–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
তখন সবে ভোর হয়েছে, গাইড এসে হাজির। অগত্যা ফ্রান্সিসকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হল। অনেক কষ্টে ফ্রান্সিস গাইডকে বোঝাল যে, ওরা উত্তর দিক দিয়ে ওঙ্গালির বাজারে যেতে চায়। গাইড মাথা ঝাঁকালো, অর্থাৎ সে ফ্রান্সিসের কথা বুঝতে পেরেছে।
সকালবেলা ঘোড়ার ডাকে, গাড়ির চাকায় ক্যাছ কেঁচ শব্দে লোকজনের কথাবার্তায় দুর্গপ্রাঙ্গণ মুখর হয়ে উঠল। সকলে কিছু খেয়ে নিল। তারপর গাড়িতে গোছ-গাছ করে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
কিছুদূর বনের মধ্যে দিয়ে যেতে হল। তারপরেই শুরু হল দিগন্তবিস্তৃত মেঠো জমি। গাইড জানাল–এইসব জায়গায় সিংহ থাকে, কাজেই সাবধান। কপাল ভালো সিংহের সামনাসামনি পড়তে হলো না। দূরে একটা সিংহীকে দেখা গেল। একটা গাছের চারপাশে চক্কর দিচ্ছে। গাইড বোঝাল, ওখানে সিংহীটার কাচ্চাবাচ্চা আছে। তাই সিংহীটা ঐ জায়গা ছেড়ে নড়ছে না। গাইডের একটা ব্যবহার ফ্রান্সিসের কাছে রহস্যময় লাগল। যেখান দিয়ে ওরা যাচ্ছিল–ধারে কাছে কোন গাছ থাকলে সেটার ডাল কেটে দিচ্ছিল। গাইডকে কারণটা জিজ্ঞেস করল ফ্রান্সিস। গাইড বোঝাল যে, সিংহের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে এসব তুকতাক করছে।
গাড়ি চলছে, চলার বিরাম নেই। ফ্রান্সিস চলেছে তো চলেছেই। গাইড বোঝাল–মোরান উপজাতিদের এলাকার বাইরে দিয়ে যেতে হচ্ছে, তাই ঘুর পথ নিতে হয়েছে–এতে একটা সুবিধে হয়েছে–ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ করে যেতে হচ্ছেনা, ঘোড়ার গাড়ি সহজেই যেতে পারছে।
সেদিন গভীর রাত্রে হঠাৎ ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। শুনল–ঘোড়াগুলো অস্বস্তিতে মাটিতে পা ঠুকছে, মাঝে-মাঝে ডেকে উঠছে। ফ্রান্সিস উঠে বসল, নিশ্চয়ই হায়না এসেছে। তীর-ধনুক নিয়ে ফ্রান্সিস তাবু থেকে বেরিয়ে এল। ঘোড়াগুলো যে গাছটায় বাঁধা আছে, সেইদিকে পায়ে-পায়ে এগোলো। কিন্তু গাছটা পর্যন্ত আর যাওয়া হলো না।
ও কি? গাছটার আড়ালে অল্প-অল্প অন্ধকারে দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে। ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল।
সিংহ! দ্রুতপায়ে তাবুতে ফিরে এল। আরো কয়েকজনকে সঙ্গে চাই। ইতিমধ্যে ঘোড়ার ডাকে দু-একজনের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ফ্রান্সিসের ধাক্কায় তারা উঠে বসল। ফ্রান্সিস ফিসফিস করে বলল–সিংহ এসেছে, শীগগির তৈরী হয়ে এসো। কথা ক’টা বলেই তাঁবুর বাইরে চলে গেল। বাইরে আগুনের যে ধুনি জ্বালানো হয়েছিল, সেটা প্রায় নিভে গেছে, আকাশের চাঁদও ক্ষীণ। একটা খুবম্লান আলো চারিদিকে ছড়ানো। এতে সিংহটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা, শুধু চোখ দুটো আবছা অন্ধকারে জ্বলে উঠছে।
