কোনও আঁকুনি লাগল না, শব্দও হলো না। তবে শরীরটা হঠাৎ খুব হালকা লাগতে লাগল বরুণবাবুর। লোকটা মুখোমুখি বসে হাতের ছোট্ট যন্ত্রটা নিয়ে কি সব যেন করছে।
বরুণবাবু বাইরের দিকে চাইলেন। যা দেখলেন তাতে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ঘোর অন্ধকার আকাশে বিশাল বড় বড় সব সূর্য দেখা যাচ্ছে, সাঁ সাঁ করে পেরিয়ে যাচ্ছে আশপাশ দিয়ে।
লোকটা একটু হেসে বলল, আমরা এক সেকেন্ডেই পৌছে যেতে পারতাম। ইচ্ছে করেই একটু নীহারিকাটা পাক দিয়ে নিলাম। এসে গেছি।
শরীরটা আবার স্বাভাবিক লাগল বরুণবাবুর। লোকটা দরজা খুলে বলল, আমাদের গ্রহ আপনাকে স্বাগতম জানাচ্ছে বরুণবাবু। আসুন।
বরুণবাবু নামলেন। নেমেই টের পেলেন, পরিষ্কার বাতাসে তার বুক। ভরে গেল। অনেক তরতাজা লাগছে নিজেকে। চারদিকে চেয়ে দেখলেন, বাড়ি-ঘর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। রাস্তাঘাটও নয়। চারদিকে শুধুই নিবিড় জঙ্গল। আকাশে দু’দুটো চাদ, তার আলােয় চারদিকটা জ্যোৎস্নায় একেবারে ভেসে যাচ্ছে। বিশাল বড় বড় গাছ যেন মেঘ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে। আছে। তাদের গায়ে মোটা মোটা লতা পাকিয়ে উঠেছে। সুন্দর ফুলের গন্ধে ম-ম করছে বাতাস।
বরুণবাবু বললেন, এ তো দেখছি শুধুই জঙ্গল!
লোকটা মাথা নেড়ে বলে, ওপরটা আমরা জঙ্গলের আবরণই রেখে দিয়েছি। তাতে আবহমণ্ডল সুস্থ থাকে। বন্যজন্তুরও অভাব নেই। আমরা থাকি ভূগর্ভে।
এখানে দেখছি শীত নেই!
না। শীত গ্রীষ্ম কিছুই নেই। সবসময়েই বসন্তকাল। তবে মাঝে মাঝে। বৃষ্টি হয়।
এসব গাছপালা কি পৃথিবীর মতোই?
না তবে তুলসী, নিম এরকম কিছু গাছ এখানেও পাবেন। আর সব অন্যরকম।
আচ্ছা, আমি তো পৃথিবী থেকে আসছি, আমার কোনও ইনফেকশানের ভয় নেই তো এখানে?
লোকটা হাসল, না। কারণ মনোরথের মধ্যেই আপনাকে সূক্ষ্ম রশ্মি দিয়ে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে। আর আমাদের এই গ্রহে কোনও ক্ষতিকারক জীবাণুই নেই। এখানে কারও কখনও কোনও অসুখ করে না।
কক্ষনো না?
না বরুণবাবু। আমরা সম্পূর্ণ রোগমুক্ত। আমাদের কোনও হাসপাতাল নেই। ওষুধ তৈরি হয় না।
বরুণবাবু উত্তেজিত হয়ে বলেন, কিন্তু হার্ট অ্যাটাক হলে?
তাও হয় না। আমার চল্লিশ হাজার তিনশো একানব্বই বছর বয়েসে কখনও কোনও অসুখ-বিসুখ হয়নি।
আঁ! কত বললেন?
