এই চিরকুট পেয়ে অম্বিকাঁচরণ তো মহা খাপ্পা। বাতাসে ঘুষি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বলতে লাগলেন, “ব্যাটা শের সিংয়ের এত সাহস! সেদিন লড়াইতে যে ওর লেংটি খুলে নিইনি, তাই ওর সাত জন্মের ভাগ্যি! এমন প্যাঁচ মেরেছিলাম যে ব্যাটা একেবারে কুমড়ো গড়াগড়ি। আবার বলে কিনা সেদিন ওই নাকি জিতেছিল। আয় না ব্যাটা, এখনও এই বুড়ো বয়সে ভেলকি দেখিয়ে তোকে এরোপ্লেন-পাঁচ মেরে ধোবিপাটে আছড়ে মারতে পারি কি না, দেখে যা!”
বরদাচরণ তাড়াতাড়ি দাদুকে ধরে বসিয়ে পাখার বাতাস-টাতাস দিয়ে একটু ঠাণ্ডা করে বললেন, “সেদিন কী ঘটেছিল তা বেশ বুঝতে পারছি। কিন্তু এতদিন পরে লোকটা আবার কুস্তি লড়তে চায় কেন, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। শের সিংয়ের বয়স এখন কত হবে বলো তো?”
অম্বিকাঁচরণ একটু চিন্তা করে বললেন, “আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় তো হবেই। তা তার এখন নব্বইয়ের কম না।”
চোখ কপালে তুলে বরদাচরণ বললেন, “নব্বই! এই বয়সেও লোকটা কুস্তি লড়তে চায়? নাঃ দাদু, লোকটা দেখছি সাঙ্ঘাতিক।”
অম্বিকাঁচরণ মাথা নেড়ে বললেন, “সাঙ্ঘাতিক তো বটেই। শের সিংয়ের নাম শের সিং হলো তো খালি হাতে একটা রয়েল বেঙ্গল বাঘ মেরে। আসামের জঙ্গলে বুনো মোষের সঙ্গেও নাকি একবার হাতাহাতি করেছিল। এমন দাপট ছিল যে, সহজে তার সঙ্গে কেউ লড়তে রাজি হতো না।”
বরদাচরণ বললেন, “এ-রকম লোককে একবার চোখের দেখা দেখে আসার দরকার। চলো দাদু, কাল তোমার সঙ্গে আমিও যাব।”
পরদিন অম্বিকাঁচরণ নাতি বরদাচরণের হাত ধরে বেরিয়ে পড়লেন। জেমিনি হোটেল তাদের বাড়ি থেকে বেশি দূরেও নয়। দোতলায় উঠে বারো নম্বর ঘরের বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিয়ে অম্বিকাঁচরণ বাজখাই গলায় চেঁচাতে লাগলেন, “কোথায় শের সিং? বেরিয়ে আয় ব্যাটা। অম্বিকাকে চিনিস না! আজ তোরই একদিন কী আমারই একদিন।”
ঘরের ভিতর থেকে একটা হুঙ্কার শোনা গেল। “এসেছিস? সিংহের গুহায় শেষে ঢুকবার মতো সাহস হলো তোর!”
বলতে বলতে দড়াম করে দরজা খুলে গেল!
শের সিংকে দেখে বরদাচরণের চোখ ছানাবড়া। পঁচাশি বছরেও তার দাদু অম্বিকাঁচরণের স্বাস্থ্য যথেষ্ট ভাল বটে, কিন্তু নব্বইতে শের সিং যেন প্রকৃতই সিংহ। ইয়া বুকের ছাতি, বিশাল দুটো শালখুটির মতো হাত, পাকানো মোচ, বাবরি চুল।
দুজনেই দুজনের দিকে কিছুক্ষণ রোষকষায়িত লোচনে চেয়ে রইলেন। পাছে এখানে দুজনেই লেগে যায়, সেই ভয়ে বরদাচরণ তাড়াতাড়ি দু’জনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন।
শের সিং জিজ্ঞাসা করলেন, “এটি কে?”
