প্রথম ট্যাংকিতে ময়লা, দু-নম্বরে জল, তিন নম্বরেও জল। তিন নম্বরে পয়লা বালতি মেরে গান্ধা জল তুলে ড্রেনে ঝপাং করে ফেলে মাগন আপনমনে বলে–আই বাপ! হাউস ফুল! চালিশ টাকার তো স্রিফ পাসিনা চলে যাবে। ফিন ভিটামিন–উটামিন দিবে কৌন?
বারান্দা থেকে দত্তবাবু দেখছেন, হেঁকে বলছেন কী বলছিস রে ব্যাটা?
মাগন ঝপাং করে দুসরা বালতি মেরে মুখ তুলে এক গাল হেসে বলে–একটা বাংলা সাবুনের দাম দিবেন তো বড়বাবু? আর চায় পিনেকো পয়সা! আউর হোলির বখশিশ।
–ব্যাটা নাতজামাই এলেন।
–এমন সাফ করে দিব না। একদম বেডরুম।
–বকবক করিস না, হাত চালা। বেলা ভর তোর কাজ দেখতে দাঁড়িয়ে থাকবে কে? তিন নম্বর বালতি মেরে মাগন বলে গিয়ে আরাম করুন না, কুছ দেখতে হবে না। কাম পুরা করে পয়সা লিব।
দত্তবাবু স্টেটসম্যানটা খুলে পড়তে গিয়ে দেখলেন প্লাস পাওয়ারের চশমাটা চোখে নেই। চেঁচিয়ে বললেন, মুনমুন, আমার পড়ার চশমাটা দিয়ে যা তো।
বলে কাগজের বড় হেডিংগুলো দেখতে লাগলেন। মন দিতে পারলেন না। চল্লিশ টাকার কাজ হচ্ছে সামনে! দু-ঘণ্টা বড়জোর তিন ঘণ্টা কাজ করে ব্যাটা চল্লিশ চাক্কি ঝাঁক দিয়ে নিয়ে যাবে। রোজ একটা করে সেপটিক ট্যাংক যদি সাফ করে তবে মাসে কত রোজগার হয়?
ভাবতে গিয়ে ফোঁস করে একটা শ্বাস বেরিয়ে গেল। বারোশো টাকা।
দত্তবাবু খুব জোর হেঁকে বললেন–জোরসে চালা! জোরসে!
ট্যাংকির ভিতরে বকবক করছে জল। গহীন গান্ধা জল। ঝপাঝপ বালতি মারে মাগন আর বলে–চালাচ্ছে বাবা। বহুৎ গান্ধা বাবা, বহুৎ কাদো। চালিশ রুপিয়া স্রিফ পাসিনা মে গিয়া বাবা। ভিটামিন দিবে কৌন?
২.
মুনমুন সাজছে। সময় নেই।
ক’দিন আগেও চুলের গুছির গোড়ায় একটা গার্ডার বেঁধে বেরিয়ে পড়তে পারত। আজকাল আর তার জো নেই। যাদবপুরের জল এত খারাপ যে গত দু-বছরই চুল উঠে গিয়ে এই ক’টা হয়ে গেছে। এখন মাথায় হাত বোলালেও চুল উঠে আসে, একবার চিরুনি চালিয়ে আনলে উঠে আসা চুলের গোছা দিয়ে দড়ি পাকানো যায়। এখন বব করেছে। তবু চুলের পিছনে খাটতে কম হয় না। শুধু চুল? গায়ের রং মেটে হয়ে গেল। যে দেখে সে-ই বলে–ইস। কী কালো হয়ে গেছিস! কতবার বলেছে বাবাকে, এবার যাদবপুর ছাড়ো। আর নয়, এরপর মাথায় টাক পড়বে, গায়ের রং হয়ে যাবে টেলিফোনের মতো। পাত্রপক্ষ দেখতে এলে ভুল করে বলে উঠবে, হ্যালো!
