অনিলবরণ হারমোনিয়ামে সুর ধরে রেখে নীচু স্বরে বলল –ফটকে, ঘিঁষে মার।
তা ফটিক ঘিঁষে মারল। বাঁয়াতে দিব্যি পরিপাটি কাজ দেখায় সে। মুখে হাসি। অনিলবরণ গেয়ে উঠে তার পিঠ চাপড়ে দিল–বেশ বাজিয়েছিস।
তা ফটিকের আটকায় না। মাসির ছানি কাটার পর আজকাল সে-ই জামাকাপড়ের ফাটাফুটো উঁচ সুতোয় সেলাই করে, ছেঁড়া বোতাম বসিয়ে নেয়। বুড়ো আঙুল ছাড়াই সে দিব্যি উলও বুনতে পারে। তর্জনী আর মাঝের আঙুলে কলম চেপে ধরে সে গোটা–গোটা অক্ষরে লেখালেখি যা চালায়, কে বলবে সেই হাতের লেখা বুড়ো আঙুল ছাড়াই লেখা হয়েছে। পাড়ায় সে হচ্ছে একটা উদাহরণ। দু-আঙুল কমতি ফটকে যা পারে তা বাড়তি দু-আঙুলের লোকেরা পারে না।
উদাহরণ আরও আছে। পঞ্চাননতলার হারাধন। কোমরের নীচের অংশটুকু শুকিয়ে কুঁকড়ে এইটুকু। হারাধন হাঁটে হামাগুড়ি দিয়ে। হাঁটুতে দড়ি দিয়ে বাঁধা চামড়ার একটু গদি, দুহাতে একজোড়া কাঠের খড়ম, ভিড়ের রাস্তায় এঁকেবেঁকে অনায়াসে চলে যায় সে। আটকায় না। কুকুর বেড়াল যদি চার পায়ে বিশ্বসংসার চষতে পারে তবে হারাধনই বা পারবে না কেন? হারাধন। বাজার করে, দোকানে সওদা করে, দোতলার সিঁড়িও দরকার মতো ভাঙতে পারে। বেঁচে থাকা মানেই হচ্ছে কম্পিটিশন।
নানা ধান্ধায় ঘুরেটুরে অবশেষে হারাধন গত বারো বছর যাবৎ তার বাড়িতে এক কালীমন্দির দিয়েছে। ভারী জাগ্রত কালী। হাফ প্যান্টপরা হারাধন গায়ে একটা পাটের চাদর জড়িয়ে পুজো করতে বসে। বেলা দশটায় শুরু হয় তার জনসংযোগ। একটা একসারসাইজ বুক খুলে পেনসিল হাতে বসে থাকে। খাতায় কয়েকটা খোপ কাটা। সেইসব খোপে বিচিত্র অঙ্ক লেখা আছে। তার রোগা–টোগা বুড়োমানুষ বিধবা মা ছেলের পিছনে এসে হাতজোড় করে বসে থাকে তখন।
লোকজন এলে তাদের সমস্যার কথা শুনে টুনে হারাধন গম্ভীরভাবে চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়, এক সময়ে হঠাৎ আস্তে-আস্তে ডাকতে থাকে–মা, মাগো, ও মা। সে ডাক তার আসল মাকে নয়, কালীকে। হাতের পেন্সিল যেন স্বপ্নের ঘোরে সরতে–সরতে একটা ঘরে গিয়ে স্থির হয়। এসেছে, মা এসেছে। হারাধন তখন এমনভাবে কথাবার্তা শুরু করে যেন টেলিফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে। বলে–তা হ্যাঁ মা, এই জয়চরণদার বড় বিপদ, একবার এদিকে বেড়াতে–বেড়াতে আসবেন নাকি? সময় কি হবে মা? ওপার থেকে কালী কী বলেন, তা এ পাশের সাধারণ শুনতে পায় না, কিন্তু হারাধন শোনে ঠিকই। বলে–এই ধরুন কাল রাত দশটা–এগারোটা নাগাদ মিনিট পনেরোর জন্য কি সময় হবে মা! হবে আচ্ছা মা, তবে ওই কথাই রইল। এবং তখন চোখ খুলে আসল মার দিকে চেয়ে হারাধন গম্ভীর হয়ে বলে–শুনলে তো? কাল রাত দশটা এগারোটার মধ্যে মা আসবেন। তার মা তখন ভারী আতঙ্কিত হয়ে বলে–তাহলি তো পুজোর জোগাড় করতি হয়। হারাধন অবজ্ঞাভরে জয়চরণের দিকে চেয়ে বলে–তাহলে, খরচাপাতি ইত্যাদি।
আট-আঙুলের ফটকের সঙ্গে হারাধনের ভারী ভাব। যাতায়াতের পথে ফটকে হারাধনের জাগ্রত কালীর স্থানে একবার মাথা ঠুকে যায়। সময় থাকলে বসেও পড়ে। হারাধন তার দুটো কমতি আঙুলের হাতদুখানার দিকে চেয়ে বলে–জন্মের দোষ বুঝলি?
