মন্ত্রীর বিড়বিড় করা থেমে গেল। রাজার সুমুখে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বললেন, “যে হুকুম মহারাজ। শুধু বুড়ির নামটা বলুন।”
রাজা অবাক হয়ে বললেন, “কী বললাম বলো তো?”
“আজ্ঞে, এই যে বুড়ীর ঘরে আগুন দিতে বললেন।” রাজা ঘাড় চুলকে বললেন, “বলেছি নাকি? আচ্ছা, একটু ভেবে দেখি।”
সেইদিনই শেষ রাতে রাজা ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে বললেন, “বিছুটি লাগা। শিগগির বিছুটি লাগা।”
পরদিনই খবর রটে গেল, রাজা বিছুটি লাগাতে বলেছেন। আতঙ্কে সবাই অস্থির।
মন্ত্রী রাজার কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ! কাকে বিছুটি লাগাতে হবে তার নামটা একবার বলুন, বিছুটি আনতে পশ্চিমের পাহাড়ে লোক পাঠিয়েছি।”
“বিছুটি!” বলে রাজা অবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগলেন।
পশ্চিমের পাহাড়ের গায়ে সূর্য ঢলে পড়ল। গরুর গাড়ি বোঝাই বিছুটি এনে রাজবাড়ির সামনের অঙ্গনে জমা করা হয়েছে। রাজার সেদিকে মন নেই।
রাজা রঘরে বসে বয়স্যদের সঙ্গে যুঁটি সাজিয়ে দাবা খেলছেন। মুখ গম্ভীর, চোখে অন্যমনস্ক একটা ভাব। বয়স্যরা ভয়ে ভয়ে ভুল চাল দিয়ে রাজাকে জিতবার সুবিধে করে দিচ্ছেন। কিন্তু রাজা দিচ্ছেন আরও মারাত্মক ভুল চাল।
খেলতে খেলতে রাজা একবার গড়গড়ার নলে মৃদু একটা টান দিয়ে বললেন, “পুঁতে ফেললে কেমন হয়?”
মন্ত্রী কাছেই ছিলেন। বিড়বিড় করা থামিয়ে বিগলিত হয়ে বললেন, “খুব ভাল হয় মহারাজ। শুধু একবার হুকুম করুন।”
রাজা আকাশ থেকে পড়ে বললেন, “কিসের ভাল হয়? কিছুতেই ভাল হবে না মন্ত্রী। মনটা একদম খারাপ।”
মন্ত্রী বিমর্ষ হয়ে আবার বিড়বিড় করতে লাগলেন।
পরদিন রাজা শিকারে গেলেন। সঙ্গে বিস্তর লোকলস্কর, অস্ত্রশস্ত্র, ঘোড়া, রথ। বনের মধ্যে রাজার শিকারের সুবিধের জন্যই হরিণ, খরগোশ, পাখি ইত্যাদি বেঁধে বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে। একটা বাঘও আছে। রাজা ঘোড়ার পিঠে বসে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ঘুরে দেখলেন, কিন্তু একটাও তীর ছুঁড়লেন না। দুপুরে বনভোজনে বসে পোলাও দিয়ে মাংসের ঝোল মেখে খেতে খেতে বলে উঠলেন, “বাপ রে! ভীষণ ভূত!”
মন্ত্রীমশাই সঙ্গে সঙ্গে মাংসের হাত মাথায় মুছে উঠে পড়লেন। রাজামশাইয়ের সামনে এসে বললেন, “তাই বলুন মহারাজ! ভূত! তা তারই বা ভাবনা কী? ভূতের রোজাকে ধরে আনাচ্ছি, রাজ্যে যত ভূত আছে ধরে ধরে সব শুলে দেওয়া হবে।”
রাজা হাঁ করে রইলেন। বললেন, “ভূত! না না ভূত নয়। ভূত হবে কী করে? ভূতের কি কখনো মাথা ধরে?”
