যদি হত তবে জোনাকিকুমার আজ এরকম একটা মস্ত ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতে পারত, গাড়ি চালাত। তার বউ হত তিতির বা ওরকমই কেউ। খুব সুন্দর। এই বৃষ্টি বাদলার পৃথিবীতে কেবলই পথ ছেড়ে উঠে এসে পরের দরজায় দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে বৃষ্টি দেখতে হত না। বেশ সুখেই থাকত এক সফল জোনাকিকুমার। নিমির মতো হাঘরে মেয়েরা তাদের তুচ্ছ ঘর-সংসারে। তাকে ডাক দেওয়ার সাহসই পেত না।
এত বৃষ্টি! ঝড়ের হাওয়ার সমুদ্র থেকে উঠে আসে মেঘ। পরতে-পরতে আকাশ ঢেকে দিচ্ছে। রাস্তায় প্রতিহত জলকণা উঠে চারদিক ঝাপসা করে দেয়। চেনা পথ ধুয়ে যায় বৃষ্টিতে, ঘরে ফেরার দিকচিহ্ন উড়িয়ে নিয়ে যায় ঝড়। আজও মনে হয়, এই দুর্যোগেও কোথাও যাওয়ার নেই জোনাকির। এই তো বেশ দাঁড়িয়ে আছে। কেটে যাচ্ছে আসলে খানিকটা সময়। জোনাকির সময়ের অভাব নেই। সে যদি সফল জোনাকি হত তো থাকত। কত ব্যস্ততা, কত টেলিফোন, কত নানাজনের ডাক। সেসব নেই জোনাকির। মস্ত বাড়ির তলায় নীচু গ্যারাজ ঘরে এই কেমন ছোট্টটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টি পড়ছে। অনেকগুলো গাড়ি চলে এল গ্যারেজ ঘরে। কত গাড়ি! দারোয়ান উঠে আলো নেভাচ্ছে। এরপর দরজা বন্ধ করবে। তার আগে হয়তো বা চলে যেতে বলবে জোনাকিকে। সে বড় অপমান। এ-বাড়িতে তার ঘর নেই ঠিকই, কিন্তু তা বলে কোনও জায়গা থেকে কেউ চলে যেতে বললে আজও অপমান বোধ করে সে।
জোনাকি তাই বৃষ্টিতেই নেমে এল। কী প্রবল ধারা। গায়ে ছ্যাক করে শীতের ছোঁয়া লাগল প্রথমে। তার ফাঁকা মাথায় বৃষ্টির ফোঁটা ডুগডুগ করে বেড়ে উঠল। লক্ষ আঙুল দিয়ে বৃষ্টি তাকে। চিহ্নিত করে বলতে থাকে—ছিঃছিঃছিঃছিঃ!
কোথাও যাওয়ার নেই। তবু যাওয়া থেকেই যায় মানুষের। কেন যে যায়! থেমে পড়লেই তো হয় মাঝপথে! কেন কেবল যেতেই হবে?
রাস্তায় লোকজন নেই। একা জোনাকি হেঁটে চলেছে। চোখ অন্ধ ও শ্রবন বধির করে দিয়ে অনন্ত বৃষ্টিপাত হয়ে যেতে থাকে। পোশাক চুপসে যায়। কাঁপুনি উঠে আসে শরীরে। ভিজে ভিজে হাঁটে জোনাকি। চারদিকে মেঘ ডাকছে। একটা বজ্রপাতের শব্দ হয়। জোনাকি একবার বলে— জানোনা তো, তুচ্ছ হয়ে যাওয়ার মধ্যে কীরকম আনন্দ আছে!
কাকে বলে কে জানে!
.
চার
—ওগো শোনো, কী ভীষণ ঝড় উঠল। তিতির ভয়ের গলায় বলে।
তাকে বুকে টেনে নিয়ে অমিত বলে—ঝড়! তাতে কী? এ-বাড়িতে কোনও ভয় নেই তো তিতির!
–বড্ড হাওয়ার শব্দ হচ্ছে যে!
—এত ওপরে একটু বেশি হাওয়া তো লাগবেই। কিছু ভয় নেই। আমার তো ইচ্ছে করে এই ঝড়ের মধ্যে বৃষ্টি মাথায় করে বেরিয়ে পড়ি। খোলা হাওয়া বৃষ্টির জল আমাকে ধুয়ে মুছে দিক।
—আহা।
—সত্যিই। খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু তুমি তো যেতে দেবে না।
—দেব না-ই তো!
