হাসলাম। বুঝলাম অতীশ চিঠিটা আন্দাজ করে সোনাকে সব বলে গেছে। তবু কী করে আমি সোনাকে বোঝাব যে আমি এখনও সুখী নই।
কুণাল কতদূর বিপ্লবী ছিল, সঠিক ফেরারি ছিল কি না তা নিয়ে আমার একটুও মাথাব্যথা নেই। আমি স্বেচ্ছায় সরে এসেছি অনেক দূরে। এখন নিশ্চিন্ত জীবন আমার। তবু মাঝে-মাঝে একজন ফেরারির কথা ভাবতে আমার ভালো লাগে। রাজনীতির জন্য নয়, বিপ্লবের জন্যও নয়, এসব কোনও কিছুর জন্যই এখন আর আমার একটুও ব্যস্ততা নেই। এখন আমার প্রিয় সেলাইকলের আওয়াজ, আমার শিশু ছেলের কান্না, আলমারিতে সাজিয়ে রাখা পুতুল কিংবা ফুলদানিতে ফুল। কেবল মাঝে-মাঝে এসবের ফাঁকে-ফাঁকে একটু বিমনা হয়ে ভাবতে ভালো লাগে আমারই এক সত্তা পালিয়ে ফিরছে মাঠে জঙ্গলে, খেতে খামারে, পাহাড়ে পর্বতে। কুণালের কথা শুনে তাই আমি একটু খুশি হইনি, অবাকও নয়। আমি তো জানতাম বিপ্লবের পথ গাৰ্হস্থ্যের দিকে বেঁকে যায়! বনের সন্ন্যাসী ফিরে আসে ঘরে! আমি তো তা জানতাম!
রাতে শুয়ে আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে সোনা বলল , ‘কষ্ট পাচ্ছ?’
চমকে উঠি বলি, ‘কই! কীসের কষ্ট?’
‘আমি জানি। পাচ্ছ।’
‘কেন?’
‘কী জানি!’ বলে একটু চুপ করে থেকে বলল , বোধহয় তোমার মাঝে-মাঝে সন্ন্যাসী হতে ইচ্ছা করে, না? এমন উদ্দেশ্যহীন নিস্তেজ জীবন তোমার ভালো লাগে না। আমি জানি।’
‘দূর।’ বলে জোরে হেসে উঠলাম। তবু সোনার মুখ সামান্য বিবর্ণ দেখাচ্ছিল।
‘বড় ভয় করে গো।’ ঘুমের আগে আমার আদরে তলিয়ে যেতে-যেতে সোনা বলল । অমনি আমার বুকের মধ্যে টিকটিক টিকটিক। যেয়ো না। যেয়ো না।
নিঃসাড়ে ঘুমের ভান করে অনেকক্ষণ পড়ে থেকে আমি গভীর রাতে উঠে লেখার টেবিলে ছোট বাতিটি জ্বেলে বসলাম। কুণালকে একটা চিঠি লেখা দরকার। চেনা কুণালকে নয়। এ আর এক কুণালকে, যাকে আমি চিনি না।
সারারাত ধরে আমি লিখলাম আমার চিঠি সিগারেটের পর সিগারেট জ্বেলে। তারপর টেবিলের ওপরেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। ভোরবেলা সোনা আমাকে ডেকে তুলল। তার চোখে–মুখে ভয়, ঠোঁট কাঁপছে কান্নায়, ‘কী করছিলে তুমি রাজা? সারারাত…সারারাত ধরে।’
আমি সুন্দর করে হাসলাম। তারপর ইঙ্গিতে দেখিয়ে দিলাম চিঠিটা। ও প্রথমে বুঝতেই পারল না।
বললাম, ‘সারারাত ধরে আমি এ চিঠিটা লিখেছি সোনা। বেনামি একটা চিঠি।
‘ওমা!’ ও অবাক হয়ে বলল , ‘এ তো মাত্র একটা লাইন!’
আমার কাঁধের ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে ও শব্দ করে চিঠিটা পড়ল, ‘ওরে কুণাল, বনের সন্ন্যাসীর চেয়ে ঘরের সন্ন্যাসীই পাগল বেশি!’
