রাস্তাঘাট কিছু দেখা যায় না। ঝুপুস করে জলে পা দেয় নিশিকান্ত। দোলের দিনে যেমন ছোঁড়ারা রঙের বেলুন ছুঁড়ে মারে আর সেটা ফটাস করে ফাটে, তেমনি আকাশঠাকুর ছুড়ছে তার বিদঘুঁটে বেলুন সব। নিশিকান্তের শরীরে অ্যাই বড়-বড় ফোঁটা ফাটছে। নামতে না নামতেই ভিজিয়ে একশা করে দিল। দৌড়ে গিয়ে সামনের দোকানটায় উঠে দাঁড়ায় সে। বৃষ্টির রকমটা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাসটা তাকে ফেলে ইস্টিমারের মতো চলে গেল। কোমরের কাপড়ের মধ্যে শতপাল্লার ভাঁজে সাবধানে বিড়ি আর দেশলাই মুড়ে রেখেছে। দোকান ঘরের বেঞ্চটায় বসে কোমরের কাপড় আলগা দিয়ে নিশিকান্ত বিড়ি দেশলাই বের করে আনে। চায়ের দোকানদার তার দিকে বিরক্তির চোখে চায়। তার গা বেয়ে জল নেমে বেঞ্চ ভিজছে। নিশিকান্ত যে খদ্দের নয় একথা দোকানি জানে।
বিড়িটা জখম হয়ে গেছে। নিশিকান্ত দুধারে ফুঁ দিয়ে টিপেটুপে দেখে তারপর নিরাসক্ত গলায় বলে–আগুনটা দাও তো।
সামনে উনুন জ্বলছে, খামোকা দেশলাইয়ের একটা কাঠি নষ্ট করে কোন বুরবাক। দোকানদার অবশ্য গা করে না। তাই নিশিকান্ত উঠে বিড়িটা কেটলির পাশ দিয়ে উনুনে খুঁজে দেয়। ধরিয়ে আবার জুত করে বসে। তাড়া নেই। মহেন্দ্র দর্জির দোকানে আধবোতল চুয়া রাখা আছে, গতকাল মহেন্দ্র কলকাতা থেকে এনে রেখেছে, আজ নিয়ে যাওয়ার কথা। এই বৃষ্টি বাদলায় সে কাজটা নিশিকান্তকে দিয়ে না করালেই চলছিল না বউমণির। নিশিকান্ত বসে থাকে–এটা তার সহ্য হয় না। আজ দুপুরের কথাই ধরা যাক। এমন বাদলায় কার যে ডাব খেতে ইচ্ছে করে তা জন্মে জানে না নিশিকান্ত, কিন্তু বউমণির করল। তিনদিন রাতে খিচুড়ি খেয়ে খেয়ে নাকি ধাত গরম হয়েছে। বৃষ্টি মাথায় সাঁই–সাঁই বাতাসের মধ্যে নিশিকান্তকে উঠতে হল গাছে। ভিজে–ভিজে পিছল হয়ে ছিল গাছ। পা হড়কে কয়েক হাত নীচে পড়েছিল সে। ঘষটানিতে বুকের নুনছাল উঠে গেছে খানিক। এখনও জ্বালা করছে। দুটো বোঁটা আলগা ঝানু ডাব খসে পড়েছিল। লুকিয়ে নিশিকান্ত সে দুটোর মুখ কেটে ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে লেইটাকে জলের সঙ্গে মিশিয়ে। দিয়েছিল। লেই মেশানো ডাবের জল মিষ্টি ঘোলাটে একটা শরবতের মতো হয়ে যায়, তার ভারী স্বাদ। সেই শরবত খেয়ে খোলা দুটো ছুঁড়ে পুকুরে ফেলেছিল সে। তারপর বাবলা তলায় দাঁড়িয়ে দেখে পুকুরের ছাপানো জলে ভেসে-ভেসে ডুবন্ত মানুষের দুটো মাথার মতো কোন দেশান্তরে চলে গেল। এই ঝাঁপসা বৃষ্টির বেলায় পৃথিবীটা কত ছোট্টটি হয়ে এসেছে, তবু কালো মেঘের ছায়ায় এখনও কত নিরুদ্দেশ হওয়ার মতো জায়গা আছে। জল থেকে খুদে মাছ উঠে আসছিল, বাবলাতলায় কই মাছ বেয়ে উঠে এসেছে, ভেজা গাছের ডালে বসে কাক খাখা করে। নিশিকান্তর। তখন কত কী মনে পড়ি–পড়ি করে। কিন্তু আদতে কিছু তেমন মনে পড়ে না তার। নিশিকান্তর ওই হচ্ছে রোগ।