ফ্রান্সিস হাঁটু গেড়ে বসল। তখনই কয়েকজন তীর-ধনুক নিয়ে তাবু থেকে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস ফিসফিস্ করে বলল–সিংহটা সামনের গাছটার পেছনেই রয়েছে। তোমরা দু’দলে ভাগ হয়ে দু’দিকে চলে যাও, আমি প্রথমে ধূনীর পোড়া কাঠ ছুঁড়ে মেরেই তীর চালাবো। তোমরাও লক্ষ্য স্থির করে তীর চালাবে।
যারা তীর-ধনুকনিয়ে এসেছিল, তারা দু’দলে ভাগ হয়ে দু-পাশে চলে গেল। ঘোড়াগুলো আবার মাটিতে পাঠুকতে লাগল, আর দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবার জন্য দড়িতে টান দিতে লাগল। ফ্রান্সিস আর দেরী করল না। ধূনী থেকে একটা আধপোড়া কাঠ ছুঁড়ে মারল গাছটার দিকে। কাঠটা মাটিতে পড়তেই কতকগুলো স্ফুলিঙ্গ উঠল। ফ্রান্সিস অন্ধকারে চোখ দুটোর দিকে লক্ষ্য রেখে তীর ছুঁড়ল। তীরটা কোথায় গিয়ে বিধল বোঝা গেল না। কিন্তু সিংহটা প্রচণ্ড গর্জন করে লাফিয়ে এসে পড়ল ধুনীটার কাছে। এবার সিংহটার অস্পষ্ট শরীরের রেখা দেখা গেল। সিংহটা আবার গর্জন করে উঠল। বোধহয় ফ্রান্সিসের বন্ধুরা কেউ তীর ছুঁড়েছে।
সিংহটা গরু-গর করে উঠেই লাফ দিয়ে পড়ল গাছটার কাছে। ঘোড়াগুলো জোরে ডেকে উঠল, আর দড়ির বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার জন্যে চাপাচাপি শুরু করে দিল। তখনই ফ্রান্সিস তার এক সঙ্গীর ভয়ার্ত চীৎকার শুনতে পেল। সিংহটা কিন্তু আর দাঁড়াল না। চাঁদের ক্ষীণ আলায় দেখা গেল, সিংহটা ছুটে চলে যাচ্ছে। এই রাত্রিবেলা সিংহের পিছু ধাওয়াকরা বোকামি। ফ্রান্সিস ছুটে সঙ্গীটির কাছে গেল। দেখা গেল আঘাতটা মারাত্মক নয়। সিংহের থাবার নখে হাত ছড়ে গেছে। ওরা সঙ্গে যে ওষুধপত্র এনেছিল, তাই দিয়ে হাতটা বেঁধে দিল। সঙ্গীটি প্রাণে বেঁচেছে, এতেই তারা খুশী হল।
সকালে কিছু খাওয়া-দাওয়া করে ফ্রান্সিস দু’জন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সিংহটার খোঁজে বেরুলো। গাছের তলাটায় দেখল রক্তের গাঢ় দাগ। বোঝা গেল, সিংহটা বেশ আহত হয়েছে। ঘাসের ওপর পাতার ওপর রক্তের দাগ দেখে-দেখে ফ্রান্সিসরা আহত সিংহটার হদিস খুঁজতে বেরুলো। রক্তের দাগ দেখে-দেখে অনেকটা যাবার পর কয়েকটা পাথরের আড়ালে দাগগুলো শেষ হয়েছে দেখা গেল। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে সঙ্গের দু’জনকে দু’পাশ দিয়ে যেতে বলল। নিজে আস্তে-আস্তে খুব সন্তর্পণে পাথরের ওপাশে চলে এল। দেখল ঠিক পাথরের আড়ালেই সিংহটা শুয়ে খুব মৃদুস্বরে গ গ করছে। অন্য পাথরগুলোর মাথায় দুই সঙ্গীর মুখ দেখতে পেল ফ্রান্সিস। ইশারায় তাদের তীর চালাতে বলে নিজেও সিংহটার বুক লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ল। সিংহটা গর্জন করে লাফাতে উঠল। ততক্ষণে আরো কয়েকটা তীর এসে লাগল। সিংহটা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়ল। ওর গর গ ডাকও একসময় বন্ধ হয়ে গেল।