অম্বিকা বললেন, “নাতি।”
শের সিং সঙ্গে সঙ্গে ভারী নরম হয়ে বললেন, “নাতি! তা আগে বলতে হয়। এসো খোকা, এসো, তোমার দাদুর সঙ্গে ঝগড়া আছে বটে, কিন্তু তোমার সঙ্গে তো নেই। তা ছাড়া শিশুরা হচ্ছে জগতের আনন্দ।”
“খোকা” |||||||||| “শিশু” এইসব বিশেষণ শুনে বরদাচরণ হাসবেন কি কাঁদবেন তা বুঝতে পারছেন না।
ঘরে ঢুকে বরদা দেখেন বেশ লম্বাচওড়া চেহারার এক যুবক বসে বসে একটা পেতলের গামলায় পুঁটুনি দিয়ে বাদামের শরবত বানাচ্ছে। শের সিং বললেন, ‘অম্বিকা, এই দ্যাখো, এ হচ্ছে আমার নাতি। ও ভাবে, আমি বুড়ো হয়েছি, তাই সব সময়ে সঙ্গে সঙ্গে থাকে।”
অম্বিকাঁচরণ যুবকটির থুতনি নেড়ে দিয়ে বললেন, “বাঃ বাঃ দিব্যি দেখতে হয়েছে তো খোকাটিকে!”
শের সিং বললেন, “কাজিয়া পরে হবে। আগে শরবত খাও।”
অম্বিকা বললেন, “শরবত না হয় খাচ্ছি। কিন্তু আমার বাড়িতে এ কদিন যে দুটো ডালভাত খেতেই হবে শের সিং।”
এরপর দু’পক্ষের বেশ সম্ভাব হয়ে গেল। অনেকক্ষণ বসে দু’জন নানা কথা কইলেন। হাসিঠাট্টাও হলো। গল্পগুজবে অনেকটা বেলা কাবার করে অম্বিকা উঠলেন। বরদাচরণ স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন, দুই বুড়োর কুস্তিটা বোধহয় এড়ানো গেল।
কিন্তু বিদায় দেওয়ার সময় শের সিং হঠাৎ বললেন, “তাহলে অম্বিকা, কুস্তিটা কবে হচ্ছে?”
অম্বিকাঁচরণ সতেজে বললেন, “যেদিন বলবে। কাল বললে কাল।”
“তাহলে কালই, ভাড়া পিটিয়ে দাও। ফুটবল মাঠে দু’জনে নেমে পড়ব।”
“তাই হবে।”
খবরটা বিদ্যুৎবেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অতীতের বিখ্যাত পালোয়ান শের সিং যে এখনও বেঁচে আছেন তাই অনেকে জানত না, তার ওপর অম্বিকাঁচরণ যে একদা শের সিংকে হারিয়েছিলেন সে খবরও অনেকের অজ্ঞাত। সুতরাং তুমুল উত্তেজনা দেখা দিল। রাতারাতি ফুটবলমাঠের মাঝখানে কুস্তির মাটি তৈরি হয়ে গেল। চারদিকে চেয়ার বেঞ্চি সাজানো হতে লাগল। ভিড় সামলানোর জন্য বাঁশের বেড়া তৈরি হলো। সকাল থেকে ছেলে-মেয়ে-বুড়ো-বাচ্চা কাতারে কাতারে এসে চারদিকে জায়গা দখল করতে লাগল। পঁচাশি বছরের একজন মানুষের সঙ্গে নব্বই বছর বয়সী আর-একজনের লড়াই। সোজা কথা তো নয়!
কিন্তু মুশকিল হল, অম্বিকাঁচরণের সকাল থেকেই শরীর খারাপ, সকাল থেকেই রোদে বসে বারবার বগলে থার্মোমিটার দিচ্ছেন। বরদাচরণকে ডেকে বলছেন, “দ্যাখ তো দাদু, কত উঠল।”
বরদাচরণ থার্মোমিটার দেখে বলেন, “সাড়ে সাতানব্বইতেই তো দাঁড়িয়ে আছে দেখছি।”
“থার্মোমিটারটা তাহলে একেবারেই গেছে। আমার তো মনে হয় এক শো এক-এর কম না। দে তো, আবার লাগিয়ে দেখি।”
বরদাচরণ দাদুর কপালে হাত দিয়ে বলেন, “রোদে বসে গা একটু গরম হয়েছে বটে, কিন্তু জ্বর বলে তো মনে হয় না।”
