ফ্রান্সিস ওসব আর ভেবো না। হ্যারি ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রাখল। বলল–তোমরা নিশ্চয়ই জাহাজ নিয়ে এসেছে।
–হ্যাঁ, তেকরুর বন্দরে জাহাজ রয়েছে।
–তাহলে এখন আমাদের একটা কাজ–যে করেই হোক হীরে দু’টো জাহাজে তোলা। গাড়ি ছুটে চলল। ফ্রান্সিস আর রিঙ্গো দুজনেই যথাসাধ্য দ্রুত গাড়ি চালাবার চেষ্টা করছে। দিগন্তবিস্তৃত মেঠো জমিতে পড়ে রাত্তিরেও গাড়ি চালাতে লাগল। গাইডটির নির্দেশে চলে ওরা পথটা আরো সংক্ষিপ্ত করে নিল। এই সংক্ষিপ্ত পথে নাকি সিংহের ভয় আছে। কিন্তু কপাল ভাল বলতে হবে সামনাসামনি কোন সিংহ পড়েনি।
***
দু’দিন পরে এক সন্ধ্যায় ওরা তেকরুর বন্দরে এসে পৌঁছল। সঙ্গের গাইডটিকে এবার বিদায় দিল ওরা। ওকে পুঁতির মালা, আয়না, চিরুনি দিল, গাইডটা খুশী হল।
ফ্রান্সিসের জাহাজের-বন্ধুরা হইহই করে উঠল। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখতে লাগল হীরের খণ্ড দুটি। তারপরেই আনন্দে কেউ-কেউ হেঁড়ে গলায় গান ধরলনাচতে লাগল কেউ-কেউ। ফ্রান্সিস গাড়িতে দাঁড়িয়ে সবাইকে ডেকে বলল–ভাইসব, এখনও নিশ্চিন্ত হবার সময় আসেনি। আনন্দ করার সময় পরে অনেক পাবে। এখন হীরে দু’টো জাহাজে তোলার জন্যে সবাই হাত লাগাও।
হীরেদু’টো গাড়ি থেকে নামাতে রাত হয়ে গেল। চারদিক মশাল পুঁতে তারই আলোতে কাজ চললো। এবার হীরে দুটো জাহাজে তোলার জন্য সবাই কাঁধ লাগালো। জাহাজে ওঠার পাটাতনে সাবধানে পা ফেলে একটা হীরের খণ্ড জাহাজে তোলা হল। দুর্ঘটনা কিছু ঘটল না। তবে একজন পা পিছলে সমুদ্রের জলে পড়ে গেল। জাহাজ থেকে দড়ি ফেল হল। লোকটি নিজেই দড়ি বেয়ে জাহজে উঠে এল। ফ্রান্সিস সবাইকে ডেকে বলল আমাদের এক্ষুনি জাহাজ ছেড়ে দিতে হবে। এখানে এক মুহূর্তও আর দেরী করবো না আমরা।
ঘড়ঘড় শব্দে নোঙর তোলা হলো। পাল খাটানো হলো। হাওয়া লাগতেই পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজ চললো গভীর সমুদ্রের দিকে।
জাহাজে ততক্ষণে মশাল হাতে নাচ শুরু হয়ে গেছে। গান গাওয়া চলল সেই সঙ্গে। সবাই জুটলো সেখানে হীরের খণ্ডদু’টোর চারপাশে ঘুরে-ঘুরে সবাইনাচতে লাগল। শুধু ফ্রান্সিস একা ডেকে-এ দাঁড়িয়ে তেকরুর বন্দরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বারবার মকবুলের কথা মনে পড়তে লাগল। চোখ ঝাপসা হয়ে এল বারবার। তেকরুর বন্দরের আলো আস্তে-আস্তে দূরে মিলিয়ে গেল। চোখ মুছে তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
। শেষ ।
মুক্তোর সমুদ্র – ফ্রান্সিস সমগ্র – অনিল ভৌমিক
‘যদি চিরদিনের জন্য যাও, তবে মুক্তোর সমুদ্রে যাও। –‘ভাজিম্বা’দের প্রবাদ
