জ্ঞান ফিরে পেয়ে ফ্রান্সিস যখন তাকাল, দেখল, ও একটা কেবিনঘরে শুয়ে আছে। দাড়িওলা একজন বুড়োমত লোক ওর নাড়ী টিপে দেখছে। ফ্রান্সিস বুঝল, ইনি ডাক্তার। ফ্রান্সিসকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে ডাক্তার হাসলেন। বললেন কী? কেমন লাগছে?
–শরীরটা দুর্বল। ফ্রান্সিস টেনে-টেনে বলল।
–সব ঠিক হয়ে যাবে। এবার একটু খেয়ে নাও। একেবারে বেশী করে খেতে দেওয়া হবে না। কম কম করে খাবে।
ফ্রান্সিসের মনে হল, ক্ষুধাতৃষ্ণার বোধটুকুও যেন আর নেই ওর।
–কদিন উপোস করে ছিলে? ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন।
–চার-পাঁচদিন হবে।
–হুঁ–দু’তিন দিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
হঠাৎ ফ্রান্সিসের মনে পড়ল হ্যারি আর মকবুলের কথা। ফ্রান্সিস ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠতে গেল। ডাক্তার হাঁ-হাঁ করে উঠলেন।
–বিছানা ছেড়ে এখন ওঠা চলবে না।
–কিন্তু আমার সঙ্গে যারা ছিল আমার বন্ধুরা–তারা কোথায়?
–পাশের কেবিনেই আছে—
–আমি ওদের দেখতে চাই।
–উঁহু, আজকে নয়, কালকে।
–কিন্তু—
কোন কথা নয়–শুধু বিশ্রাম এখন।
একটু পরেই একজন তোক মাংসের ঝোল আর রুটি নিয়ে ঢুকল।
ডাক্তার বললেন–নাও, খেয়ে নাও।
ফ্রান্সিস খেতে বসল। এতদিনের উপবাস অথচ খেতে ইচ্ছে করছে না। আসলে উপবাসে-উপবাসে ওর খিদেই মরে গিয়েছিল। যতটা ভাল লাগল খেল। খাওয়া-দাওয়ার পর শরীরে যেন একটু বল পেল। ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল–অনেক ধন্যবাদ।
-আমাকে নয়–জাহাজের ক্যাপ্টেনকে। এক্ষুনি আসবেন।
একজন লোক কেবিনঘরে ঢুকল। মুখে। ছুঁচালো গোঁফদাড়ি। ঝাপ্টেনের পোশাকপরে। ফ্রান্সিস ঝল ইনিই ক্যাপ্টেন।
ক্যাপ্টেন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল–এখন কেমন আছে?
–ভালো। জ্ঞান ফিরেছে, তবে শরীরের দুর্বলতা কাটতে কয়েক দিন যাবে।
–হুঁ। এবার ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করুল–কেমন লাগছে?
ফ্রান্সিস মাথা কাত করে জানালে–ভালো।
ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করল–নৌকো করে কোথায় যাচ্ছিলেন?
ফ্রান্সিস সাবধান হল। হীরের পাহাড়ের কথা বললেই বিপদ বাড়বে তো কমবেনা। কাজেই অন্য ছুতো দেখাতে হল। বলল–আমাদের জাহাজ জলদস্যুরা আক্রমণ করেছিল। অনেক কষ্টে আমরা তিনজন জাহাজ থেকে নৌকা করে পালাতে পেরেছিলাম।
ক্যাপ্টেন আর কোন কথা জিজ্ঞেস করল না। ফ্রান্সিসও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। যাবার সময় ক্যাপ্টেন বলল কয়েকদিন বিশ্রাম নিন, খাওয়া-দাওয়া করুন, শরীর ঠিক হয়ে যাবে।
পরের দিনটিও ফ্রান্সিস কেবিন ঘরে বিছানায় শুয়েই কাটালো। সন্ধ্যে নাগাদ হ্যারি আর মকবুল এল। হ্যারি খুশীতে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। মকবুলও খুশী। বলল–ফ্রান্সিস, তোমার জন্যেই এ যাত্রায় আমরা বেঁচে গেলাম।
হ্যারি জিজ্ঞেস করল ফ্রান্সিস, তুমি কি শরীরের ঐ অবস্থায় সত্যিই সারারাত নৌকো বেয়েছিলে?
