পড়বে। স্মৃতিঘর বলে একটা চেম্বার আছে। সেখানে গিয়ে আপনি ইচ্ছে করলে যে-কোনও স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারবেন। আবার যে কোনও স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারবেন। আপনার যা ইচ্ছা।
মন যদি খারাপ হয় ?
এখানে মন খারাপ হয় না। পাশেই আনন্দ-ঘর আছে। সেখানে গিয়ে আনন্দের মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে নেবেন, তাহলেই হবে।
সবসময়ে আনন্দে থাকতে পারব?
অবশ্যই।
এ সময়ে দরজা খুলে ধৃতি ঘরে ঢুকল। বলল, বাঃ, এই তো যুবক হয়ে গেছেন।
আচ্ছা, আমি যদি আর একটু সুপুরুষ হতে চাই?
কোন বাধা নেই। আসুন।
এর পর ধৃতি তাকে বিভিন্ন ঘরে নিয়ে গিয়ে সুপুরুষ করে দিল। আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। পৃথিবীর স্মৃতি খানিকটা আবছা করে দিল।
সব হয়ে যাওয়ার পর বরুণবাবু বললেন, এবার কি হবে ধৃতি?
এখানে তো কিছুই হয় না।
একটা কাজ-টাজ কিছু দেবে না?
কাজ অনেক আছে। সেগুলো সবই যন্ত্র-মানুষেরা করে। ইচ্ছে করলে আপনিও করতে পারেন।
কিন্তু আমি যে এনজিনিয়ারিং জানি না।
চিন্তা নেই। বলে আর একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে এনজিনিয়ারিং মস্তিষ্ক চালু করা হলো বরুণবাবুর। তিনি দিব্যি কলকজার ব্যাপার বুঝতে শুরু করলেন।।
যদি ডাক্তার হতে চাই? তাও পারেন।
কবি?
তাও।
নাঃ, এ যে দেখছি সব পেয়েছির দেশ। এখানকার মানুষেরা তাহলে বেশ আরামেই আছে বলো। তোফা আছে।।
মানুষ! এখানে মানুষও নেই।
ওই যে কত জনকে দেখছি। কাজ-টাজ করছে।
কেউ মানুষ নয়। সব যন্ত্রের তৈরি।
বরুণবাবু আঁতকে উঠে বললেন, বলো কি হে! মানুষ কি তাহলে তুমি একা! আঁ!
ধৃতি একটু হেসে বলে, তাও নই। মানে?
আমিও মানুষ নই বরুণবাবু। যন্ত্র মাত্র। এই গ্রহে বহু লক্ষ বছর কোনও মানুষ নেই। একসময়ে ছিল। তারা আমাদের হাতে এই গ্রহ ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য গ্রহে, নীহারিকার ওপাশে অন্য নীহারিকায় চলে গেছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য আমাদের একজন মানুষ বড় দরকার ছিল। তাই আপনাকে আনা।
আঁ!
ভয় পেলেন নাকি?
হ্যা, আমার যে ভয় হচ্ছে।
ওই একটা জিনিসকেই আমরা জানতে চাই। ভয়। মানুষের ভয়কে আমরা জয় করতে পারিনি। কেন পারিনি তা জানার জন্যই আপনাকে আনা।
বরুণবাবু হঠাৎ বিকট গলায় বললেন, তাহলে কি এই গ্রহে আমি একা একটা মানুষ!
