শ্মশানে গেলে স্নান করতে আসতে হবে। শেষ রাতের শীতে হিম বাতাস লাগবে শরীরে। ডাক্তার ঠান্ডা লাগাতে বারণ করেছিল।
বুদ্ধিরাম একটু হাসল। সে রেলরাস্তায় গলা দিতে গিয়েছিল। মরণকে তার ভয়টয় নেই। একভাবে না একভাবে তো যেতেই হবে।
কান্নাকাটির মধ্যেই কিছু লোক বাঁশ–টাশ কাটতে লেগেছে। দড়িদড়া এসে গেছে। বুদ্ধিরাম একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। কিছুই দেখার নেই অবশ্য।
মোড়লদের মধ্যে শলা–পরামর্শ হচ্ছে। সেই দলে বুদ্ধির বাপ জ্যাঠাও আছে। অন্য ধারে গাঁয়ের অল্পবয়সি ছেলেরা কোমরে গামছা বেঁধে তৈরি।
আচমকাই–একেবারে অপ্রত্যাশিত, আদুরিকে দেখতে পেল বুদ্ধিরাম। উত্তরের ঘরের দাওয়ায় তিন-চারজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিল, সেই দলে বুদ্ধির জ্যাঠাইমাও। আদুরি হঠাৎ ঘর। থেকে বেরিয়ে এসে সোজা বুদ্ধির দিকে তাকাল। গত দশ বছরে বোধহয় প্রথম।
বুদ্ধি একটু হতবুদ্ধি হয়ে গেল। না, ভুল দেখছে না। হ্যাজাকের আলো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। বাপের মড়া উঠোনে শোওয়ানো। তবু আদুরি সোজা তার দিকেই চেয়ে আছে। একেবারে নিষ্পলক।
আজ বুদ্ধিরামই চোখ সরিয়ে নিল। তারপর আড়ে-আড়ে চাইতে লাগল। মেয়েটার হল কী?
আদুরি তার জ্যাঠাইমার কানে কানে কী যেন বলল । তারপর একটু সরে দাঁড়াল। আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে নরম ভঙ্গিতে খুঁটিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। তাতে যেন ভারী ফুটে উঠল আদুরি। কী যে দেখাচ্ছে।
জ্যাঠাইমা হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছিল।
বুদ্ধিরাম অগত্যা গিয়ে বলল , কী গো জ্যাঠাইমা?
মড়া ছুঁয়েছিস নাকি?
না। তবে এবার তো ছুঁতে হবেই।
কাজ নেই বাবা। বাড়ি যা। গায়ে গঙ্গাজল আর তুলসীপাতা ছিটিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়। তোকে শাশ্মশানে যেতে হবে না।
কেন?
কেন আবার। ক’দিন আগে কী অসুখটা থেকেই না উঠলি। ঠান্ডা লাগলে আর বাঁচবি নাকি?
আমার কিছু হবে না জ্যাঠাইমা, ভেবো না।
কেন, তোরই বা যেতে হবে কেন? শ্মশানে যাওয়ার কি লোকের অভাব? কত লোক জুটে গেছে। আদুরি মনে করিয়ে দিল, তাই। যা বাবা, ঘরে যা।
আর-একবার শুনতে ইচ্ছে করছিল, বলল , কে মনে করিয়ে দিল বললে?
আদুরি অদূরে দাঁড়িয়ে সব শুনতে পাচ্ছে। নড়ল না।
জ্যাঠাইমাও আর তাকে আমল না দিয়ে অন্য মহিলাদের সঙ্গে কথা কইতে লাগল।
বুদ্ধিরাম ধীরপায়ে ছেলে ছোঁকরাদের দঙ্গলটার কাছে এসে দাঁড়াল।
বুদ্ধিদা, যাবে তো!
তা গেল বুদ্ধিরাম। মড়া কাঁধে নেচে–নেচে গেল। বহুকাল পরে তার এক ধরনের আনন্দ হচ্ছিল আজ। না, প্রতিশোধ নেওয়ার আনন্দ নয়। প্রতিশোধের মধ্যে কোনও আনন্দ নেই। আজ তার আনন্দ হচ্ছিল একটা অন্য কারণে। ঠিক কেন তা সে বলতে পারবে না।
মড়া পুড়ল। বুদ্ধিরাম কষে স্নান করল নদীর পাথুরে ঠান্ডা জলে। দুনিয়ার একজনও অন্তত তার অসুখটার কথা মনে রেখেছে, এখন আর মরতে বাধা কী!
