অম্বিকাঁচরণ খেঁকিয়ে উঠে বলেন, “তুই জ্বরের কী বুঝিস? এ হলো নাড়ির জ্বর। ভিতরে ভিতরে গুমরে-গুমরে ওঠে।”
বরদাচরণ বুঝলেন, দাদু লড়তে চান না, কিন্তু না লড়লেও নয়। চারদিকে খবর রটে গেছে। কাতারে কাতারে লোক আসছে লড়াই দেখতে।
বরদাচরণ বা অম্বিকাঁচরণ জানেন না যে, ওদিকে শের সিংয়ের শিবিরেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভোররাত্রি থেকেই শের সিং তার নাতিকে বলছেন, “দ্যাখো ভাই, আমার পেটে খুব ব্যথা হয়েছে।”
নাতি বলল, “জীবনে তোমার কোনোদিন তো পেটে ব্যথা হয়নি দাদু!”
শের সিং খিঁচিয়ে ওঠেন, “হয়নি বলেই কি হতে নেই? আমার দারুণ ব্যথা হয়েছে, মনে হয় কলেরাই হলো বোধহয়।”
“কলেরা হলে তো ভেদবমি হয়।”
“তুই খুব বেশি জেনে গেছিস। কলেরা কতরকমের হয় জানিস? ভিতরে ভিতরে আমার ভেদবমি শুরু হয়ে গেছে।”
নাতি ফাঁপরে পড়ে গেল। লড়াই না হলে যে দাদুর সম্মান থাকবে না।
“বেলা বাড়তে লাগলো। অম্বিকাঁচরণ কম্বলমুড়ি দিয়ে সেই যে শুয়ে পড়েছেন, আর নড়াচড়ার নাম নেই। এদিকে শের সিং সেই যে বাথরুমে ঢুকে দরজা দিয়েছেন, আর বেরোনোর কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
অগত্যা বরদাচরণ দাদুর অবস্থার কথা জানাতে শের সিংয়ের কাছে। রওনা হলো, আর শের সিংয়ের নাতিও নিজের দাদুর কথা জানিয়ে ট্রফিটা ফেরত দিয়ে আসতে রওনা হলো অম্বিকাঁচরণের বাড়ি।
বরদাচরণ যখন শের সিংয়ের ঘরে এসে হাজির হলেন, তখনও শের সিং বাথরুমে।
বরদাচরণ খুব বিনয়ী গলায় ডাকলেন, “শেরদাদু! ও শেরদাদু!”
বাথরুমের ভিতর থেকে খুব সতর্ক গলায় শের সিং সাড়া দিলেন, “কে রে? কী চাই?”
বরদাচরণ খুব কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “শেরদাদু, আমি বরদাচরণ, আমার দাদু অম্বিকাঁচরণের সকাল থেকেই টাইফয়েড।”
‘‘অ্যাঁ!”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, ডাক্তাররা বলছে, ব্যামো খারাপের দিকে যেতে পারে।”
“সত্যি বলছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
সঙ্গে সঙ্গে বাথরুমের ভিতরে একটা রণহুঙ্কার শোনা গেল। তারপর দড়াম করে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে শের সিং হাঃ হাঃ করে অট্টহাস্য হেসে বললেন, “আরে এ তো আমি আগেই জানতাম। অম্বিকার মুরোদ কী তা সেই ষাট বছর আগেই আমার জানা হয়ে গেছে। লড়াইয়ের নামে যার জ্বর আসে সে আবার মরদ! ছোঃ ছোঃ।”
ওদিকে শের সিংয়ের নাতি কাচুমাচু মুখে গিয়ে অম্বিকাঁচরণের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল, “অম্বিকাদাদু! ও অম্বিকাদাদু!”
“কে?” কম্বলের ভিতর থেকে অম্বিকাঁচরণ ক্ষীণস্বরে বললেন, “কে?”
“আমি শের সিংয়ের নাতি। দাদুর যে ভোর-রাত্রি থেকে খুব ভেদবমি হচ্ছে। ডাক্তার বলছে কলেরা।”
“সত্যি তো?”
