–আমরা আগুনের মধ্যে দিয়ে পালাতে পারি। একজন ভাইকিং বলল।
–অসম্ভব। হ্যারি বলল। শাঙ্কো বলল–হ্যারি–আমরা এই গুহায় লুকিয়ে থাকতে পারি। আগুন নিভে গেলে পালাবো।
শাঙ্কো ঠিক বলেছে। বিস্কো বলল।
হ্যারি বলল-আমিও এই উপায়ই ভেবেছি। এ ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমরা বাঁচতে পারবো না।
–কিন্তু এই গুহার চারপাশে যখন আগুন এগিয়ে আসবে তখন অসহ্য গরমে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো। বিস্কো বলল।
-হ্যাঁ। এদিকটাও আমি ভেবেছি। আর একটা কথাও ভাবতে হবে। চারপাশের আগুন একই সময়ে এই গুহাটার বাইরে আসবে না। আগুন আসবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। কাজেই আমাদের আগুনের উত্তাপ সহ্য করতে হবে দফায় দফায়। সেটা আমরা পারবো। হ্যারি বলল।
হ্যারি–একটা কথা ভেবেছো? শাঙ্কো বলল।
কী কথা? হ্যারি বলল।
লক্ষ্য করে দেখো-এই টিলাটার গায়ে কোনো গাছগাছালি নেই। গাছগাছালি লতাপাতা ঝোঁপ রয়েছে প্রায় পঁচিশ তিরিশ হাত দূরে। অতদূরের আগুন আমাদের খুব ক্ষতি করতে পারবে না। শাঙ্কো বলল।
হ্যারি বলল–তবু আগুনের হলকা এই টিলার গায়ে এসে লাগবেই। প্রচণ্ড উত্তাপ আমাদের সহ্য করতে হবে। হরি বলল। কেউ কোনো কথা বলল না।
বিপদের গুরুত্ব বুঝে সবাই চুপ করে রইল। হ্যারি বলল–আগুনের হল্কা সহ্য করতে হবে দফায় দফায়। কী পারবে সহ্য করতে? ভাইকিং বন্ধুরা আস্তে ধ্বনি তুলল– ও-হো-হো। হ্যারি বলল–আজ আমাদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা। আগুন নিভে গেলেই আমরা গুহা থেকে বেরিয়ে আসবো। ফার্নান্দোর সৈন্যরা ধরেই নেবে আমরা আগুনে পুড়ে মরেছি। আগুনের মধ্যে ওরা আর আসবে না দেখতে আমরা বেঁচে আছিনা মরে গেছি। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা চলে গেলেই আমরা মুক্ত।
তাহলে উপায় নেই–আমাদের ক্ষুধা তৃষ্ণা আগুনের হল্কা সবই সহ্য করতে হবে। একজন ভাইকিং বলল।
–হ্যাঁ-হ্যারি বলল। আরো বলল–আগুন শুকনো গাছপালা লতা ঝোঁপ পাবে। না। কাঁচা গাছপালা লতা ঝোঁপের আগুন খুব ভয়ঙ্কর হয় না। এটাও মেরির আশীর্বাদ। সবাই মনস্থির করে প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করার জন্যে তৈরি হও। এই উত্তাপ সহ্য করতে পারলেই আমাদের মুক্তি।
সবাই চুপ করে বসে রইল।
এবার কাঁচা গাছের পাতা পোড়ার চটচট শব্দ শোনা গেল! অনেক স্পষ্ট। সবাই বুঝল–আগুন এই টিলাটার চারপাশে চলে আসছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একদিকে আগুন ছড়াল। আগুনের হল্কা গুহার মধ্যে ঢুকল। সবাই চুপ করে উত্তাপ সহ্য করতে লাগল। চারপাশে আগুন এগিয়ে এলো গুহাটার দিকে। এবার আগুনের হল্কা প্রচণ্ড বেড়ে গেল। সবাই দ দ করে ঘামতে লাগল। কিন্তু কেউ কোনো শব্দ করল না।