অন্ধকারে টর্চ বাতি জ্বেলে চলার মতো নিশিকান্তর অবস্থা। টর্চ বাতির যেটুকু আলো হয় সেটুকু গোলপানা আলোয় একটুখানি দেখা যায় মাত্র। সামনেও হাঁ করা অন্ধকার পিছনেও হাঁ করা অন্ধকার। অর্থাৎ নজর চলে না নিশিকান্তর হাতেও তেমনি এক টর্চ বাতি ধরিয়ে অন্ধকার দুনিয়ার দিগদারিতে পাঠিয়ে দিয়েছে কে। যেমন তার বিস্মরণ তেমনি তার ভবিষ্যৎ চিন্তা। ভাবতে বসলেই নিশিকান্তর কাছে তার জীবনটা এক ঝাঁপসা বাদলদিনের মতো লাগে, পৃথিবীটা ছোট্টটি হয়ে যায়। নজর চলে না বহুদূর পর্যন্ত। কে তার বাপঠাকুরদা, কোথায় তার বাড়ি ঘর, কী তার জাত গোত্র এ নিশিকান্তর জানা নেই। লোকে বলে সে হল হাবাগোবা মানুষ। তাই হবে। তবু নিশিকান্ত খুব ভাবতে ভালোবাসে। যেমন সেই ডাবের খোলা দুটো কোথায় হারিয়ে গেল, কোন বিশাল বিশ্বসংসারে চলে গেল ডুবন্ত মানুষের মতো ডাব দুটো তা নিশিকান্ত ভাবতে বসে।
ট্যাঁকে চুরি করা দুচার পয়সা তার থাকেই। হঠাৎ চায়ের একটা দমকা গন্ধ আর সেই সঙ্গে হাওয়ায় উনুনের একটু তাপ উড়ে এসে গায়ে লাগতেই নিশিকান্ত নড়েচড়ে বসে। তারপর তাচ্ছিল্যের গলায় বলে দাও তো এক ভাঁড় তোমার চা। খেয়ে দেখি।
দোকানদার উনুনটা খুঁচিয়ে একটু আঁচ তুলছিল। একটা ডেকচিতে আলু পেঁয়াজ কুঁচিয়ে রেখেছে, বোধহয় এক্ষুনি কেটলি নামিয়ে রাতের রান্নাটা সেরে রাখত। নিশিকান্তর কথা শুনে ফিরে তাকাল, তারপর চায়ের গুঁড়ো ঢালতে লাগল খয়েরি ন্যাকড়া–দেওয়া ছাঁকনিতে।
নিশিকান্ত বেঞ্চ থেকে উনুনের ধারটিতে আগুনের তাপে তেতে–ওঠা চৌহদ্দির মধ্যে এসে উবু হয়ে বসে। অল্প অল্প করে চায়ে চুমুক মারে, গরম ভাঁড়টা মাঝে-মাঝে চেপে ধরে ঠান্ডা গালে। কিছুই মনে পড়ে না, তবু কত কী যে মনে পড়ি–পড়ি করে তার। আধবোতল চুয়ার জন্য পলতাবেড়ে থেকে মাইল দেড় হেঁটে শিবগঞ্জ বাগনানের বাস ধরে সে যে এতটা পথ এসেছে এই বাদলায়, তাতে তার ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। এ সময়টায় ঘরে থাকলে তাকে বউমণি টোকার সঙ্গে হয়। মাছ ধরতে পাঠাত, নয়ত সাঁজাল দিতে। কিছু একটা করাতই। কিন্তু বাদলায় দোক্তা ফুরিয়েছে। বিকেলের আগে তামাক পাতা সেঁকা হয়েছে, ভাজা হয়েছে ধনে আর মৌরি। বিপিনবিহারী হামানদিস্তা নিয়ে বসেছে, দুমদাম শব্দে গুড়ো করছে সব। চুয়া মিশিয়ে বউমণি খাবে। ভাজা মশলার মাতাল মিঠে গন্ধে বর্ষার ছাতকুড়োপড়া গন্ধটা চাপা পড়েছে। কিছু গন্ধ আছে ভালোবাসার, যেমন গন্ধ গোলাপে, বক–ফুলের ভাজা বড়ায়, সোঁদা–স্যাঁতা মাটিতে। আবার কিছু নেশাডু গন্ধ। যেমন গন্ধ কেয়াফুলে, কিশোরীর ঘেমো শরীরে, ভাজা দোক্তাপাতায়। এমন কত গন্ধ যে হঠাৎ উড়ে আসে। তুলসীতে আর চন্দনে এক রকম ভগবানের গন্ধ আছে। পুরোনো পুঁথির পাতায় পাওয়া যায় কতকালের মন কেমন করা গন্ধ। সব গন্ধ ঠিক ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। এই বর্ষার গন্ধটা যেমন। বড্ড মন খারাপ করে দেয়।
