–হুঁ–ফ্রান্সিস বলল–তাহলে তো সর্দার ব্যাটাকে একটু শিক্ষা দিয়ে দিলে ভালো হতো। যাকগে ফ্রান্সিস আপনমনে খেতে লাগল।
এখন কি করে ওঙ্গালির বাজারে যাওয়া যায়, তাই নিয়ে ওরা পরিকল্পনা স্থির করতে বসল। এইসব জায়গা সম্বন্ধে ফ্রান্সিস বা হ্যারি কারোই কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। একমাত্র ভরসা মকবুল। মকবুল বলল–এখান থেকে মাইল পাঁচেক পূর্বদিকে পর্তুগীজদের একটা দুর্গ আছে। আগে ওখানে পৌঁছুতে হবে আমাদের, তারপর ইতিকর্তব্য স্থির করা যাবে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি দু’জনেই মকবুলের প্রস্তাবে রাজী হলো।
***
পরের দিন সকালবেলা ওরা যাত্রা শুরু করল পর্তুগীজদের দুর্গার উদ্দেশ্যে। তেকরুর বন্দর এলাকা ছাড়তেই শুরু হল গভীর বন। এরই মধ্যে দিয়ে একটা রাস্তামত রয়েছে। তেকরুর বন্দর থেকে দুর্গে মালপত্র নিয়ে যাওয়া-আসার জন্যে ঘোড়ায় টানা গাড়ী ব্যবহার করতে হয়। তাই গাড়ী চলার মত রাস্তা হয়েছে। দু’ধারে ঘন জঙ্গল। তারই মাঝখান দিয়ে এই সরু রাস্তা ধরে ওরা হাঁটতে লাগল। এতদিন আফ্রিকার জঙ্গল সম্বন্ধে গল্পই শুনেছে ফ্রান্সিস। এবার চাক্ষুষ দেখল আফ্রিকার জঙ্গল কাকে বলে। বন যে এত নিবিড় হতে পারে, ফ্রান্সিস তা ভাবতেও পারে নি কোনোদিন। দুপুর নাগাদ ওরা দুর্গার সামনে এসে হাজির হল। পাথরের তৈরী দুর্গা বেশ বড়ই বলতে হবে। সিংহদরজা দিয়ে ওরা দুর্গে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেল। দ্বাররক্ষী কিছুতেই ওদের ঢুকতে দেবে না। ফ্রান্সিস ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় বলল–ঠিক আছে–তুমি গিয়ে দুর্গ-রক্ষককে বলো আমরা ব্যবসার ধান্ধায় এদেশে এসেছি। একটা রাত দুর্গে থাকবো।
দ্বাররক্ষী চলে গেল। একটু পরেই একজন বেশ বলশালী লোক দরজার দিকে এগিয়ে এল। তার পরনে যুদ্ধের পোশাক। তার পেছনে-পেছনে এল দ্বাররক্ষী। ফ্রান্সিস বুঝল–ইনিই দুর্গরক্ষক।
দুর্গরক্ষক বেশ ভারিক্কি গলায় জিজ্ঞেস করল–আপনারা কে?
–আমরা ব্যবসায়ী। ফ্রান্সিস উত্তর দিল।
–কীসের ব্যবসা আপনাদের?
ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি বলে উঠল–কার্পেটের।
–কই–আপনাদের সঙ্গে তো কার্পেট দেখছি না।
–আমরা এই এলাকাটা ভালো করে দেখছি কার্পেট আনলে বিক্রি-বাট্টা হবে কিনা।
–ও।
–আমরা আজ রাত্তিরের মত এখানে থাকতে পারি? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–নিশ্চয়ই। দুর্গরক্ষক রক্ষীটিকে কি যেন ইঙ্গিত করল। রক্ষীটি ডাকল–আসুন আমার সঙ্গে।
রক্ষীকে অনুসরণ করে ফ্রান্সিসরা একটা ঘরে এসে হাজির হলো।
দুর্গের মধ্যে বেশ পরিচ্ছন্ন একটা ঘর। ফ্রান্সিসদের সেখানে থাকতে দেওয়া হল। যা রাত কাটাবার একটা আশ্রয় পাওয়া গেল। এবার আহারের ব্যবস্থা কি হবে? কিন্তু সে। চিন্তা তাদের বেশীক্ষণ রইল না। খাবার সময়ে রক্ষী এসে তাদের ডেকে নিয়ে গেল।
রাত্রে মস্ত লম্বা একটা টেবিলে সবাই একসঙ্গে খেতে বসল! প্রায় পঞ্চাশজন সৈন্য দুর্গায় থাকে। তাছাড়া আজকে রয়েছে দুর্গরক্ষকের দু’জন অতিথি আর ফ্রান্সিস ওরা। দেখতে-দেখতে দুর্গরক্ষক তার অতিথি দু’জনকে ফ্রান্সিসদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। অতিথিদের মধ্যে একজন বয়স্ক। তার নাম জন। অন্যজন যুবক। তার নাম ভিক্টর। ফ্রান্সিস জনের সঙ্গে আলাপ জমাল। হ্যারি আর মকবুল আলাপ করতে লাগল ভিক্টরের সঙ্গে। কথায় কথায় জন বলল–আমরা এখানে এসেছি হাতি শিকার করতে। দাঁতাল হাতি মেরে দাঁতগুলো নিয়ে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করবো। অবশ্য দাঁতগুলো নিয়ে যাবার সময় এই দুর্গরক্ষককেও কিছু প্রাপ্য অর্থ দিতে হবে।
ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–আপনারা কি হাতিশিকার করতে ওঙ্গালির বাজারে যাবেন?
–সেটা আমি তো ঠিক বলতে পারবো না। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে একজন এদেশীয় নিগ্রো। মাসাই উপজাতির লোক। এরা বাধ্য আর খুব ভালো তীরন্দাজ। সেই গাইডই জানে আমরা কোথা দিয়ে কোথায় যাবো।
–সেই গাইড কোথায়?
–সে তার সঙ্গীদের সঙ্গে বারান্দায় বসে খাচ্ছে।
–তার সঙ্গী মানে।
–আমরা কুড়িজন মাসাইকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। মালপত্র বওয়া, রান্না করা, বিষ মাখানো তীর দিয়ে হাতী শিকার করা, হাতীর দাঁতগুলো বয়ে আনা–এইসব ওরাই করবে।
–আপনার গাইডটিকে জিজ্ঞেস করুন তো সে ওঙ্গালির বাজার চেনে কিনা।
–ডাকছি–বলে যারা খাবার পরিবেশন করছিল, তাদের একজনকে ডেকে বলল–গাইডটাকে একবার ডেকে দিতে।
একটু পরেই নেংটি পরা খালি গায়ে একজন নিগ্রো এসে জনের সামনে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস অনেক চেষ্টা করেও লোকটাকে বোঝাতে পারল না। তখন মকবুল মাসাইদের ভাঙা-ভাঙ্গা ভাষায় জিজ্ঞাসা করল–ওঙ্গালির বাজার চেনো?
নোকটা মাথা ঝাঁকাল অর্থাৎ চেনে। মকবুল আবার জিজ্ঞেস করলো–ওখানে আমাদের নিয়ে যেতে পারবে?
লোকটা মাথা ঝাঁকাল অর্থাৎ নিয়ে যেতে পারবে।
ফ্রান্সিস তখন জনকে বলল–আপনাদের সঙ্গে আমরাও যাবো।
বেশ তো। জন খুশী হয়ে সম্মত হল। মকবুল তখন গাইডটাকে নিয়ে পড়ল। নানা ভাবে বোঝাতে লাগল–ওরা যেখানে হাতি শিকার করতে যাবে, সেখান থেকে ওঙ্গালির বাজারে যাওয়া যাবে কিনা! লোকটাও বার বার মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, হ্যাঁ, যাওয়া যাবে।
রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে ফ্রান্সিস, হ্যারি আর মকবুলের মধ্যে কথা হতে লাগল। ফ্রান্সিস এই ভেবে খুশী যে, কিছুদিনের মধ্যে ওরা ওঙ্গালির বাজারে পৌঁছুতে পারবে। তারপর হীরের পাহাড়। মকবুল বেশী কথা বলছিল না। খুব গম্ভীরভাবে কিছু ভাবছিল। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–কি হে মকবুল, তুমি চুপচাপ যে!
