টিভি-র পরদাটা ঢালু, তার আলোহীন কাচে কোনও ছবি দেখা যায় না। কবে যে কলকাতায়। টিভি চালু হবে! শোনা যাচ্ছে, ওয়ার্ল্ড টেবিল টেনিস দেখাবে এবার। তাহলে কিছুদিনের জন্য বাঁচা যায়। স্নেহভরে একবার চমৎকার সেটটার দিকে চেয়ে থাকে তিতির।
হাতিটা এখনও যায়নি বুঝি! তিতিরকে ডেকে বলল-বলো তো সুখ কাকে বলে!
—সুখ! বলে তিতির ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবে। বলে কী জানি বাবা! তোমার সব শক্ত-শক্ত প্রশ্ন। তবে মনে হয়, যার কখনও পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে না, যে কখনও অতীত নিয়ে ভাবে না, অনুতপ্ত বা দুঃখিত হয় না, যে কেবল প্রতিটি বয়ে যাওয়া মুহূর্তকে অনুভব করে সেই সুখী।
উঠে ফের বাতি নিভিয়ে দেয় তিতির। বাইরে যে আজ কী প্রলয়কাণ্ড হচ্ছে! মাগো, গরিব দুঃখীদের বড় কষ্ট।
—তোমার কিছু মনে পড়ে না তিতির?
হাতিটা তবে এখনও যায়নি! তিতির ভ্রূ কুঁচকে বলে—ওঃ! হ্যাঁ চেষ্টা করলে আবছা সব মনে পড়ে। মনে পড়লে ভীষণ হাসি পায়।
–কীরকম?
—এই ধরো না, আমি একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম করতাম। সে স্কুল ফাইনালে টেনথ হয়েছিল। তারপর আর কিছু হয়নি। মনে পড়ে খুব একটা প্রেম হয়েছিল। ভারী মজার নাম ছিল তার জোনাকি!
অন্ধকার হাতড়ে-হাতড়ে শোওয়ার ঘরের দিকে চলেছে তিতির। আর একা-একা খুব হাসছে। এত হাসি পায়। জোনাকি! কী নাম বাবা।
শাওয়ার ঘরে এসে একটু চমকে যায় তিতির। পরদাটা সরানো। মস্ত জানলা কে অমন। আদুড় করে দিল? বাইরে একটা ধূসর পাগলা ঝড়। মুহুর্মুহু কাচের শার্সিতে করাঘাত করছে এসে এক মহাশূন্য। বাতাস আকাশ। শার্সি জুড়ে এক বিশাল পরদার টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে এক মহাজগতের মহাপ্রলয়।
শিউরে ওঠে তিতির। ও মা! জানলার একটা ধারের ছোট্ট একটা পাল্লা কে কখন খুলে দিল। বৃষ্টির প্রবল ছাঁট আসছে, বাতাস ঘুর্ণির মতো পরদাটাকে ওড়াচ্ছে কোণের দিকটায়। তিতির জানলার কাছে দৌড়ে গেল। কিন্তু পাল্লার কাছে পৌঁছাতে পারল না। সেই আদিম পাগল ঝড়টা তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল—সরে যাও, সরে যাও, আমি তোমার ঘর তল্লাশি করতে এসেছি।
তিতির ভয় পেয়ে সরে আসে।
বিছানায় একটা হালকা চাদর গায়ে চাপা দিয়ে শুতে গিয়েই ফের ভীষণ চমকে ওঠে। অমিত কোথায় গেল?
—ওগো! বলে ভয়ার্ত তিতির উঠে বসে। কোনও উত্তর আসে না। বাইরে হোহো করে হেসে ওঠে বাতাস। আকাশ বাঘের মতো ডেকে ওঠে শিকার খুঁজে পেয়ে।
—কোথায় গেলে তুমি?
অন্ধের মতো তিতির উঠে অন্ধকার ঘরে ঘুরতে থাকে। ঘরের একধারটা ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টিতে, বাতাসে। ওই রন্ধ্রপথে বারবার বাহির চলে আসে ঘরের মধ্যে। ঘরটাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় বাইরে। আব্রু নষ্ট করে। অমিতকেও কি নিয়ে গেল?
