আর তুলসীজ্যাঠার ঘরে বসে লাভ নেই। ভূষণ বেরিয়ে এসে দরজায় শিকল তুলে দিল। বিয়ের মধ্যে যে আনন্দ আর রোমহর্ষ ছিল, তা বিয়ের আগে জানত কোন আহাম্মক? ভূষণ ভাবত, বিয়েটা একটা ব্যাপারই হবে বটে, কিন্তু তা যে এরকম ভালো, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। যারা বিয়ে না করে থাকে, তাদের জীবনটাই বৃথা। এই যে তুলসীজ্যাঠা, কী নিয়ে যে বেঁচে আছে ভগবান জানে। মাঠেঘাটে ঘুরছে, হোমিওপ্যাথি করে বেড়াচ্ছে, আর দিনান্তে রামচরিতমানস বা গান্ধীর বই খুলে মুখ গুঁজে বসে আছে। অসুখ–বিসুখ হলে জলটুকু এগিয়ে দেওয়ারও লোক নেই।
অসুখের কথায় ভূষণ হঠাৎ নিজেই চমকায়, তাই তো। কথাটা তো বড় জব্বর মনে পড়েছে। অ্যাঁ! এখন যদি তার অসুখ হয়, তাহলে ঝুমকোসুন্দরী কী করবে? অ্যাঁ! ধরো জ্বর উঠে গেল পাঁচ সাত ডিগ্রি, ভূষণ চোখ উলটে গোঁ–গোঁ করছে, ডাক্তার নাড়ি ধরে গম্ভীর মুখে বসে আছে আর ঘড়ি দেখছে, অ্যাঁ। তখন কী করবে ঝুমকো? বুকের ওপর পড়ে, ‘ওগো, পায়ে পড়ি…’ এই সব বলবে না? অ্যাঁ! কাণ্ডটা কী হবে তখন!
বেজায় শীত পড়েছে এবার। সকালের রোদটাও বড্ড ঢিমে। একটা মোটা খদ্দরের চাদর জড়িয়ে ভূষণ বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। বন্ধুবান্ধবরা আজকাল তাকে দেখলেই মুখ বেজার করছে। সেদিন ফণী তো বলেই ফেলল, উরে বাব্বা, তোর ঝুমকোলতার গল্প শুনতে-শুনতে যে আঁত শুকিয়ে গেল বাপ।
তা ভূষণই বা করে কী? ঝুমকোলতার কথা ছাড়া তার যে আর কথা আসছে না গত তিন-চার দিন। এখনও মেলা কথা বলার বাকি।
ছোলাখেত বাঁয়ে রেখে হনহন করে হাঁটছে ভূষণ। পাশের গাঁ হল মুনসির চক। গোকুল থাকে। এমনিতে গোকলোটা যাকে বলে গর্ভস্রাব। ধান বলতে কান বোঝে। কিন্তু তার কাছে কথা বলে সুখ আছে। যাই বল না কেন, হাসি-হাসি মুখ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনবে, ফোড়ন কাটবে না, বিরক্ত হবে না, উঠি–উঠি করবে না, কাজ দেখাবে না। আজ গোকলোকে পাকড়াও করতে হবে। পেটে ঝুমকোলতার গল্প ভুড়ভুড়ি কাটছে। না বললেই নয়। এ গাঁয়ের বন্ধুগুলো বড্ড সেয়ানা হয়ে গেছে।
.
মনসাতলায় অশ্বত্থ গাছের নীচে বাঁধানো জায়গাটায় কয়েকজন বসে আছে গোমড়া মুখে। একজন তুলসীজ্যাঠা। তিনি ওষুধের বাক্স খুলে শিশি তুলে–তুলে নাম দেখছেন ওষুধের। ওরে ও ভূষণ, কোথা যাস?
ভূষণ জ্যাঠার ডাক শুনে একটু থমকায়। তারপর বলে, এই যাচ্ছিলাম একটু, কাজেই।
এদিকে যে লম্বোদর পরামানিকের হয়ে গেল। ঘাটখরচের জোগাড় নেই। একটু দেখবি বাবা?
ভুষণ একটু গরম হল। লম্বোদরের কী হল, বৃকোদরের কী হবে, দামোদরের কী হচ্ছে, এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারটাই বা কী আছে, তাই সে বোঝে না। যে যার মতো বেঁচে থাকছে, মরে যাচ্ছে, খাবি খাচ্ছে, দুনিয়ার তাই নিয়ম। থাক, যাক, খাক, তাতে তার কী?
