তারপরই একদিন একটা ঘটনা ঘটল। এমনি দেখতে গেলে কিছুই নয়। কিন্তু তার মধ্যেই বুদ্ধিরামের জীবনটা একটা মোড় ঘুরল। আম বাগানের ভিতর দিয়ে বিশু আর বুদ্ধি জিতেন পাড়ুইদের বাড়ি যাচ্ছিল মিটিং করতে। জিতেন সেবার ইউনিয়ন বোর্ডের ইলেকশনে নেমেছে। জিতেনকে জেতানোর খুব তোড়জোড় চলছে। বুদ্ধিরাম তখন যা হোক একটা কিছু নিয়ে মেতে থাকার জন্য ব্যস্ত। জীবনের হাহাকার আর ব্যর্থতা ভুলে মাথাটাকে কোনও একটা ভূতের জিম্মায় না দিলেই নয়। নইলে জিতেনের সিলেকশন নিয়ে কেনই বা বুদ্ধিরামের মাথাব্যথা হবে।
আমবাগানের শরঙ্কালের একটা সোনালি রূপালি রোদের চিকরিকাটা আলোছায়া। সকালবেলটায় ভারী পরিষ্কার বাতাস ছিল সেদিন। ঘাসের শিশির সবটা তখনও শুকোয়নি।
উলটোদিক থেকে একটা ছিপছিপে মেয়ে হেঁটে আসছিল। একা, নতমুখী। তার চুল কিছু অগোছালো এলো খোঁপায় বাঁধা। আঁচলটা ঘুরিয়ে শরীর ঢেকেছে। দেখে কেমন যেন মনটা ভিজে গেল বুদ্ধিরামের।
কে রে মেয়েটা?
দূর শালা! চিনিস না? ও তো আদুরি।
আদুরি! বুদ্ধিরাম এত অবাক হল যে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল হাঁ হয়ে। এক গাঁয়ে বাস হলেও আদুরির সঙ্গে তার দীর্ঘকাল দেখা হয়নি। কারও দিকে তাকায়ও না বুদ্ধিরাম। সেই আদুরি কি এই আদুরি?
আদুরি মাথা নীচু করে রেখেই তাদের পেরিয়ে চলে গেল। ভ্রূক্ষেপও করল না।
আর সেই ঘটনাটা সারাদিন বুদ্ধিরামের মগজে নতুন একটা ভূত হয়ে ঢুকে গেল।
বাড়ি ফিরেই সে ঠাকুমাকে ধরল, শোনো ঠাকুমা, একটা কথা আছে।
কী কথা?
সে-ই আদুরি মনে আছে?
আদুরিকে মনে থাকবে না কেন?
ওকেই বিয়ে করব। বলে দাও।
ঠাকুমা তার মাথায় পিঠে হাতটাত বুলিয়ে বলল , বড্ড দেরি করে ফেললি ভাই, আদুরির তো শুনছি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। হরিপুরের চন্দ্রনাথ মল্লিকের ছেলে পরেশের সঙ্গে।
বুদ্ধিরাম এমন তাজ্জব কথা যেন জীবনে শোনেনি। আদুরির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! তাহলে তো খুব মুশকিল হবে বুদ্ধিরামের।
সেই দিনই সে গোপনে তার দু-একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শে বসে গেল।
কেষ্ট বলল , বিয়েটা না ভাঙতে পারলে তার আশা নেই। ভাঙতে হলে সবচেয়ে ভালো উপায়। হল চন্দ্রনাথ মল্লিককে একখানা বেনামা চিঠি লেখা।
তো তাই হল। কেষ্ট নানা ছাঁদে লিখতে পারে। তার সাইন বোর্ডের দোকান আছে। চিঠিটা সেই লিখে দিল।
দিন সাতেক বাদে শোনা গেল, বিয়ে ভেঙে গেছে।
বুদ্ধিরাম ভেবেছিল, এবার জলের মতো কাজটা হয়ে যাবে। সে গিয়ে ফের ঠাকুমাকে ধরল, শুনছি আদুরির বিয়েটা ভেঙে গেছে। তা আমি রাজি আছি বিয়ে করতে।
ঠাকুমা গেল প্রস্তাব নিয়ে। বুদ্ধিরাম নিশ্চিন্তে ছিল। এরকম প্রস্তাব তো মেয়ের বাড়ির পক্ষে স্বপ্নের অগোচর।
কিন্তু সন্ধেবেলা ফিরে এসে ঠাকুমা বিরস মুখে বলল , মেয়েটার মাথায় ভূত আছে।
কেন গো ঠাকুমা?