—জানি। বড্ড রুটিন হয়ে গেছে জীবনটা।
রুটিন না হলে চলে? তোমার কত কাজ! তিতির ওকে একটু আদর করে বলে। একটু ড্রিঙ্ক করেছিল অমিত। বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারল না। ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু তিতিরের আর ঘুম আসে না। সে উঠে এয়ারকুলার বন্ধ করে দিল। ঠান্ডা লাগছে।
একটু ধূসর পরদায় জানলাগুলো ঢাকা। পরদা নড়ছে না। কিন্তু বাইরে হুঙ্কার দিয়ে ফিরছে ঝোড়ো বাতাস। কাচের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা এসে অবিরল টোকা দেয় গোপন প্রেমিকের মতো। তিতিরকে ডাকে।
উঠতেই হয় তিতিরকে। একটা বাজ পড়ল কোথায়। বাড়িটা তার অজস্র কাচের শার্সি নিয়ে ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। ঘুম আসবে না। এরকম ঝড়বৃষ্টির রাতেই ভালো ঘুম আসে লোকের, কিন্তু তার আসবে না।
তিতির পরদাটি সরিয়ে দেখে, কলকল করে জলস্রোত নেমে যাচ্ছে শার্সি বেয়ে। নীচে একটা ডাইনির শহরযত না তার আলো তত বেশি ভূতুড়ে অন্ধকার। বাড়ি-ঘর সব যেন নুয়ে গেছে, গাছপালা হয়ে গেছে কাল্পনিক গাছের ছবির মতো, আলোগুলো বৃষ্টিতে দিপদিপ করে। এত উঁচু থেকে সবই মনে হয় বড় দূরের। মাঝখানে শূন্য। আর এই গভীর রাত্রে শার্সি ভেদ করে সেই শূন্যটা ঘরের মধ্যে চলে আসতে থাকে।
বাতি জ্বেলে টিভি সেটটার মুখোমুখি বসে এসে তিতির। হাই তোলে। অমিতের জন্য একটা সোয়েটার বুনছিল, সেইটে নিয়ে বসে।
হাতিটা ভেজা গায়ে সামনে দাঁড়ানো, বলে—খুব সুখে আছ তুমি তিতির।
—হ্যাঁ হাতিভাই। কেবল ওই জানলার গরাদ লাগানো বাকি। সেটা হয়ে গেলে আর কী চাই!
—সেটা লাগাতে খুব বেশি দেরি কোরো না তিতির। কী জানি, কবে তোমাকে আমি চুরি করে নিয়ে যাই জানলা দিয়ে।
—ও কথা বোলো না হাতিভাই। আমি তো কোনও পাপ করিনি যে মরব। বরং এত সুখে থেকেও আমি কখনও আর দশজনের কথা ভুলি না। গত রবিবারে আমরা আমাদের ক্লাবের পক্ষ থেকে ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দিয়ে এলাম। শিরাতে চুঁচ ফুটিয়ে কত রক্ত বের করে নিল বলো তো! অনাথ আতুরদের জন্য যে ফান্ড খোলা হয়েছে তাতে আমরা প্রতি মাসে অনেক টাকা দিই, মাঝে-মাঝে কালেকশনে বেরোই। মূক-বধিরদের জন্য অন্ধদের জন্য, আমরা সব সময়েই ব্যথিত। যা পারি, যতখানি পারি করি। সুখী বলেই স্বার্থপর ভেবোনা আমাদের।
হাই উঠছে। ঘুমে ঢুলে আসছে চোখ। তবু ঘুমোতে গেলেই কী একটা হয়। এই ঝড় জলের রাতটা তার দুর্যোগ নিয়ে কেবলই ঢুকে আসে ফ্ল্যাটে। কেন যে এত বড় জানলা করেছে এ বাড়িতে। কোনও মানে হয় না। আকাশ ঢুকে পড়ে, বাতাস ঢুকে পড়ে। শূন্যতাও বেড়াতে আসে নির্লজ্জ প্রতিবেশীর মতো, এসে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তিতিরের সুখ-দুঃখের খতিয়ান নিয়ে যায়, বিশ্রী। অমিত কিছুতেই তিতিরের একটা কথা শুনতে চায় না। ও কি বোঝে না যে জানলায় একটা প্রতিরোধ দরকার! ভীষণ দরকার!