হঠাৎ গুহার অন্ধকারে মারিয়ার গোঙানি শোনা গেল। শাঙ্কো বন্ধুদের ঠেলে ঠেলে সরিয়ে মারিয়ার কাছে এলো। বলল–রাজকুমারী–আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?মারিয়া কথা বলতে পারল না। তারপরে অস্ফুটস্বরে বললজ-অল। শাঙ্কো বিস্কোকে ডাকল। বলল–পীপে থেকে এক গ্লাস জল দাও। বিস্কো অন্ধকারে পীপেটা খুঁজে পেল। একটা কাঠের গ্লাসও। গ্লাসে জল ঢেলে বিস্কো শাঙ্কোর দিকে গ্লাসটা এগিয়ে বলল–নাও। শাঙ্কো জলের গ্লাসটা অন্ধকারে হাতড়ে নিল।মারিয়ার হাতে জলের গ্লাসটা দিয়ে বলল রাজকুমারী জল খান। মারিয়া দুর্বল হাতে গ্লাসটা ধরল। হাতে কোনো সাড় নেই যেন। মারিয়া গ্লাসটা ধরে থাকতে পারল না। হাত কাঁপতে কাঁপতে জলসুন্ধু গ্লাসটা গুহার মেঝেয় পড়ে গেল। মারিয়ার মুখ থেকে আর্তস্বর বেরিয়ে এলো। বিস্কো তাড়াতাড়ি আর এক গ্লাস জল ভরে এগিয়ে ধরল। এবার হ্যারি অন্ধকারের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে বলল–আমাকে জলের গ্লাসটা দাও। বিস্কো হ্যারির হাতে জল দিল। অন্ধকারে কিছুটা আন্দাজে হ্যারি মারিয়ার কাছে এলো। প্রথমে মারিয়ার মাথাটা ধরে আস্তে আস্তে ওঠাল। মারিয়াকে পাথরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসাল। হ্যারি আস্তে ডাকল–রাজকুমারী? প্রথম ডাকে মারিয়া সাড়া দিল না। হ্যারি আবার ডাকল–রাজকুমারী? এবার বোধহয় মারিয়া হ্যারির ডাক শুনতে পেল। দুর্বল কণ্ঠে বললজ-অ-ল। হ্যারি অন্ধকারেই মারিয়ার মাথাটা ধরল। হ্যারি মাথা থেকে হাত ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে এলো। কপাল ভুরু নাম মুখে এসে আঙ্গুল রাখল। আস্তে বলল-রাজকুমারী, মুখ হাঁ করুন, আমি জল ঢেলে দিচ্ছি। মারিয়া মুখ হাঁ করল। হ্যারি আঙ্গুল দিয়ে মারিয়ার মুখের হাঁ-তে আস্তে আস্তে অল্প করে জল ঢালতে লাগল। মারিয়া জল খেল। আবার পাথরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে গা ছেড়ে দিয়ে বসে রইল।
বাইরে আগুনে হাওয়া হ্যারিদের গুহার মুখে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। হ্যারিরা সকলেই দাঁত চেপে প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করতে লাগল। আগুনের হল্কা ঢুকতে লাগল গুহার মুখ দিয়ে। মুখ হাত পা যেন ঝসে যেতে লাগল।
হঠাৎ হ্যারি মারিয়ার মৃদুস্বরে ডাক শুনল। মারিয়া কেমন যেন হাঁপাতে হাঁপাতে । থেমে থেমে বলল–হ্যারি–আমি–এই–অসহ্য গরমে শ্বাস নিতে পারছি না। আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসছে।
হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। বলল-বলেন কি। মারিয়া বলল–আমি মরি– ক্ষতি নেই। তোমরা গুহা থেকে বেরিয়ে ধরা দিও না।
হ্যারি একটু গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, রাজকুমারী সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে এক্ষুণি গুহার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। রাজকুমারীর জীবন বাঁচাতে আমাদের ধরা দিতে হবে।
