সবুজ কাঁচে ঢাকা টেবিল, গভীর গদিওয়ালা চেয়ার আর পিছনে প্রকাণ্ড কাঁচের জানালা। দূরে। ময়দানের চেনা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কোট খুলে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে দিয়ে আমি কাঁচের শার্সি খুলে দিলাম। হুহু করে ঠান্ডা বাতাস বয়ে এল। পাতা-পোড়ানো ধোঁয়ার মৃদু গন্ধ। উদাস রোদ হাওয়া আর মৃদু ধোঁয়ার গন্ধ আমি আমার অন্তরে গ্রহণ করে নিচ্ছিলাম। বেশ নিশ্চিন্ত জীবন আমার। একটি-দুটি ছোটখাটো অভাববোধ এবং কখনও-সখনও সামান্য একটু একঘেয়েমি ছাড়া কোনও গোলমাল নেই। আমি সুখী। একটি ছোট শ্বাস ছেড়ে আমি চেয়ারে ফিরে এলাম।
দুপুরে হঠাৎ এল সোনার টেলিফোন। তার গলার স্বর শুনে চমকে উঠে বললাম, ‘কী হয়েছে।’
‘কই! কিছু না!’ বলে ও হাসল, ‘তোমাকে উল আনার কথা বলেছিলাম, রাজা! মনে আছে? মনে করিয়ে দিলাম। তোমার কোটের ডানদিকের পকেটে নমুনা দিয়ে দিয়েছি। চার আউন্স এনো।’
‘দূর! আমি পারব না। আবার অফিসের পর দোকানে ছোটাছুটি। তা ছাড়া উলের রং মেলানো বড় ঝামেলা।’
‘পারবে।’ বলে হাসল, ‘তুমি না পারলে চলবে কী করে? তুমি ছাড়া আমার কে আছে আর? মৃদু হাসলাম। আমাকে পটাতে সোনা ওস্তাদ।
একটু চুপ করে থেকে বলল , ‘আজ বিকেলের কথা মনে আছে তো?।’ বলেই আবার হাসি, ‘বলো তো আজ কী?’
‘আজ?’ আমি একটু ভাবনার ভান করে বললাম, ‘আজ তো খোকনের জন্মদিন!
‘বদমাশ!’
‘তাই না!’
‘ঠিক আছে। তাই। শুধু সময়ে এসো।’
তারপর একটু চুপচাপ। টের পেলাম ও ফোন তখনও ছাড়েনি। আমিও ছাড়তে দ্বিধা করছিলাম। তখন হঠাৎ ও বলল , ‘রাজা, আমার ফোন পেয়ে তুমি চমকে উঠলে কেন?’
সামান্য গোলমালে পড়ে বললাম, ‘কই!’
‘ভয় পেয়েছিলে?’
‘কীসের ভয়!
ও হাসে-’কীসের ভয় তার আমি কী জানি! বউ–ছেলে চুরি যাওয়ার ভয় হতে পারে, ঘরে আগুন লাগার ভয় হতে পারে। কত ভয় আছে মানুষের!’
‘বদমাশ’ বলে আমি ফোন রেখে দিলাম।
সত্য যে আমি ভয় পেয়েছিলাম। সোনা যেভাবে বলল সেভাবে নয়। তবে অনেকটা এরকমই অস্পষ্ট একটা ভয়।
বিকেলে আমি অনেক ঘুরে-ঘুরে ওর ফরমাশি উল কিনলাম, আর আজকের দিন উপলক্ষ্যে ওর জন্য কিনলাম কালো জমির ওপর হলুদ আর সুরকি রঙের এমব্রয়ডারি করা একটা কার্ডিগান, কিছু ফুল, গোটা দুই বাংলা উপন্যাস। বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তা পা দিয়েছি, সে সময়ে কোথাও কিছু ছিল না-তবু হঠাৎ মনে হল যদি এই অবস্থায় কোনওদিন কুণাল আমাকে দেখে! কে জানে বাইরের এত অচেনা লোকজনের মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে আমাকে লক্ষ করছে কি না! সে দেখছে তার প্রিয় মধুবনকে। পরনে স্যুট মধুবনের, উলের প্যাকেট, কাগজে মোড়া বউয়ের কার্ডিগান, হাতে ফুল আর উপন্যাস। কি জানি কেমন অস্বস্তি এল মনে, রজনীগন্ধার ডাঁটিতে অকারণে বোকার মতো আমার মুখ আড়াল করলাম।
পরমুহূর্তেই হেসে স্বাভাবিক হয়ে গেলাম আমি। তবু অস্বীকার করার উপায় নেই যে কয়েক পলকের জন্য আমার দুর্বলতা এসেছিল।
সন্ধেবেলায় আমাদের অনুষ্ঠান জমল খুব। আমার অনেককালের বন্ধু অতীশ এসেছিল তার বউকে নিয়ে, আরও দু-একজন বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজন।
যখন সবাই চলে যাচ্ছে তখন সিঁড়ির গোড়ায় সতীশ আমাকে আলাদা ডেকে নিল, ‘তোর সঙ্গে কথা আছে।’
আড়ালে নিয়ে গিয়ে সে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার রে? শুনলাম তোর কাছে বেনামা একটা চিঠি এসেছে?’