মুখের ওপর বলল , ও ছেলেকে বিয়ে করার চেয়ে গলায় দড়ি দেওয়া ভালো।
বুদ্ধিরাম একথায় এমন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল যে বলার নয়। বলল ? এত বুকের পাটা? সেই রাতে বুদ্ধিরাম ঘুমোতে পারল না। কেবল ঘরবার করল, দশবার জল খেল, ঘন–ঘন পেচ্ছাব করল। মাথায় চুল মুঠো করে ঘরে বসে রইল। রাগে ক্ষোভে অপমানে তার মাথাটাই গেল ঘুলিয়ে।
ভোরের দিকে সে একটু ঝিমোল। ঝিমোতে–ঝিমোতে ভাবল, বহোৎ আচ্ছা। এইরকমের তেজি মেয়েই তো চাই। গেঁয়ো মেয়েগুলো যেন ভেজানো ন্যাতা। কারও ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। আদুরির আছে, এটা তো খুব ভালো খবর।
সকালবেলায় সে একখানা পেল্লায় সাত পৃষ্ঠার চিঠি লিখে ফেলল আদুরিকে। মেলা ভালো ভালো শব্দ লিখল তার মধ্যে। অন্তত গোটা পাঁচেক কোটেশন ছিল সবশেষে লিখল…’তোমাকে ছাড়া আমার জীবন বৃথা।
রসকলির হাত দিয়ে চিঠিটা পাঠিয়ে সে ঘরে পায়চারি করতে লাগল তীব্র উত্তেজনায়। আজ অবধি সে কোনও মেয়েকে প্রেমপত্র লেখেনি। এই প্রথম।
রসকলি ঘণ্টাখানেক পর ফিরে এসে বলল , ও দাদা, চিঠিটা যে না পড়েই ছিঁড়ে ফেলল গো।
চুপ। চেঁচাস না। কিছু বলল না?
কী বলবে? শুধু জিগ্যেস করল চিঠিটা কে দিয়েছে। তোমার কথা বলতেই খামসুষ্ঠু চিঠিটা কুঁচি–কুঁচি করে ছিঁড়ে ফেলল।
বোনের কাছে ভারী অপদস্থ হয়ে পড়ল বুদ্ধিরাম। তবে রসকলি হাবাগোবা বলে রক্ষে।
বুদ্ধিরাম বলল , কাউকে কিছু বলিস না। ভালো একটা জামা কিনে দেব’খন।
তখন অপমানে লাঞ্ছনায় বুদ্ধিরামের পায়ের তলায় মাটি নেই। সারাদিনটা তার কাটল এক ঘোরের মধ্যে। কিন্তু দু-দিন বাদে সে বুঝতে পারল, আদুরি যত কঠিনই হোক তাকে জয় করতে পারলে জীবনটাই বৃথা। তবে বুদ্ধিরাম আর বোকার মতো চিঠি চাপাটি চালাচালিতে গেল না। আদুরির ধাতটা বুঝবার চেষ্টা করতে লাগল সে।
গাঁয়ের মেয়ে। সুতরাং তাদের বাড়ির সকলের সঙ্গেই আজন্ম চেনাজানা বুদ্ধিরামের। তবে সে দেমাকবশে কারও বাড়িতেই তেমন যেতটেত না। ঘটনার পর দিনকয়েক আদুরিদের বাড়িতে হানা দিতে লাগল সে। আদুরির কাকা জ্যাঠা মিলে মস্ত সংসার। বড় গেরস্ত তারা। তিন-চারখানা উঠোন, বিশ–পঁচিশটা ঘর। সারা দিন ক্যাচ ম্যাচ লেগেই আছে। বুদ্ধিরাম গিয়ে যে খুব সুবিধে করতে পারল তা নয়। বাইরের দাওয়ায় বসে হয়তো কখনও আদুরির কেশোদাদুর সঙ্গে খানিক কথা কয়ে এল। না হয় তো কোনওদিন আদুরির জ্যাঠা হারুবাবুর কিছু উপদেশ শুনে আসতে হল।
