রাজা অবাক হলেও স্মিত হাসলেন। হাই তুলে বললেন, “বেশ বেশ, মন দিয়ে কাজ করো।”
তারপর রাজা যেখানে যান পেছনে রাখহরি ফিঙের মতো লেগে থাকে।
দুপুর পর্যন্ত বেশ কাটল। দুপুরে খাওয়ার পর পান চিবোতে চিবোতে রাজা হঠাৎ বললেন, “চিমটি দে। রাম চিমটি দে।”
সঙ্গে সঙ্গে রাখহরি পেটে এক বিশাল চিমটি বসিয়ে দিল। রাজা আঁক করে উঠে বললেন, “করিস কী, করিস কী? ওরে বাবা!”
রাখহরি বলল, “বললেন যে।” পেটে হাত বোলাতে বোলাতে রাজা কিন্তু হাসলেন। আবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। রাজা বাগানে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ বলে উঠলেন “ল্যাঙ মেরে ফেলে দে।” বলতে না বলতেই রাখহরি ল্যাঙ মারল। রাজা চিতপটাং হয়ে পড়ে চোখ পিটপিট করতে লাগলেন। রাখহরি রাজার গায়ের ধূলোটুলো ঝেড়ে দাঁড় করিয়ে রাজার পায়ের ধূলো নিল। রাজা শাস ফেলে বললেন, “স্থ।”
রাত পর্যন্ত রাজা আর কোনও ঝামেলা করলেন না। রাখহরি রাজার পিছু-পিছু শোওয়ার ঘরে ঢুকল এবং রাজার সামনেই একটা আলমারির ধারে লুকিয়ে রইল। রাজা আড়চোখে দেখে একটু হাসলেন। আপত্তি করলেন না। তবে শোওয়ার কিছুক্ষণ পরেই রাজা হঠাৎ খুঁতখুঁত করে বলে উঠলেন, “ঠাণ্ডা জলে চান করব, ঠাণ্ডা জলে”…রাখহরি বিদ্যুৎগতিতে রাজার ঘরের সোনার কলসের কেওড়া আর গোলাপের সুগন্ধ মেশানো জলটা সবটুকু রাজার গায়ে ঢেলে দিল।
রাজা চমকে হেঁচে কেসে উঠে বসলেন। কিন্তু খুব অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে মনে হল না। রাখহরির দিকে চেয়ে একটু হেসে বললেন, “আচ্ছা শুগে যা।”
রাখহরি অবশ্য শুতে গেল না। পাহারায় রইল।
সকালে উঠে রাজা হাই তুলে হঠাৎ বলে উঠলেন, “দে, বুকে ছোরা বসিয়ে দে”..চকিতে রাখহরি কোমরের ছোরাখানা খুলে রাজার বুকে ধরল।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রাজা বললেন, “থাক, থাক্, ওতেই হবে। তোর কথা আমার মনে ছিল না।”
রাখহরি ছোরাটা খাপে ভরতেই রাজা হোঃ হোঃ করে হাসতে লাগলেন। সে এমন হাসি যে রাজবাড়ির সব লোকজন ছুটে এল। রাজা হাসতে হাসতে দু’হাতে পেট চেপে ধরে বললেন, “ওরে আমার যে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে! ভীষণ হাসি পাচ্ছে।”
খবর পেয়ে মন্ত্রীও এসেছেন। রাজার বুকে-পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘যাক্ বাবা! মন খারাপটা গেছে তাহলে।”
হাসতে হাসতে রাজা বিষম খেয়ে বললেন, “ওঃ হোঃ হোঃ! কী আনন্দ! কী আনন্দ!”
