হ্যারি ওরা সৈন্যদের পাহারায় বাড়ির বাইরে এলো। রাস্তায় দাঁড়াল। সৈন্যরা ওদের ঘিরেদাঁড়াল। আল জাহিরি হ্যারিকে বলল–তোমাদের আরো বন্ধু আছে। তারা কোথায়?
–আমি জানি না। হ্যারি বলল।
–একসঙ্গে পালালে আর এখন বলছো জানি না। আল জাহিরি বলল।
-যে যেখানে পেরেছে আশ্রয় নিয়েছে নয় তো এ নগর থেকেই পালিয়ে গেছে। হ্যারি বলল।
–ঠিক আছে। তাদেরও ধরবো। আল জাহিরি বলল।
–দেখুন চেষ্টা করে। হ্যারি বলল।
সবাই চলল জাহাজটার দিকে। শাঙ্কো ওর তির-ধনুক নিয়ে যাচ্ছিল। একজন সৈন্য আল জাহিরির ইঙ্গিতে তির-ধনুক কেড়ে নিল।
সৈন্যদের পাহারায় হ্যারিরা যখন যাচ্ছে তখন রাস্তার লোকজন ওদের দেখতে লাগল। হয়তো ভাবল এরা কোন্ দেশের লোক। এদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেন।
জাহাজঘাটা থেকে একটু দূরে সেই কয়েদখানার সামনে এলো সবাই। হ্যারিদের এক এক করে ঢোকানো হতে লাগল। সবশেষে হ্যারি ও মারিয়া। হ্যারি বলল রাজকুমারী আপনি এইকয়েদখানায় থাকবেন না। আমাদের জাহাজে আপনার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আল জাহিরি এ ব্যবস্থায় রাজি হয়েছে। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল–না–আমি তোমাদের সঙ্গে এখানেই থাকবো। হ্যারি বলল-রাজকুমারী এসময় আপনি অবুঝ হবেন না। আপনি জাহাজে থাকলে আমরা অনেক নিশ্চিন্ত থাকবো। তাছাড়া আপনাকে জাহাজে রাখার কারণ আছে। একটু থেমে হ্যারি বলল–আল জাহিরির সঙ্গেশর্ত থাকবে আপনি প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে আমাদের এই কয়েদঘরে দেখতে আসবেন। এবার হ্যারি গলা নামিয়ে আস্তে বলল–আসার সময় আপনি গাউনের নীচে যে ক’টা তলোয়ার আনা সম্ভব আনবেন। এভাবে কিছু অস্ত্র হাতে পেলে আমরা লড়াইয়ে নামবো। আপনি এখানে থাকলে সেটা সম্ভব হবে না। কাজেই আপনি জাহাজেই থাকুন। আপনার শরীরের দুর্বলতা এখনো যায়নি। মারিয়া আর কোনো কথা বলল না। বুঝল হ্যারি ঠিকই বলেছে।
হ্যারি কয়েদঘরে ঢুকল। আল জাহিরি একজন সৈন্যকে হুকুম করল–মারিয়াকে তাদের জাহাজে রেখে আসতে। দু’জন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে মারিয়াকে তাদের জাহাজের দিকে নিয়ে চলল।
পরদিন সকালে খাওয়া-দাওয়ার পর মারিয়া পোশাক রাখার চামড়ার পেটিটা খুলল। খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে বড়ো আর ঢোলা গাউনটা বের করল। গাউনটা বেশ জমকালো।
এবার মারিয়া অস্ত্রঘরে এলো। কোমরের দুপাশে আর পেছনে তিনটে তলোয়ার দড়ি দিয়ে শরীরের সঙ্গে বেঁধে নিল। তারপর কেবিনঘরে এসে সেই বড়ো গাউনটা পরল। বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় রইল না। তলোয়ারগুলোর মারিয়া খুপসুদ্ধ বেঁধেছিল। তাই হাঁটতে গিয়ে তলোয়ারের খোঁজা লাগল না। তলোয়ারের খাপগুলো লাগল। তাতে কেটে ছড়ে গেল না।