–উপায় কি? নইলে এই জাহাজটার কাছে পৌঁছানো যেত না।
তিনজনে মিলে কিছুক্ষণ গল্পগুজব চলল। গল্প বেশির ভাগই ওরা কী করে উদ্ধার পেল, তাই নিয়ে হল। কী করে অচৈতন্য ফ্রান্সিসকে জাহাজে তোলা হল, ওরাই বা দড়ি ধরে কী ভাবে জাহাজে উঠল–এসব নিয়ে কথাবার্তা হল। ফ্রান্সিস একসময় জিজ্ঞেস করল–তোমরা খোঁজ নিয়েছে, জাহাজটা কোথায় যাচ্ছে?
–হ্যাঁ। আমি খোঁজ নিয়েছি–মকবুল বলল–জাহাজটা পর্তুগীজদের। ওদের একটা বন্দর আছে পশ্চিম আফ্রিকার নিম্বাতে। সেই বন্দরেই যাচ্ছে জাহাজটা।
–ফ্রান্সিস বললে–তাহলে তেকরুর বন্দরে যাবার উপায়?
–নিম্বা থেকেই আর একটা জাহাজ ধরে কেরুর যেতে হবে—
মকবুল বলল–আর এই জাহাজ দু’একদিনের মধ্যেই নিম্বা পৌঁছুবে।
আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে হারি আর মকবুল চলে গেল। ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। শরীরের দুর্বলতা এখনো কাটেনি। বেশ ক্লান্ত লাগছে শরীরটা। তবু ফ্রান্সিসের চিন্তার যেন শেষ নেই। কী করে তেকরুর বন্দরে পৌঁছুবে। সেখান থেকে কী করে ওঙ্গ লির বাজারে যাওয়া যাবে। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে-ভাবতে ফ্রান্সিস আবার একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
দু’দিন পরে জাহাজটা নিম্বা বন্দরে ঢুকলো। ছোট বন্দর। জনবসতি খুবই কম। কিন্তু উপায় নেই। এই বন্দরেই অপেক্ষা করতে হবে অন্য জাহাজের জন্য। ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে নামবার আগে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দেখা করতে গেল। ক্যাপ্টেনকে বারবার ধন্যবাদ জানাল। ক্যাপ্টেনই ওদের হদিশ দিল একটা সরাইখানার। একজন পর্তুগীজ সরাইখানাটা চালায়। ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে নেমে সেই সরাইখানাটা খুঁজে বের করল। খুবই সস্তা সরাইখানা। খাওয়ার টেবিল, বাসনপত্র নোংরা। তা হোক–এই সরাইখানা এখন স্বর্গ ওদের কাছে। কতদিন অপেক্ষা করতে হয়, কে জানে? একটা বড়ো দেখে ঘর ওরা ভাড়া নিল। ঘরটার জানালা থেকে সমুদ্র আর নিম্বা বন্দর স্পষ্ট দেখা যায়। কোন নতুন জাহাজ এলে ওদের চোখে পড়বেই।
আগের জাহাজের ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিসের একটা মোহরের ভাঙানি দিয়ে গিয়েছিল পর্তুগীজ মুদ্রায়। মুদ্রাগুলো খুব কাজে লেগে গেল। ফ্রান্সিস খাওয়া থাকার জন্যে দু’দিনের আগাম পাওনা সরাইখানাকে মিটিয়ে দিল। সরাইওলা তাতেই বেজাই খুশী। দু’বেলা ওদের খোঁজপত্তর করতে লাগল। স্নানের জল, আলো আর ভাল খাবার-দাবারের সুবন্দোবস্ত করে দিল। জাহাজের খালাসীদের হাঁকে-ডাকে নিম্বা বন্দরটা মুখরিত হয়ে রইল একদিন। কিন্তু জাহাজটা চলে যেতেই আবার নিঃসাড় হয়ে গেল নিম্বা বন্দর।