ভেজা গায়ে যখন উঠে এল বুদ্ধিরাম তখন শেষ রাতের হিম বাতাসে সে থরথর করে কাঁপছিল। সবাই কাঁপছে। কিন্তু তাঁর কাঁপুনিটা আলাদা। লোকে বুঝতে পারল না। শুধু বুদ্ধিরামের নিজের ভিতরে যে নানা ভাঙচুর হচ্ছিল তা নিজেই টের পেল সে।
হোঁৎকা সতীশ কাছেই দাঁড়িয়ে গামছা নিংড়োচ্ছিল। হঠাৎ কী খেয়াল হতে বুদ্ধিরামের দিকে ফিরে বলল , হ্যাঁরে বুদ্ধি, তুই যে বড় স্নান করলি?
করব না তো কী?
সতীশ মুখে একটা চুকচুক শব্দ করে বলল , তোর না কী একটা অসুখ হয়েছিল ক’দিন আগে।
কে বলল তোকে?
সতীশ গামছাটা ফটাস–ফটাস করে ঝেড়ে নিয়ে মাথা মুছতে-মুছতে বলল , বেরোবার মুখে আদুরি এসে ধরেছিল আমায়। বলল বটে, রাঙাদা, বুদ্ধিরামের কিন্তু শরীর ভালো নয়। হিমজলে স্নান করলে মরবে। ওকে দেখো।
বুদ্ধিরাম কোনও কথা বলল না। গলার কাছে একটা দলা আটকে আছে। চোখে জল আসছিল।
সতীশ গা মুছতে মুছতে বলল , তোর আক্কেল নেই? কোন বুদ্ধিতে এই সকালে স্নান করলি?
দূর শালা! আজই তো স্নানের দিন। আজ স্নান করব না তো কবে করব?
বৃষ্টিতে নিশিকান্ত
কেচ্ছাকেলেঙ্কারির মতো বৃষ্টি হচ্ছে কদিন। জলের ফোঁটা লক্ষ অবুদ গুড়ুলের মতো ছুটে আসে আকাশ থেকে, মাটি খুঁড়ে বসে যায় ভিতরে। গায়ে লাগলে ফটাস করে ফাটে। ব্যথা পায় নিশিকান্ত। আদিঅন্ত সাদা হয়ে আছে, শীতের কুয়াশার মতো, কিছু নজর চলে না। আর সেই সাদাটে ভাবের আবডালে কী যে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড হচ্ছে কে জানে! উলটে পালটে যাচ্ছে জগৎসংসার। সেই কেচ্ছাকেলেঙ্কারির কথাই বৃষ্টির শব্দে ছড়িয়ে যাচ্ছে, ফিস ফাস গু জ্বর গুজুর। ওই বৃষ্টির আবডালে আবার জগৎসংসার যে থেমে আছে এমনও নয়। বেলপুকুরের বাজারে মহেন্দ্রর দর্জির দোকানে মেশিন চলছে খরখর শব্দে। মুদির দোকানে দু-চারজন কাকভেজা লোক সওদা করছে। আলু পেঁয়াজ নিয়ে ভূপেন বসেছে ভুষিওয়ালার বারান্দায়। দোকান সব একটু আধটু ফাঁক করে কাজকর্ম চলছে ঠিকই। কিন্তু সেটা বোঝা যায় না। বৃষ্টির রকম দেখে মনে হয় মানুষজন বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সব। দুনিয়ায় আর মানুষ মাটির চিহ্ন রাখবে না।
বাগনানের বাস কখন বন্ধ হয়ে যায় কে জানে। এখনও চলছে। নিশিকান্ত অন্ধকার বিকেলবেলায় বেলপুকুরে নেমে পড়ে বাস থেকে। গায়ে ফতুয়া, পরনের ধুতিখানা উরুত পর্যন্ত তোলা। ছাতাখানা বগলদাবা করেই নামে। এই বাতাস বৃষ্টিতে ছাতা খুলতে ভয় করে তার। ফটাস করে উলটে গিয়ে পুরোনো ছাতার শিকটা ছরকুটে যাবে। অবশ্য ছাতা খুলতে তাকে কখনও দেখেওনি কেউ।
