের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলে ফটকে। দিনরাত লোকজন তার কানমন্তর দিচ্ছে। মাথা ক্রমে গরম হয়ে যায়। বুঝতে পারে, মাসি তাকে সবচেয়ে বড় ধাপ্পাটা দিয়েছে। ফটিক তাই রাগে–রাগে বাসাতেই থাকে না বড় একটা। সকালে বেরোয়, রাত করে ফেরে। মনের মধ্যে একটা পাখি কেবল কু-ডাক ডাকে।
.
বারান্দায় একা বসে ভাগবত পড়ছে মাসি। সামনে পিদিম। ননীচোরা কৃষ্ণের মুখ ফাঁক করে মা যশোদা দেখছেন সত্যিই খেয়েছে কি না কৃষ্ণ। ওমা কোথায় ননী! মা যশোদা দেখেন, কৃষ্ণে মুখের মধ্যে বিশ্বরূপ। রাত হয়েছে। ফটিক এইবার ফিরবে। মাসি টের পায়, চরাচর নিঝুম। ভাগবত পাঠের শব্দ যতদূর যায় ততদূর বড় পবিত্র। কত পোকামাকড় কাছে আসে, কত সাপখোপ। ওই শব্দ সবাইকে টেনে আনে কাছে। আজও এসেছে। চোখ না তুলেও টের পায় মাসি। সিঁড়ির মুখে উঠে এসেছে দুটি দীর্ঘ দেহ। নিস্পন্দ পড়ে আছে। শুনছে। কারও ক্ষতি করে না। কিন্তু গায়ে পা পড়লে? ফটিক এ সময়েই ফেরে। পিদিমের আলোয় যদি দেখতে না পায় সাপ দুটোকে? আজ কৃষ্ণপক্ষ, বাইরেটা বেজায় অন্ধকার।