“আজ্ঞে সত্যি। দাদু তো বাথরুম থেকে বেরোতেই পারছেন না।”
কম্বলটা এক ঝটকায় নামিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন অম্বিকা। তারপর হাঃ হাঃ করে হেসে উঠে বললেন, “হবে না? ভয়ের চোটে পেটখারাপ হয়েছে। আমার আগেই জানা ছিল। মুর্শিদাবাদে সেই যে ওকে ধাবিপাটে আছাড় মেরেছিলাম, তা কি আর ও ভুলে গেছে?”
শের সিং আর অম্বিকাঁচরণ দু’জনেই ভাবলেন, লড়াইটা যখন হবেই না তখন ফুটবলমাঠে গিয়ে জনসাধারণের সামনে বুক ফুলিয়ে ওয়াকওভার নিয়ে আসবেন।
দু’জনেই তড়িঘড়ি রওনা হয়ে পড়েলেন আসরে। অম্বিকা জানেন শের সিংয়ের কলেরা। শের সিং জানেন অম্বিকার টাইফয়েড। দুজনেই তাই নিশ্চিন্ত।
ফুটবলমাঠ ভিড়ে ভিড়াক্কার। দুদিক থেকে দু’জনকে ঢুকতে দেখে লোকেরা হৈ-হৈ করে উঠল। অম্বিকা ভাবলেন, তাঁকে দেখেই লোকে হৈ চৈ করছে। শের সিং ভাবলেন, তাঁকে দেখে।
হুঙ্কার দিয়ে দু’জনেই লাফিয়ে পড়লেন দঙ্গলে। তারপরই দু’জনে নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলেন পরস্পরের দিকে। কেউই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
অম্বিকাঁচরণ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে একটা হাত শের সিংয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, “দ্যাখো তো নাড়িটা। জ্বর মনে হয় একশো এক ছাড়িয়ে গেল।”
শের সিং নাড়ি ধরে বললেন, “দুইয়ের কম না। এবার আমার পেটটা একটু টিপে দ্যাখো তো, বড় ব্যথা।”
অম্বিকা শের সিংয়ের পেট টিপে দেখে বললেন, “ও বাবা, কলেরার একেবারে মস্ত একটা ডেলা দেখছি যে!”
ব্যাপারটা বুঝতে জনসাধারণের একটু সময় লাগল বটে, তারপর হোঃ হোঃ করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সমস্ত মাঠ।
কৃপণ
কদম্ববাবু মানুষটা যতটা না গরিব তার চেয়ে ঢের বেশি কৃপণ। তিনি চণ্ডীপাঠ করেন কিনা কে জানে, তবে জুতো সেলাই যে করেন সবাই জানে। আর করেন মুচির পয়সা বাঁচাতে। তবে আরও একটা কারণ আছে। একবার এক মুচি তার জুতো সেলাই করতে নারাজ হয়ে বলেছিল, এটা তো জুতো নয়, জুতোর ভূত। ফেলে দিন গে। বাস্তবিকই জুতো এত ভেঁড়া আর তাপ্পি মারা যে সেলাই করার আর জায়গাও ছিল না। কিন্তু কদম্ববাবু দমলেন না। একটা গুণচুঁচ আর খানিকটা সুতো জোগাড় করে নিজেই লেগে গেলেন সেলাই করতে।
জুতো সেলাই থেকেই তাঁর ঝোঁক গেল অন্যান্য দিকে। জুতো যদি পারা যায় তাহলে ছাতাই বা পারা যাবে না কেন? সুতরাং ছেঁড়া ভাঙা ছাতাটাও নিজেই সারাতে বসে গেলেন। এরপর ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ, ছুতোরের কাজ, ছুরি-কাঁচি ধার দেওয়া, শিল কাটানো, ফুটো কলসি ঝালাই করা, ছোটখাটো দর্জির কাজ সবই নিজে করতে লাগলেন। এর ফলে যে উনি বাড়ির লোকের কাছে খুব বাহবা পান তা মোটেই নয়। বরং তার বউ আর ছেলেমেয়েরা তার এই কৃপণতায় খুবই লজ্জায় থাকে। বাইরের লোকের কাছে তাদের মুখ দেখানো ভার হয়।