সেই জমকালো গাউন পরে মারিয়া জাহাজ থেকে পাটাতন দিয়ে নেমে এলো। দু’জন সৈন্য ছুটে এসে মারিয়ার দু’পাশে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়ালো। সৈন্যরা সবাই হাঁ করে মারিয়ার সেই জমকালো পোশাক দেখতে লাগলো। যেন নাচের আসরে যাচ্ছে এমনি ভঙ্গিতে মারিয়া কয়েদঘরের দিকে চলল।
কয়েদঘরের দরজার কাছে এসে পাহারাদারদের ইঙ্গিতে দরজা খুলে দিতে বলল। পাহারাদার দরজার তালা খুলল। দরজা খুলে দিল। মারিয়া কয়েদঘরে ঢুকে একপাশে ডানদিকে সরে গেল। পাহারাদাররা আর মারিয়াকে দেখতে পেল না।
মারিয়া এবার শাঙ্কোকে ডেকে বলল–আমার শরীরে তলোয়ার বাঁধা আছে। খুলে নাও। শাঙ্কো আস্তে আস্তে খাপসুষ্ঠু তলোয়ার তিনটের বাঁধা দড়ি খুলে তলোয়ার বের করে আনল। তারপর দ্রুতহাতে ঘাসের বিছানার নীচে তলোয়ার তিনটে গুঁজে রাখল।
একটু পরে কিছু কথাবার্তা বলে মারিয়া চলে এলো।
এভাবে তিনদিন ধরে মারিয়া গাউনের নীচে তলোয়ার নিয়ে কয়েদঘরে আসতে লাগল। শাঙ্কো আর বিস্কো তলোয়ার লুকিয়ে রাখতে লাগল।
পরের দিন দুপুরে দুটো জাহাজ জাহাজঘাটায় এসে লাগল। হ্যারি পাহারাদারদের কথাবার্তা থেকে জানল ঐ দুটো জাহাজে মূর ক্রীতদাসদের বিক্রির জন্যে আনা হয়েছে। কালকেই ক্রীতদাসদের কেনাবেচার হাট বসবে। একটু দূরে দুটো বাদামগাছের নীচে কাঠের পাটাতন পাতা মাচার মতো। ওখানেইক্রীতদাসদের তোলা হয়। ক্রেতারা চারদিকে জড়ো হয়। ক্রীতদাসদের দেখেশুনে দাম হাঁকে। দরাদরির পর ক্রীতদাসদের কিনে লোকেরা নিয়ে যায়। হ্যারি বুঝল আর দেরি করা চলবে না। আজ রাতেই যা অস্ত্র পাওয়া গেছে। তাই নিয়ে লড়াইতে নামতে হবে।
হ্যারি বন্ধুদের ডেকে বলল–ভাইসব–কালকে এখানে ক্রীতদাস বিকিকিনির হাট বসবে। তাই আজকে রাতেই লড়াইয়ে নামতে হবে। বেশ কিছু তলোয়ার পেয়েছি। এই নিয়েই লড়াই করতে হবে। সবাই চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো। পাহারাদার কয়েকজন লোহার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বন্দিরা চিৎকার করে ধ্বনি তুলল কেন কিছুই বুঝল না ওরা। হ্যারিরা নিজেদের মধ্যে যে কথাবার্তা বলছে তাও বুঝল না। ওরা একটুক্ষণ দেখে দরজা থেকে সরে গেল।
তখন রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। যে সৈন্যরা খাবার দিতে এসেছিল তারা চলে গেছে।
হ্যারি মৃদুস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো। হ্যারির সামনে এসে মাথা নিচু করল। হ্যারি বাঁধা হাত দুটো শাঙ্কোর ঢোলা পোশাকের মধ্যে ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করল। ছোরাটা দিয়ে শাঙ্কোর হাতের দড়ি ঘষে ঘষে কাটতে লাগল। উত্তেজনায় ছোরার মুখ এদিক ওদিক ঘুরে যেতে লাগল। তাতে শাঙ্কোর হাত কেটে যেতে লাগল। রক্ত বেরুলো। শাঙ্কো দাঁত চেপে সব সহ্য করতে লাগলো।
