তখনই ক্যারাভেলের ডেক-এ উঠে এলো আল জাহিরি। সৈন্যদের ধমক দিয়ে বলল–এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন–ওদের আক্রমণ কর।
কিন্তু সৈন্যরা কেউ নড়ল না। হ্যারি বলে উঠল–আল জাহিরি তোমাদের জাহাজে আমাদের রাজকুমারীকে বন্দি করে রেখেছে।
–তোমাদের রাজকুমারীকে আমি বন্দি করে রাখিনি। আল জাহিরি গলা চড়িয়ে বলল।
–তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না। রাজকুমারীকে তোমাদের জাহাজেই বন্দি করে রেখেছে।
–বললাম তো রাজকুমারীকে আমরা বন্দি করে রাখিনি। আল জাহিরি বলল। হ্যারি বলল–আবার বলছি মিথ্যে কথা বলো না। রাজকুমারী তোমাদের জাহাজেই বন্দি আছেন। রাজকুমারীকে আমাদের জাহাজে আসতে দাও। রাজকুমারী মুক্ত হলে আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করবো না। আমরা আমাদের জাহাজ চালিয়ে চলে যাবো।
রাজকুমারী কেরিনিয়ার কয়েদখানায় রয়েছে। আল জাহিরি বলল।
–মিথ্যে কথা। তোমাকে আর তোমার সৈন্যদের বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়েছিলাম। সেই সুযোগ কাজে লাগালে না। এবার মরার জন্যে তৈরি হও। হ্যারি বলল। তারপর গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–সবাই অস্ত্র হাতে নাও। এবার লড়াই। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল–ওহোহো। তারপর সবাই সিঁড়ি দিয়ে নেমে অস্ত্রঘর থেকে অস্ত্র নিয়ে এলো। প্রথমবারে আট-দশজন লাফিয়ে ক্যারাভেলের ডেক-এ উঠে এলো। শুরু হল আল জাহিরির সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই। আবার একদল ভাইকিং লাফিয়ে ক্যারাভেল এ উঠল। তারাও লড়াই শুরু করল। আবার একদল গিয়ে লাফিয়ে ক্যারাভেল-এ উঠল। আল জাহিরির সৈন্যরা হার স্বীকার করতে লাগল।
হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, কাউকে হত্যা করো না। আহত করো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই আল জাহিরির সৈন্যরা আহত হয়ে ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ল। গোঙাতে লাগল।
তখনই আল জাহিরি নীচের কেবিনঘর থেকে মারিয়াকে নিয়ে ডেক-এর ওপর উঠে এলো। হাতের তলোয়ারটা মারিয়ার পিঠে ঠেকিয়ে বলল–তোমরা এক্ষুণি আমার জাহাজ ছেড়ে চলে যাও। যদি না যাও রাজকুমারীর পিঠে আমি তলোয়ার ঢুকিয়ে দেব।
হ্যারি বুঝল–এই নরপশুটা এখন রাজকুমারীকে যেকোনো মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারে। হ্যারি চেঁচিয়ে বলল–ভাইসব–সবাই আমাদের জাহাজে চলে এসো। আর লড়াই নয়।
ভাইকিংরা রাজকুমারীর বিপদ ভালো করেই বুঝল। সবাই লাফিয়ে নিজেদের জাহাজে ফিরে এলো।