তারপর থেকে রাজার মন খারাপ কেটে গেল। কিন্তু নতুন একটা সমস্যা দেখা গেল আবার। কারণ নেই কিছু নেই রাজা সব সময়ে কেবল ফিক-ফিক করে হেসে ফেলছেন। খুব দুসংবাদ দিলেও হাসতে থাকেন। যুদ্ধে হার হয়েছে? ফিক-ফিক। অমুক মারা গেছে? ফিক-ফিক। রাজ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে? ফিক-ফিক। দক্ষিণের রাজ্যের প্রজারা বিদ্রোহ করেছে? ফিক-ফিক।
রাজার হাসি বন্ধ করবার জন্য মন্ত্রীকে এখন আবার দ্বিগুণ ভাবতে হচ্ছে।
রামবাবু এবং কানাই কুণ্ডু
রামবাবুর খুব সর্দি হয়েছিল। বন্ধু শ্যাম কবিরাজ তাঁকে এক পুরিয়া কবরেজি নস্যি দিয়ে বললেন, শোওয়ার আগে এক টিপ টেনে শুয়ে পোড়ো।
তাই করলেন রামবাবু। ঘুম ভেঙে উঠে সকালে বেশ ঝরঝরে লাগল শরীরটা।
সকালবেলা দাড়ি কামাতে গিয়ে রামবাবু আয়নায় আবিষ্কার করলেন যে, তার বাঁ গালে একটা কালো এবং বড় জড়ুল দেখা দিয়েছে। প্রথমটায় ভেবেছিলেন কালির দাগ। আঙুল দিয়ে ঘষে দেখলেন, তা নয়, জডুলই। তবে আচমকা গালে একটা জড়ল দেখে রামবাবুর যতটা বিরক্ত বা বিস্মিত হওয়া উচিত ছিল ততটা হলেন না। কারণ, জড়লটা তার ফর্সা গালে মানিয়েছে ভাল।
ফর্সা! রামবাবু দাড়ি কামাতে কামাতে আবার একবার থমকালেন, ফর্সা? তিনি তো কস্মিনকালেও ফর্সা নন। বেশ কালোই তার গায়ের রঙ। তাহলে এরকম ধপধপে ফর্সাই বা তাকে লাগছে কেন এখন? রামবাবু জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ফুটফুটে আলোয় হাত-আয়না দিয়ে মুখখানা দেখলেন। নাঃ, দারুণ ফর্সাই তো তিনি! লোকে যে এতকাল কেন তাকে কালো বলে বদনাম দিয়ে এসেছে!
যাকগে, রামবাবু আজ বেশ খোশমেজাজেই দাড়ি কামিয়ে চান সেরে নিলেন। মাথা জোড়া টাক বলে রামবাবুকে চুল আঁচড়ানোর বিশেষ ঝক্কি পোয়াতে হয় না। ঘাড় আর জুলপি আঁচড়ে নিলেই চলে।
কিন্তু আজ রামবাবু চুল সামলাতে একেবারে হিমসিম খেয়ে গেলেন। মাথা ভর্তি কালো কুচকুচে এবং ঢেউ খেলানো চুল যে কোথা থেকে এল তা রামবাবু হদিস করতে পারলেন না। কিন্তু অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে। এসব ব্যাপার নিয়ে ভাববার মতো ফুরসৎ হাতে নেই।
বাথরুম থেকে বেরিয়েই রামবাবু একটা হাঁক মারলেন, গিন্নি, খেতে দাও। তারপর চটপট পোশাক পরে ফেললেন।
তার গিন্নি বেশ মোটাসোটা, একটু থপথপে, গম্ভীর প্রকৃতির। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে তিনি রামবাবুর দিকে তার গম্ভীর চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, আপনি বাইরের ঘরে গিয়ে বসুন। উনি বাথরুমে গেছেন।
এটা কিরকম রসিকতা তা রামবাবু বুঝে উঠতে পারলেন না। তার গিন্নি খুব রসিক প্রকৃতির মানুষও নন।
রামবাবুকে খুব একটা বোকা বলা যায় না। তিনি একটু ভাবলেন এবং ফের বড় আয়নায় ভাল করে নিজেকে দেখলেন। বছর পঁচিশেক বয়সের বেশ কার্তিক ঠাকুরের মতো চেহারাবিশিষ্ট এই লোকটা যে তিনি নন তা টের পেতে আর এক লহমাও দেরি হল না তার।
প্রথমটায় একটু আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও শেষ অবধি খুশিই হলেন রামবাবু। টাকওলা, কালো এবং নাদুসনুদুস চেহারার যে মানুষটা তিনি ছিলেন তাকে তার বিশেষ পছন্দ ছিল না।