চল্লিশ হাজার তিনশো একানব্বই বছর, আপনাদের হিসেবে। আমাদের এখানে অবশ্য এক বছর আপনাদের সাড়ে তিনশো বছরের সমান।
এই বলে লোকটা হাতের যন্ত্রটা টিপতেই পায়ের নীচে একটা আলােকিত সিঁড়ির মুখ খুলে গেল।
নীচে সারি সারি প্রকোষ্ঠ। লম্বা লম্বা হলঘর। করিডাের। চলন্ত সিঁড়ি। চলন্ত মেঝে। সব ঝকঝক তকতক করছে। কাচের আড়ালে দেখা যাচ্ছে। অনেক মানুষ নানা ধরনের অদ্ভুত যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছে।
আপনার নামটি কিন্তু আমাকে বলেননি স্যার।
আমার নাম ধূতি। আসুন, এই ঘর।
ঘরটা একটা কাচের বর্তুলাকার চেম্বার। তাকে একখানা যন্ত্রের সামনে টুলের মতো জিনিসে বসিয়ে ধূতি বলল, আপনার বয়সটা কমিয়ে দিচ্ছি। কত বছর বয়সে ফিরে যেতে চান ?
বরুণবাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, পঁচিশ ?
ঠিক আছে। বলে ধৃতি একটা বোতাম টিপে তাড়াতাড়ি বাইরে গিয়ে চেম্বারের দরজাটা সেঁটে দিল।
কোনও শব্দ নেই, কম্পন নেই। অথচ বরুণবাবু টের পাচ্ছেন তার শরীরের ভিতরে কি যেন একটা হয়ে যাচ্ছে। তিনি বদলে যাচ্ছেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বুঝতে পারলেন, প্রক্রিয়াটা থেমে গেছে। সামনে একটা ঘষা কাচের পর্দায় বাংলা অক্ষরে এই কটা কথা ফুটে উঠল, অভিনন্দন! আপনি এখন পঁচিশ বছরের যুবক।
বরুণবাবু যন্ত্রকেই জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, আবার যখন বুড়ো হবো তখন ফের বয়স কমানো যাবে কি?
পর্দায় ফুটে উঠল, আর কখনোই পঁচিশের বেশি বয়স হবে না আপনার। যেমন আছেন তেমনই চিরকাল থাকবেন।
চিরকাল বলতে?
চিরকাল বলতে চিরকাল। ইটারনিটি।
উরেব্বাস। তাহলে কতদিন বাঁচবো?
চিরকাল।
হার্ট অ্যাটাক, ব্লাড প্রেশার, স্ট্রোক এসব হবে না?
কস্মিনকালেও নয়।
খুব রিচ খাবার খেলেও নয়?
খাবার কেন খাবেন?
খাবো না ?
আপনার আর কখনও খিদেই হবে না।
বলেন কি?
খিদে হবে না, ঘুম পাবে না, ক্লান্তি আসবে না।
বটে! তাই তো আমার খিদের ভাবটা আর টের পাচ্ছি না, না?
কখনও পাবেন না।
তাহলে পুষ্টি হবে কি করে?
শরীরের ক্ষয় না হলে পূরণেরই বা কি প্রয়ােজন?
আচ্ছা জলতেষ্টা পাবে তো?
কেন পাবে?
বাথরুমও তো পাবে, তখন শরীরের জল বেরিয়ে যাবে না?
বাথরুমও পাবে না।
বড়ো বাইরে বা ছোটো বাইরে কোনওটাই নয় ?
না।
ব্যায়াম করার দরকার আছে কি? করতে পারেন, কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ নেই।
আচ্ছা ধরুন কেউ যদি আমাকে গুলি করে, কি ছোরা মারে বা আমি যদি আগুনে পুড়ে যাই তাহলেও মরব না?
না।
আমাদের বায়োনিক ল্যাবরেটরির অটোমেটিক মেশিন আবার আপনার সব কিছু নতুন করে দেবে। আপনি কিছুতেই মারা যেতে পারবেন না এখানে।
ব্যথা তো লাগবে।
তাও লাগবে না। ব্যথার স্নায়ু এখানে আনন্দের তরঙ্গ তোলে, ব্যথার নয়।
ওরে বাবা! এ তো সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড দেখছি।
কিছুই সাঙ্ঘাতিক নয়। খুব সোজা ব্যাপার।
আমি কিন্তু খুব ঘুমকাতুরে মানুষ।
শুয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু ঘুমানো অসম্ভব।
আর একটা কথা। পৃথিবীতে আমার বউ আর ছেলেপুলে, আত্মীয় আর বন্ধুবান্ধবেরা আছে, তাদের কথা তো আমার মনে পড়বে!