ককিয়ে কেঁদে ওঠে তিতির। ও একটু আগেই বলেছিল, ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ওর চলে যেতে ভালো লাগে। তিতির ভীষণ চিৎকার করে বলে—এত তাড়াতাড়ি আমার সব কেড়ে নিও না। ওগো, কে তুমি বারবার আসো ঘরের মধ্যে? দয়া করো।
মস্ত ঘরের এককোণে একটু ছোট্ট দেশলাই কাঠির তিনকোণা আগুন জ্বলে ওঠে। অমিত বলে —তিতির, আমিও তোমাকে খুঁজছি। এয়ারকুলারটা বন্ধ করে দিয়েছ, দমবন্ধ লাগছিল, তাই একটা পাল্লা খুলে দিয়ে বসে আছি।
—ডাকোনি তো! তিতির চোখ মুখে, কান্না গিলে হেসে ফেলে।
অমিত চুপ করে থাকে। তারপর বলে–সবসময়ে ডাকতে নেই তিতির। মানুষের মাঝে মাঝে একদম একা হওয়া দরকার। আমিও দেখোনা, একা বসে ঝড় দেখছি কখন থেকে!
তিতির কাছে গিয়ে বলে—কেন গো?
—ওঃ তিতির। কী প্রকাণ্ড এই আকাশ, কী বিরাট শূন্যতা চারদিকে। আর কী ভয়ংকর শক্তিমান ঝড়। এ-সব দেখলে নিজেকে তুচ্ছ লাগে বড়। মাঝে-মাঝে, নিজেকে তুচ্ছ ভাবতে কী যে আনন্দ হয়!
বাবা
সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠেই দিদিমার কাছে শুনলাম, বহুকাল পরে আমাদের বাবা এসেছে। শুনেই হুড়মুড় করে আমরা দুই ভাই, বোন উঠে পড়লাম। তারপর ছুট লাগালাম বাইরে।
আমাদের বাস গঞ্জে, মামাবাড়িতে। বাড়িটা একটু খোলামেলা, গাছপালা আছে। বারবাড়িতে একটা কদমগাছের তলা দাদামশাই গোল করে বাঁধিয়ে নিয়েছেন। বিকেলে এখানে দাদামশাইয়ের আড্ডা বসে।
সেই বাঁধানো জায়গাটায় গাছের মোটা কালো মতো একটা লোক বসে আছে। তার উঁড়ো গোঁফ, মাঝখানে সিঁথি, ছোট কুতকুতে চোখ। পরনে মোটা কাপড়ের পাঞ্জাবি, ধুতি, পায়ে বিশাল জুতো। পাশে স্যুটকেস, শতরঞ্জিতে বাঁধা বিছানা আর একটা ছাতা। এই শীতকালেও লোকটা বেশ ঘেমেছে। মাকে জন্মে ঘোমটা মাথায় দিতে দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম, মা মাথায় ঘোমটা টেনে লোকটাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে।
আবার বোন রেবা নাক কুঁচকে বলল , এইটে বাবা নাকি?
আমারও এই বাবা তেমন পছন্দ হয়নি। অবাক হয়ে বাবা দেখতে-দেখতে বললাম, তুই ঠিক বাবার চেহারা পেয়েছিস।
অন্য সময় হলে রেবা আমাকে চিমটি কাটত বা কিল মারত। কিন্তু এখন বাবার এই চেহারা দেখে সে অবাক। বলল , কিন্তু ফটোতে কক্ষনো এরকম চেহারা নয়। দূর! এ বাবা হতেই পারে না।
বাবার আগের চেহারা আমিও দেখিনি। পিঠোপিঠি আমরা দুই ভাইবোন জন্মানোর কিছু পরেই মামাবাড়ির সঙ্গে ঝগড়া করে বাবা ইগতপুরীতে চলে যায়। গত বারো–তেরো বছরে আর দেশে ফেরেনি। কী নিয়ে রাগারাগি তা আমরা খুব ভালো জানি না। তবে শুনেছি বিয়ের পর নাকি বাবা দাদামশাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল তামাকের ব্যাবসা করবে বলে। ব্যাবসা ফেল মারে। মামারা তখন একজোট হয়ে বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে। বাবা তখন বেকার, তার ওপর সদ্য ব্যাবসায় মার খেয়ে পাগল-পাগল। আবার সে ঝগড়ায় নাকি মাও ছিল বাবার বিরুদ্ধে। বাবা একবস্ত্রে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। জ্ঞান হয়ে অবধি আমরা শুনে আসছি, আমাদের বাবা সাধু হয়ে চলে গেছে। কেউ বলত, মরে গেছে। যা হোক, বছর পাঁচেক বাদে মহারাষ্ট্রর ইতপুরী থেকে একখানা পোস্টকার্ড আসে মায়ের নামে ‘আমি বাঁচিয়া আছি। চিন্তা করিও না। ইতি বসন্ত চট্টোরাজ।’