তবু ভূষণ দাঁড়িয়ে গেল। যত যাই হোক, এই পাগল লোকটার তো বউ নেই, জীবনের স্বাদই পায়নি, মায়া হল ভূষণের।
–কী করতে হবে জ্যাঠা?
করার অনেক আছে। চারটে ছেলেপুলে, একটা মুখ বউ, ঘরে দানাপানির জোগাড় নেই। তা সে না হয় পরে ভাবা যাবে। আগে ঘাটখরচা তো তোলা লাগে। এই এরা সব বসে আছে ওষুধের জন্যে, আমি নড়তে পারছি না। একটু গাঁয়ের ঘরে-ঘরে ঘুরে খরচটা তুলে দিবি বাবা?
সে কী কথা? ঘুরব কেন? ঘাটখরচ নয় পকেট থেকেই দিয়ে দিচ্ছি!
তুলসীজ্যাঠা একগাল হাসলেন, দূর পাগল। ও বাহাদুরি ক’দিন? আজ লম্বোদর গেছে, কাল বিধু নস্কর যাবে, পরশু বিনোদ হাতি মরবে, কারোর ঘরে মামলোত নেই। ক’জনেরটা দিতে পারবি? তার চেয়ে ঘরে-ঘরে ঘোরা ভালো। পাঁচজনকে সমাজ–সচেতনও করা যায়, দশের কাজে নামানো যায়। যাবি বাবা?
ভূষণ তত্বটা বুঝল না। তবে একটু আঁচ করল। কথাটা খুব মন্দ নয়। একটু মাথা চুলকোল সে। তারপর বলল , আচ্ছা দেখছি।
যা বাবা, তুই পারবি।
দোনোমনো করে ভূষণ গাঁয়ের দিকে ফিরল। কাজটা খুব শক্ত নয়। সবাই তাকে চেনে। চাইলে দেবে।
দিলও। বেলা দশটা নাগাদ শুরু করেছিল ভূষণ। সাড়ে এগারোটার মধ্যে শ’আড়াই টাকা উঠে গেল। পাঁচ টাকা কম ছিল, সেটা নিজে পূরণ করে দিল।
লম্বোদর যখন মাচানে চেপে শ্মশানে রওনা দিল, তখন পড়ন্ত বেলা। চারটে ছেলেমেয়ে আর বউ কিছুটা শোকে, কিছুটা খিদেয় আর কিছুটা ভবিষ্যতের ভয়ে কাঁদছে লুটোপুটি খেয়ে।
দৃশ্যটা বেশিক্ষণ দেখতে পারল না ভূষণ। ঘরদোরের যা চেহারা, তাতে বোঝা যায়, এদের নুন পান্তা জুটলে সেদিন ভোজ।
ফেরার সময় তুলসীজ্যাঠা ছাতাটা মেলে ধরে বলল , আয়, ছাতার নীচে আয়। মুখটা রাঙা হয়ে গেছে তোর।
জ্যাঠার এত কাছাকাছি কখনও হয়নি ভূষণ। আজ তার বড় জিগ্যেস করতে ইচ্ছে করছিল, কীসের আনন্দে বেঁচে আছেন আপনি? কী সুখ পেয়েছেন জীবনে?
কিন্তু কথাটা সরল না মুখে। আনন্দেরও তো কোনও ঠিক–ঠিকানা নেই। কে যে কী থেকে আনন্দ পায়! কখনও ঝুমকোলতার স্নানের দৃশ্যে, কখনও লম্বোদরের ঘাটখরচ জোগাড়ে।
ট্যাংকি সাফ
ট্যাংকি সাফ করতে ষাট টাকা চেয়েছিল মাগন। চল্লিশ টাকায় রফা হয়েছে।
তো মাগন, সেপটিক ট্যাংকির লোহার চাক্কি কোদাল মেরে খুলে বুরবকের মতো চেয়ে রইল। আই বাপ! হাউস ফুল!
হাউস ফুল না হলে ট্যাংকি সাফ করায় কোন আহাম্মক? কিন্তু মুশকিল হল, মাগনের আজ কোনও পার্টনার নেই। কাল হোলি গেছে, আজ রবিবার, মরদরা আজও সব চলাচল জমি ধরে নিয়ে পড়ে আছ। এ বাত ঠিক যে মুর্দার কানে-কানে টাকার কথা বললে মুর্দাও গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে। কিন্তু মাতালরা তো মুর্দা নয়। আর তাদের উঠিয়েও কোনও লাভ নেই। টাকার লোভে কেউ হয়তো গার্দা সাফ করতে এসে ট্যাংকির মধ্যে পড়ে গজব হয়ে যাবে।