ফ্রান্সিসদের জাহাজ পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলের বন্দর ছেড়ে এসেছে অনেকক্ষণ। জাহাজএখন মাঝসমুদ্রে। নির্মেঘ আকাশে বাতাসে তেমন জোর নেই। সমুদ্রও তাই শান্ত। জাহাজের ডেক এর ওপর পায়চারী করছিল ফ্রান্সিস। ভাবছিল, আফ্রিকা থেকে হীরে নিয়ে আসার কষ্টকর অভিজ্ঞতার কথা। সেই সঙ্গে বারবার মনে পড়ছিল মোরান উপজাতিদের হাতে মকবুলের নির্মম মৃত্যুর কথা। বারবার চোখে জল আসছিল এইকথা ভেবে। মকবুলকেও বাঁচাতে পারল না। নিজের জীবনের বিনিময়ে মকবুলই তাকে বাঁচাবার পথ করে দিলো। পায়চারী করতে করতে ফ্রান্সিস এসে দাঁড়াল ডেক-এ রাখা গাড়ি দু’টোর কাছে। বিরাট হীরের খন্ডদু’টো গাড়িতে রাখা। কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে জাহাজের সকলেই একবার করে হীরে দু’টো দেখে যাচ্ছে। কী বিরাট হীরের টুকরো দু’টো! তাদের চোখে বিস্ময়ের শেষ নেই। ফ্রান্সিস হীরে দু’টোর কাছে–দাঁড়াল। তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশে গভীর লাল সূর্যটা জলের ঢেউয়ের মাথায়। পশ্চিম দিগন্ত থেকে প্রায় মাঝ আকাশ পর্যন্ত লাল রঙের শব্দহীন ঢেউ। সেই আলো পড়েছে। জাহাজে। হীরেদু’টো লাল রঙের সেই রঙীন আলোয় স্বপ্নময় হয়ে উঠেছে। অনেকেই চারপাশে ভীড় করে সেই অপরূপ রঙের খেলা দেখছে। ঢেউ ছোঁয়া দিগন্তে আস্তে আস্তে সূর্য অস্ত গেল। তারপরেও পশ্চিমাকাশে লাল আলোর ছাপ রইল অনেকক্ষণ। তারপর অন্ধকার নামতে হীরে দু’টোর গায়েও আলোর খেলা মিলিয়ে গেল।
ফ্রান্সিস ডেকের ধারে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। আকাশে ততক্ষণে তারা ফুটে উঠেছে। নিষ্প্রভ ভাঙা চাঁদটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটা নরম জ্যোৎস্না-ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।
হ্যারি কাছে এসে ডাকল–ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস ফিরে তাকিয়ে হ্যারিকে দেখে বলল–হুঁ।
তারপর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলো।
–এবার ঘরে ফেরা যাক্, তুমি কি বলো? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ–ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
–মনে হচ্ছে, তুমি এতেও খুব খুশী নও? হ্যারি হেসে বললো।
ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। বললো সত্যিই আমি খুশী নই। কী হবে ফিরে গিয়ে? আবার তো সেই সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন। উদ্দেশ্যহীন একঘেঁয়ে জীবন, খাও-দাও ঘুমোও।
–আবার বেড়িয়ে পড়বে ভাবছো।
–দেখি–
হ্যারি হাসল–তুমি আর বেরোতে পারবে বলে মনে হয় না।
–কেন?
–রাজাকে এর আগে সোনার ঘন্টা এনে দিয়েছে, এবার অতবড় দু’টো হীরে নিয়ে যাচ্ছে। এবার রাজামশাই তোমাকে নির্ঘাৎ সেনাপতি করে দেবে।
ফ্রান্সিস হাসলো–ওসব তালপাতার সেপাইগিরির মধ্যে নেই। ঠিক পালাবো আবার।
দু’জনে আর কোন কথা বললো না। হ্যারি একটু পরেই চলে গেল। ফ্রান্সিস দূরে অন্ধকারে সমুদ্র আর তারা ভরা দিগন্তের দিকে তাকিয়ে নানা কথা ভাবতে লাগল।