মাথা নাড়লাম–হ্যাঁ। বললাম, ‘কে বলল ?’
‘তোর বউ।’ ও হাসল, ‘ও খুব ভয় পেয়ে গেছে। বলছিল কাল থেকে তুই নাকি কেমন অন্যরকম হয়ে গেছিস। কেঁদেছিস।’
হাসলাম, ‘দূর।’
অতীশনীচু গলায় প্রশ্ন করল, ‘কে লিখেছে?’
বললাম, কুণাল। কুণাল মিত্র।’
‘ও!’ বলে ভাবল অতীশ, ‘বছরচারেক আগে সে আর-একবার তোকে চিঠি দিয়েছিল না?’
‘হ্যাঁ। আমার বিয়ের ঠিক পরেই।’
‘এবার কী লিখেছে সে?
আমি বললাম, ‘অনেকদিন আগে আমি তাকে শিখিয়েছিলাম : সাবধান! বিপ্লবের পথ কিন্তু কেবলই গাৰ্হস্থ্যের দিকে বেঁকে যায়! বনের সন্ন্যাসীও ফিরে আসে ঘরে! সেই কথাই সে ফেরত পাঠিয়েছে আমাকে।’
হাসল অতীশ, ‘তোকে টিজ করছে, না?
আমি মাথা নেড়ে জানালাম–হ্যাঁ।
ধীরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল অতীশ, ‘ওর বেশি আর কিছুই কুণালের করার নেই।’
আমি চেয়ে রইলাম অতীশের মুখের দিকে।
অতীশ ম্লান হাসল, ‘মধুবন, আমি কুণালের খবর রাখি। বছরখানেক আগে তার খবর পেয়েছিলাম। হাওড়া জেলার মফসসলে একটা কারখানায় সে চাকরি করছে। দুঃখে কষ্টে আছে। আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমি তাকে তোর কাছে আসতে বলেছিলাম। তুই বড় চাকরি করিস। সে মাথা নেড়ে জানাল আসবে না। বলেছিল, আমার খবর মধুবনকে দেবেন না। আমি কথা দিয়েছিলাম। আজ কথা ভাঙতে হল মধুবন, নইলে হয়তো তোর শান্তি থাকত না।’
একটু চুপ করে থেকে অতীশ আবার বলল , ‘ভাবিস না মধুবন। এইসব ছোটখাটো চমক সৃষ্টি করা ছাড়া ওর জীবনে তো আর কিছু এখন করার নেই। ওরও ছেলেপুলে নিয়ে বড় সংসার, তোর খোঁজখবর রাখার সময় তেমন নেই। তবু মাঝে-মাঝে ওইসব চিঠি পাঠায়, পাঠিয়ে মজা পায়।’
কুণালকে প্রায় হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়ে অতীশ চলে গেল। আমি নিঃশব্দে ঘরে ফিরে এলাম। দেখি ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে সোনা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে ফিরে একঝলক হেসে বলল , ‘কী গো কুণাল মিত্রের বন্ধু, ভূতপূর্ব বিপ্লবী? এবার একটু হেসে কথা কও।’
