চা–বিস্কুটও যে জোটেনি তা নয়। সে গাঁয়ের ভালো ছেলে। খাতির একটু লোকে করেই। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে যাওয়া সেদিকে কিছুই এগোল না।
কিছুদিন পর সে বুঝল, এভাবে আদুরির কাছে এগোনো যাবে না। মহিলা মহলে ঢুকতে হবে। তা তাতেও বাধা ছিল না। আদুরিদের অন্দরমহলেও ঢুকতে সে পারে। আদুরির এক বউদি হঠাৎ মুখ ফসকে বলে ফেলল, হ্যাঁ গো বুদ্ধি ঠাকুরপো, কোনওকালে তো তোমাকে এ বাড়িতে যাতায়াত করতে দেখিনি তোমার মতলবখানা কী খুলে বলো তো! আমার তো বাপু, তোমার। মুখচোখ ভালো ঠেকছে না।
এ কথায় আর এক দফা অপমান বোধ করল বুদ্ধিরাম। সে পুরুষ মানুষ কোনও লজ্জায় মা মাসি বউদি শ্রেণির মেয়েদের সঙ্গে বসে গল্প করে?
সুতরাং বুদ্ধিরামকে জাল গোটাতে হল। তারপরই আবার বিপদ। আদুরির ফের সম্বন্ধ এল। চেহারাখানা ভালো, কিছু লেখাপড়াও জানে, সুতরাং আদুরিকে যে দেখে সে-ই পছন্দ করে যায়।
দ্বিতীয় পাত্রপক্ষকেও বেনামা চিঠি দিতে হল। ভেঙেও গেল বিয়ে। কিন্তু তাতে বুদ্ধিরামের যে কাজ খুব এগোল তাও নয়। বরং উলটে একটা বিপদ দেখা দিল। কেউ যে বেনামা চিঠি দিয়ে আদুরির বিয়ে ভাঙছে এটা বেশ চাউর হয়ে গেল। লোকটা কে তার খোঁজাখুঁজিও শুরু হল। তৃতীয়বার যখন আদুরিকে পছন্দ করে গেল আর-এক পাত্রপক্ষ তখন আদুরির বাপ জ্যাঠা পাত্রপক্ষকে বলেই দিল, বেনামা চিঠি যেতে পারে, আমল দেবেন না। কোনও বদমাশ লোক করছে এই কাজ।
খুবই ভয়ে ভয়ে রইল বুদ্ধিরাম। কেউ ভরসা দিয়ে বলল , আরে ঘাবড়াচ্ছিস কেন? এমন কলঙ্কের কথা লিখে দেব যে, পাত্রপক্ষ আঁতকে উঠবে।
কিন্তু এই তৃতীয়বার বুদ্ধিরাম ধরা পড়ে গেল। আদুরির সাত সাতটা গুন্ডা ভাই একদিন বাদামতলায় চড়াও হল তার ওপর। সতীশটা মহা ষণ্ডা। সে-ই সাইকেল থেকে টেনে নামাল বুদ্ধিরামকে।
বলি, তোর ব্যাপারটা কী?
কীসের ব্যাপার?
ন্যাকা! আদুরির বিয়ে ভাঙতে চিঠি দেয় কে?
আমি না।
তুই ছাড়া আর কে দেবে!
আমার কী স্বার্থ?
মেজবউদি বলছিল তুই নাকি আমাদের বাড়িতে ঘুরঘুর করতিস!
বুদ্ধিরাম বুদ্ধি হারিয়ে ফেলছিল। সত্য গোপন করার অভ্যাস তার নেই। গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলা তার আসেও না। সে আমতা-আমতা করতে লাগল।
সতীশ অবশ্য মারধর করল না। বলল , যদি আদুরিকে বিয়ে করতে চাস তো সে কথা বললেই হয়। গাঁয়ে তোর মতো ছেলে ক’টা? আর যদি নিতান্তই বদমাইসির জন্য করে থাকিস তাহলে…
বুদ্ধিরাম কেঁদে ফেলেছিল। একটু সামলে নিয়ে বলল , বিয়ে করতে চাই।
শাবাশ বলে খুব পিঠ চাপড়ে দিল সতীশ। বলল , একথাটা ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মতো হল। আগে বললেই ব্যবস্থা হয়ে যেত।
কিন্তু ব্যবস্থা হল না। পরদিনই সতীশ এসে তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল , মুশকিল কী হয়েছে জানিস? তোর ওপর আদুরি মহা খাপ্পা। কী করেছিলি বল তো!