ফটকে মাথা নাড়ে–আর তোমারটা?
–এ হচ্ছে ক্ষণের দোষ। টাইফয়েড না হলে–একটা শ্বাস ফেলে বলে–সবই মায়ের ইচ্ছে। তিনিই পা ভেঙে আটকে রেখেছেন তাঁর কাছে, নইলে হয়তো পিছলে যেতুম।
তবু কারও কিছু আটকে থাকে না। হারাধনেরও দিন চলে। ফটিকেরও। হারাধন মাঝে-মাঝে ডেকে বলে–মন্তর নিবি নাকি, ও ফটিক?
ফটিক রাজি। কিন্তু মাসি রাজি নয়। অল্পবয়স থেকে ব্রহ্মচর্য করে-করে মাসি ভারী জেদি আর তেজি হয়ে গেছে। বলে–পঞ্চাননতলার হারু দেবে মন্তর! ওম্মাগো! ঠাকুরদেবতার নামে। কিছু বলতে নেই, হারাধনের কালীমায়ের পায়ে গড়। কিন্তু ও কি মন্তর দেবে খ্যাপা? ন্যালাহাবলা, কুচুটে। খবরদার, ও কথা মনেও ঠাঁই দিবি না। সব নিংড়ে নেবে।
ফটিক তাই রাজি হয় না। হারাধন দুঃখ করে বলে–শেষতক লরি চালাবি ছোট লোকদের মতো! আমারই হয়েছে বিপদ! আমার সব মন্তরতন্তর, তত্বের সব গুহ্যকথা, মন্ত্রগুপ্তি–এগুলো কাকে দিয়ে যাই!
–তোমার তো অনেক শিষ্য!
কথাটা মিথ্যে। বস্তির কিছু হাঘরে, কয়েকটা রেলকুলি, আর দু-চারজন ছাতুওয়ালাকে ধরে মন্তর দিয়েছে বটে হারাধন, কিন্তু সংখ্যায় তারা বড়জোর পঁচিশ–ত্রিশ হবে কুড়িয়ে বাড়িয়ে। তবু হারাধন কথাটা শুনে খুশি হয়। বলে–তা অনেক শিষ্য বটে, কিন্তু মানুষ কটা? এই তো সেদিন লালুবাবু মন্তর নিতে এল, পয়সাওয়ালোক, বড়বাজারে পাইকারি রুমালের কারবার–কিন্তু হলে কী হয়! পলকা গেলাসে কড়া মদ ঢাললে যেমন ফেটে যায় চড়াক করে, এও হচ্ছে তাই। আধার দেখে বুঝলুম চলবে না। মন্তর কানে ঢুকতে–না-ঢুকতেই দড়াম করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। আর উঠবে না। একটা কমজোরি মন্তর জপ করতে দিলুম, আসল মন্তর নেওয়ার লোক কই রে? তোকে দেখেই বুঝেছি, এই হচ্ছে আসল আধার। আমার সব সাধনটাধন ধরে রাখতে পারবে।
ফটিককে ভালোবাসে সবাই। মদনাও। চাটুজ্জেদের গাড়িটায় মদনাই তাকে সুযোগ বুঝে তুলে নেয়, এটা ওটা শেখায়। বলে–আট আঙুলে তোর যা এলেম। বুঝলি, আমার ইচ্ছে একটা গাড়ি সারাইয়ের কারখানা করি। কাঁচা পয়সা। তোর মাসি যদি কিছু ছাড়ত, কদমতলায় রাস্তায় মোড়ে একটা ভালো স্পট দেখে রেখেছি। দুজনে মিলে কারখানা চালাতাম। চাকরি করে আর কটা পহা?