হ্যারি ইশারায় শাঙ্কোকে কাছে ডাকল। মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলল–আল জাহিরি– তিরের নিশানা।শাঙ্কো কোনো কথা না বলে আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। তারপর দ্রুত পায়ে অস্ত্রঘরে এলো। তীর ধনুক নিল। নিজের কেবিনে এসে বিছানায় পাতা মোটা কাপড়টাকে গায়ে জড়াল। তির ধনুক ঢাকা পড়ে গেল। শাঙ্কো সিঁড়ি বেয়ে উঠে ডেক-এ এলো। তারপর আস্তে আস্তে মাস্তুলের পেছনে চলে এলো। তারপর গা থেকে কাপড় খুলে ফেলল। ডেক-এ হাঁটু গেড়ে বসে মাস্তুলের আড়াল থেকে ধনুক তুলল। তির পেরিয়ে মাস্তুলের পাশে সরে এলো। আল জাহিরিকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আল জাহিরি তখন তলোয়ারের ডগাটা মারিয়ার গলায় চেপে ধরে বলে উঠল–একটু সময় দাও। আমরা এক্ষুণি জাহাজ চালিয়ে চলে যাবো। আল জাহিরি নিশ্চিন্ত হল।
শাঙ্কো তির নিশানা করল। তারপর তির ছুঁড়ল। নিখুঁত নিশানা। তির গিয়ে লাগল আল জাহিরির ডান বাহুতে। ঐ হাতেই আল জাহিরি তলোয়ার ধরেছিল। আল জাহিরি আর্ত চিৎকার করে উঠল। তারপরই হাতের তলোয়ার ফেলে বাহু বাঁ হাতে চেপে ধরল। তারপর টেনে তিরটা খুলল। গল্প করে রক্ত বেরিয়ে এলো। আল জাহিরি ডেক-এ বসে পড়ল।
হ্যারি চিৎকার করে বলল–রাজকুমারী চলে আসুন। মারিয়া দ্রুত ছুটে এলো হ্যারিদের জাহাজের দিকে। বিস্কো আর কয়েকজন ভাইকিং ছুটে গিয়ে মারিয়াকে ধরে ওদের জাহাজে নিয়ে এলো। মারিয়া আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ডেক-এর ওপর আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল। একে দুর্বল শরীর তারসঙ্গে মৃত্যুভী—িমারিয়া এসব সহ্য করতে পারল না।
হ্যারি ডাকল–ভেন-রাজকুমারীকে দেখো। বৈদ্য ভেন এগিয়ে এলো। বসে রাজকুমারীর নাড়ি দেখল। চোখ টেনে দেখল। বলল–ভয়ের কিছুই নেই। শুধু ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কেবিনঘরে নিয়ে চলো।
মারিয়াকে কেবিনঘরে ধরাধরি করে আনা হল। ভেনও নিজের কেবিনঘর থেকে ওষুধ নিয়ে এলো।
হ্যারিদের জাহাজ ফিরে চলল কেরিনিয়া বন্দরের দিকে
ওদিকে ফ্রান্সিসকে আর পারিসি গাড়িতে চড়ে এক সন্ধ্যায় নিকোশিয়ায় পৌঁছল। রাজধানী নিকোশিয়া বেশ বড়ো শহর। গরিব লোকজন আছে, তেমনি ঝলমলে পোশাক পরা অভিজাত ধনীর মানুষরাও আছে। নতুন শহর। সাজানোগুছানো সুন্দর শহর। কত লোক। কিন্তু ফ্রান্সিসের সেসব দিকে চোখ নেই। পারিসি বলল, রাজধানী শহর আপনি তো আগে দেখেননি। চলুন ঘুরে ঘুরে দেখবেন। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। বলল, বন্ধুরা, মারিয়া–সবাই ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি হবে। আমার এখন এক চিন্তা কী করে সবাইকে মুক্ত করবো। অন্য কোনোদিকে তাকাবার অবকাশ নেই আমার। এবার পারিসি ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝলো। কোনো কথা বলল না।
সেই রাতটা ওরা একটা সরাইখানায় কাটালো। সকালে ফ্রান্সিস বলল, গী দ্য লুসিগনানের বিচারসভা কখন বসে?
একটু বেলায়। পারিসি বলল।
তাহলে সকালের খাবার খেয়ে চলো বিচারসভায় যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
একটু বেলায় রাজার বিচারসভায় দু’জনে পৌঁছল। তখন বিচারের কাজ চলছিল। কাঠের জমকালো সিংহাসনের সবুজ কাপড়ে মোড়া আসনে গী দ্য লুসিগনান বসে ছিল। একটা বিচারের কী রায় দিল লুসিগনান। বাচ্চাকোলে এক মা হাসতে হাসতে চলে গেল। পেছনে পেছনে গেল তার স্বামীই বোধহয়।