মন্ত্রীমশাই আশার আলো দেখতে পেয়ে বিগলিত হয়ে বললেন, “মাথা ধরলেও ভূতবদ্যি আছে। তারা ভূতের ওষুধ জানে।”
রাজা গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমি ভূতের কথা ভাবছি না। মনটা বড় খারাপ।”
কয়েকদিন পর রাজা এক জ্যোৎস্না রাতে অন্দর মহলের অলিন্দে রানীর পাশাপাশি বসে ছিলেন। হঠাৎ বললেন, “চলো রানী, চাঁদের আলোয় বসে পান্তাভাত খাই।”
রানী তো প্রথমে অবাক। তারপর তাড়াতাড়ি মন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। মন্ত্রী এসে হাতজোড় করে বললেন, “তা এ আর বেশি কথা কী? ওরে, তোরা সব পান্তাভাতের জোগাড় কর।”
রাজা অবাক হয়ে বললেন, “পান্তাভাত? পান্তাভাতটা কী জিনিস বলো তো?”
“জলে ভেজানো ভাত মহারাজ, গরিবরা খায়। কিন্তু আপনি নিজেই তো পান্তাভাতের কথা বললেন।”
“বলেছি! তা হবে। কখন যে কী বলি। মনটা ভাল নেই তো, তাই।” মন্ত্রীমশাই ফিরে গেলেন। তবে সেই রাত্রেই তিনি রাজ্যের সবচেয়ে সেরা বাছা বাছা চারজন গুপ্তচরকে ডেকে বললেন, “ওরে তোরা আজ পালা করে রাজামশাইয়ের ওপর নজর রাখবি। চব্বিশ ঘণ্টা।”
পরদিনই এক গুপ্তচর এসে খবর দিল, “রাজামশাই ভোর রাত্রে বিছানা থেকে নেমে অনেকক্ষণ হামা দিয়েছেন ঘরের মেঝেয়।”
আর একজন বলল, “রাজামশাই একা একাই লাল জামা নেব, লাল জামা নেব, বলে খুকখুক করে কাঁদছেন।”
আর একজন এসে খবর দিল, “রাজামশাই এক দাসীর বাচ্চা ছেলের হাত থেকে একটা মণ্ডা কেড়ে নিজেই খেয়ে ফেললেন এই মাত্র।”
চতুর্থ জন বলল, “আমি অতশত জানি না, শুধু শুনলাম রাজামশাই খুব ঘন ঘন ঢেঁকুর তুলছেন আর বলছেন–সবই তো হল, আর কেন?”
মন্ত্রীর মাথা আরও গরম হল। তবু বললেন, “ঠিক আছে, নজর রেখে যা।”
পরদিনই প্রথম গুপ্তচর এসে বলল, “আজ্ঞে রাজামশাই আমাকে ধরে ফেলেছেন। রাত্রে শোওয়ার ঘরের জানালা দিয়ে যেই উঁকি দিয়েছি, দেখি রাজামশাই আমার দিকেই চেয়ে আছেন। দেখে বললেন, নজর রাখছিস? রাখ’ বলে চোখ বুজে শুয়ে পড়লেন।”
দ্বিতীয় জন এসে বললে, “আজ্ঞে আমি ছিলাম রাজার খাটের তলায়। মাঝরাতে রাজামশাই হামাগুড়ি দিয়ে এসে আমাকে বললেন, কানে কেন্নো ঢুকবে, বেরিয়ে আয়।”
তৃতীয় জন কান চুলকে লাজুক লাজুক ভাব করে বলল, “আজ্ঞে আমি রাজার কুঞ্জবনে রাজার ভূঁইমালী সেজে গাছ ছাঁটছিলাম। রাজা ডেকে খুব আদরের গলায় বললেন, ‘ওরে, ভাল গুপ্তচর হতে গেলে সব কাজ শিখতে হয়। ওভাবে কেউ গাছ ছাঁটে নাকি? আয় তোকে শিখিয়ে দিই। বলে রাজা নিজেই গাছ ঘেঁটে দেখিয়ে দিলেন।”
কিন্তু সবচেয়ে তুখোড় যে গুপ্তচর সেই রাখহরি তখনও এসে পৌঁছয়নি। মন্ত্রী একটু চিন্তায় পড়লেন।
ওদিকে রাখহরি কিন্তু বেশি কলাকৌশল করতে যায়নি। সকালবেলা রাজার শোওয়ার ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। রাজা বেরোতেই প্রণাম করে বলল, “মহারাজ, আমি গুপ্তচর রাখহরি আপনার ওপর নজর রাখছি।”