সব শুনেটুনে সতীশ বলল , আচ্ছা, চুপচাপ থাক। দেখি কী করা যায়! বলা পর্যন্তই। সতীশকিছু করতে পারেনি। চিড়ে ভেজেনি। কিন্তু এরপর থেকে আদুরির আর সম্বন্ধ আসত না। এলেও আদুরি বেঁকে বসত।
এ সবই সাত-আট বছর আগেকার কথা। এই সাত-আট বছরে বুদ্ধিরাম আড়াল থেকে আদুরির উদ্দেশে তার সব অস্ত্রশস্ত্র প্রয়োগ করেছে। প্রতিবার পুজোয়ে শাড়ি পাঠায়, টুকটাক উপহার পাঠায়, কোনওটাই আদুরি নেয় না। নিলেও ফেলে টেলে দেয় বা অন্য কাউকে দান করে।
কিন্তু বয়স তো বসে নেই। আদুরির বিয়ের বয়স পার হতে চলল। বুদ্ধিরামও ত্রিশ পেরিয়েছি। কোনও দিকেই কিছু এগোল না। আদুরির কপাট বজ্র আঁটুনিতে বন্ধই রইল।
ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে সাইকেলে ঠেলে নিয়ে যেতে-যেতে এসব কথাই ভাবছিল বুদ্ধিরাম।
বড় রাস্তায় উঠে সে সাইকেলে চাপল। পাঞ্জাবির পকেটে ভারী শিশিটা ঝুল খাচ্ছে। কষ্ট করাই সার হল। কোনও মানে হয় না এর।
গাঁয়ে ঢুকবার মুখে বাস রাস্তায় কয়েকটি দোকান। আঁধার হয়ে এসেছে। টেমি জ্বলছে। দোকানে দোকানে। মহীনের চায়ের দোকানে দু-চারজন বসে আছে। ষষ্ঠী হাঁক মারল, কে রে! বুদ্ধি নাকি?
বুদ্ধি নেমে পড়ল। সাইকেলটা স্ট্যান্ডে দাঁড়ি করিয়ে বসে গেল। একটু ঠান্ডা–ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে এখন। এক ভাঁড় চা হলে হয়।
ষষ্ঠী একটু বেশি কথা কয়। নানা কথা বকবক করে যাচ্ছিল। সে একটু তেলানো মানুষ। যাকে দেখে তাকেই একটু-একটু তেল দেওয়া তার স্বভাব। পুরোনো কথার সূত্র ধরে বলল , তোর কত বড় হওয়ার কথা ছিল বল তো! গাঁয়ে আজ অবধি তোর মতো বেশি নম্বর পেয়ে কেউ পাশ করেছে? বসন্ত স্যার তো বলতই, বুদ্ধিরামের মতো ছেলে হয় না। যদি লেগে থাকে তো জজ ম্যাজিস্ট্রেট কিছু একটা হয়ে ছাড়বে।
এসবই পুরোনো ব্যর্থতার কথা। বুদ্ধিরাম যা খুঁচিয়ে তুলতে চায় না। ধীরে-ধীরে তার আঁচ নিবে গেছে। সে গাঁয়ের মাস্টার হয়ে ধীরে-ধীরে নিজেকে মাপে ছোট করে ফেলেছে। সয়েও গেছে সব। কিন্তু কেউ খুঁচিয়ে তুললে আজও বুকটা বড় উথাল–পাথাল করে।
ষষ্ঠী, চুপ কর, ওসব কথা বলে আর কী হবে!
আমরা যে তোর কথা সবসময়েই বলাবলি করি। চোখের সামনে দেখছি কিনা। কী জিনিস ছিল তোর ভিতরে।
বুদ্ধিরাম ভাঁড়টা ফেলে দিয়ে উঠল। বলল , যাই, ছাত্ররা সব এসে বসে থাকবে।
যা।
বুদ্ধিরাম সাইকেলে চেপে বড় রাস্তা থেকে গাঁয়ের পথে ঢুকে পড়ল। অন্ধকার রাস্তায় হাজার হাজার জোনাকি জ্বলছে। তাদের মিটিমিটে আলোয় কিছুই প্রতিভাত হয় না। অথচ জ্বলে। লাখো লাখো জ্বলে। তাহলে কী লাভ জ্বলে।