সময় নেই। শুধু শাড়িটা পরা বাকি।
–ব্লাউজের হুকগুলো লাগিয়ে দিবি লক্ষ্মীটি? বলতে-বলতে গিয়ে সে হুস করে চুনুর সামনে পিছু হয়ে উবু হয়ে বসে পড়ে।
চুনুর মুখ দেখে তার মন বোঝা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে সে এইটে অভ্যেস করেছে। মুখে। একটা ভালোমানুষি, আর বড়-বড় চোখে ভাসানো দৃষ্টিতে সে চায় সব সময়ে। দিদিকে আসতে দেখেই চুনু একটা কাগজ লুকিয়ে ফেলল ফ্রকের ঘেরের নীচে।
–একক সংগীত তোর ভালো লাগে? বাব্বা! আড়াই ঘণ্টা ধরে একক গলার গান শুনতে শুনতে মাথা ধরে যায় না? –ইস, হুকগুলো সব চেপটে গেছে। লন্ড্রিতে দিয়েছিলি বুঝি ব্লাউজটা? আছড়ে কেচেছে, হুকের মাথাগুলো সব বসে গেছে।
মুনমুন অধৈৰ্য্য হয়ে বলে–তাড়াতাড়ি কর না।
–করছি তো! হুকগুলো ঘুরে ঢুকছে না যে! একটা সেফটিফিন দে, খুঁটে তুলি। মুনমুনের নতুন প্রেমিক এসে দাঁড়িয়ে থাকবে রবীন্দ্রসদনে। মুনমুন খুব ভালো জানে এও বেশিদিন টিকবে না। শেষপর্যন্ত কে যে পাবে তাকে তা কী এখনই বলা যায়। সতেরো বছর বয়সে কী করে বলবে, আসল লোকটা কে! এখনও কত জন লোক আছে, কত রোমাঞ্চ আছে, কত রহস্য ও ঘটনা! তবু এখনকার মতো এই প্রেমিকটিকেও সে উপেক্ষা করতে পারে না।
সব সময়েই একটু দেরি করে যাওয়া ভালো। তা বলে বেশি দেরিও নয়। তাতে উৎকণ্ঠার বদলে বিরক্তি এসে যায়। মুনমুনের একটা হিসেব আছে। সে হিসেব মতো একটু বেশিই দেরি হয়ে যাচ্ছে।
সে এক ঝটকায় সরে এসে বলে–ছাড় তো! তোর কম নয়।
বলে সে নিজে নিজে ড্রেসিং টেবিলের দিকে পিছু ফিরে হাত পিছনে ঘুরিয়ে টপাটপ হুক লাগিয়ে ফেলে, বলে–কোথায় হুক চেপটে গেছে! আমার হাতে লাগল কী করে? মারব থাপ্পড়
চুনু ভাসা চোখে চেয়ে থাকে ভালোমানুষের মতো। যেন জানে না, হুক ঠিক ছিল। বলল –সুচিত্রার গান রোজ তো শুনছিস বাবা, রেডিয়োয়, গ্রামোফোনে, মাইকে। আর কত? ডাল-ভাত হয়ে গেছে।
–সুচিত্রা কখনও ডাল-ভাত হয়ে যায় না। আর হলেই কী? তুই রোজ ভাত খাস না? খারাপ লাগে? ভাত না পেলে তো কুরুক্ষেত্র করিস!
হঠাৎ কুঁকড়ে গিয়ে চুনু ফ্রক তুলে নাক চেপে ধরে রুদ্ধস্বরে বলে–এঃ মা! কী গন্ধ আসছে।
প্রচণ্ড সেন্ট মেখেছে মুনমুন। প্রথমে সে পায়নি, এখন পেল গন্ধটা। একটা ‘ওয়াক’ তুলে দৌড়ে গিয়ে বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে এসে ‘উঃউঃ’ করে নাকে আঁচল চাপা দিয়ে বলল –সেপটিক ট্যাংক খুলেছে। শিগগির জানলা বন্ধ কর।
৩.
–একটা দড়ি দিবেন বড়বাবু? আব পানি নীচা হয়ে গেল, বালতিতে দড়ি লাগাতে হবে।
–ওঃ, দড়ির কথা আগে বলবি তো! দাঁড়া দেখি আছে কি না।
মাগন একগাল হেসে বলে বারো আনা পয়সা দিন তো লিয়ে আসি।
–পয়সা দিলে পাওয়া যায় সে জানি! চালাকি করিস না। দেখছি দাঁড়া।
দত্তবাবু চেঁচালেন কোথায় গেলে গো? এ ব্যাটা দড়ি চাইছে। আছে নাকি?