আজ্ঞে হ্যা।
ওরে বাবা রে! আমি কিছুতেই এখানে থাকব না..কিছুতেই না..ও ভাই ধৃতি, শিগগির আমাকে আমার নোংরা পৃথিবীতে দিয়ে এসো। রোগ-ভোগ বয়স মৃত্যু ওসব নিয়েই আমি থাকতে চাই.ও ভাই ধৃতি, তোমার পায়ে পড়ি…
এসপ্লানেড আ গয়া বাবু। উঠিয়ে।
পটাং করে চোখ মেললেন বরুণবাবু। ট্রাম এসপ্লানেডে এসে গেছে। চোখ কচলে তিনি চারদিকে চাইলেন। যা দেখছেন তা অতি সত্যি। এ কলকাতাই বটে। তিনি পৃথিবীতেই আছেন।
মস্ত একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন তিনি। নেমে পড়লেন। মনটায় বড় আনন্দ হচ্ছে।
শ্যামবাজারমুখে একখানা বাসে উঠে দেখলেন, বেশ লোকজন আছে। প্রথম যার সঙ্গে দেখা হলো তাকেই আনন্দের চোটে বললেন, খুব বাঁচা বেঁচে গেছি মশাই।
লোকটা কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
ঘুড়ি ও বৈদবাণী
অঘোরবাবু নিরীহ মানুষ। বড়ই রোগা-ভোগা। তার হার্ট খারাপ, মাজায় সায়াটিকার ব্যথা, পেটে এগারো রকমের অসুখ। অফিসে তার উন্নতি হয় না। কেউ পাত্তা দেয় না তাকে।
অঘোরবাবু ঘুড়ি ওড়াতে খুবই ভালবাসেন। তার শখ-শৌখিনতা বলতে ওই একটাই। ঘুড়ি তিনি নিজেই তৈরি করেন। মস্ত মস্ত ঘুড়ি। মোটা সুতো আর মস্ত লাটাই দিয়ে অনেক ওপরে ঘুড়ি ভাসিয়ে দেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাটাই ধরে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে বসে থাকেন।
সেদিন একটা কাণ্ড হলো। বিকেল বেলা ঘণ্টা দুয়েক ঘুড়ি ওড়ানোর পর অন্ধকার হয়ে আসায় লাটাই গুটিয়ে যখন ঘুড়িটা ছাদ থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছেন তখন মনে হলো ঘুড়ির গায়ে একটা কিছু যেন লেখা আছে। ঘরে এসে আলো জ্বেলে দেখলেন, সাদা ঘুড়িতে পরিষ্কার গোটা গোটা অক্ষরে বাংলায় লেখা, আগামী সতেরো তারিখে আপনার মৃত্যু হবে, যদি না একখানা আস্ত গায়ে-মাখা সাবান খেয়ে ফেলেন।
অঘোরবাবু ঘোরতর অবাক। প্রায় আধ কিলোমিটার উপরে উড়ন্ত ঘুড়ির গায়ে এই বিদকুটে কথাটা লিখল কে? ভৌতিক কাণ্ড নাকি? মহা ভাবিত হয়ে পড়লেন তিনি। পাশের বাড়িতেই পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক পরঞ্জয় প্রামাণিক থাকেন। অঘোরবাবুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাকে ডেকে ঘুড়ির গায়ে কথাটা দেখিয়ে বললেন, এটা কী করে সম্ভব হলো?
রঞ্জয় গম্ভীর হয়ে বললেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে সাবানটা খেও না, সাবান খেলে পেট খারাপ হয়। মনে হচ্ছে কেউ রসিকতা করেছে।
অঘোরবাবু বললেন, কিন্তু আকাশের অত ওপরে কোনও রসিকের তো থাকার কথা নয়। রসিকদের কি আজকাল ডানা গজাচ্ছে?
পরঞ্জয় এ প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারলেন না।
অঘোরবাবু হিসেব করে দেখলেন সতেরো তারিখের আর মোটে সাতদিন বাকি। অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে তিনি বাড়ির কাউকে কিছু না বলে বাথরুমে গিয়ে একখানা গায়ে-মাখা সাবান অত্যন্ত কষ্ট করে খেয়ে ফেললেন। সাবান যে খেতে এত বিচ্ছিরি তা তার জানা ছিল না।
পরঞ্জয়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। পরদিন অঘোরবাবু পেটের গোলমালে একেবারে কাহিল হয়ে পড়লেন। দুদিন লাগল বিছানা ছেড়ে উঠতে। বিকেলে তিনি আবার ঘুড়ি ওড়াতে ছাদে উঠলেন। এবং যথারীতি লাটাই গোটানোর পর দেখলেন ঘুড়ির গায়ে লেখা রয়েছে, আগামী সতেরো তারিখে আপনি মারা যাবেন, যদি না কৃষ্ণ কুণ্ডুর কান মলে দেন।
