শাঙ্কো নিজের কেবিনঘরে নেমে এলো। বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভাবতে লাগল। অনেক ভাবনা মাথায়।
দুপুরে গোল রুটি কেটে নিয়ে চিনি দিয়ে খেল। খিদের মুখে ঐ খাবারই অমৃত মনে হল।
সন্ধে হল। শাঙ্কো তখনও চুপ করে বিছানায় শুয়ে রইল।
রাত হল। রাতের খাওয়া খেয়ে শাঙ্কো ওদের অস্ত্রঘরে গেল। তীর ধনুক নিল। কোমরে তলোয়ার গুজল। বলা যায় না যদি লড়াইয়ে নামতে হয়।
রাত বাড়তে লাগল। শাঙ্কো তখনও বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম করছে।
রাত গম্ভীর হল। শাঙ্কো তীর ধনুক নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। ডেক-এ শুয়ে পড়ে গড়িয়ে মাস্তুলের আড়ালে এলো। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে দেখল–পাহারাদার সৈন্যরা ডেক-এর এখানে-ওখানে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। ডাক্নিশ্চিন্ত।
শাঙ্কো কাঠের পাটাতন দিয়ে অন্ধকারে আস্তে আস্তে তীরে নেমে এলো। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে চলল কয়েদঘরের দিকে।
অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কয়েদঘরের কাছে এসে দেখল কয়েদঘরে দরজার কাছে। দুতিনটে মশাল জ্বলছে। চারজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে। দু’জন বসে আছে। দু’জন। খোলা তলোয়ার হাতে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
শাঙ্কো অন্ধকারে হাঁটু গেড়ে বসল। ধনুকে তীর পরাল। তারপর মশালের আলোয় নিশানা ঠিক করতে লাগল। বেশি তীর খরচ করা চলবে না। একটুক্ষণ নিশানা ঠিক করে শাঙ্কো তীর ছুঁড়ল। তীর গিয়ে লাগল খোলা তলোয়ার হাতে এক পাহারাদারের পায়ে। সে তলোয়ার ফেলে পা চেপে বসে পড়ল। অন্য তিনজন পাহারাদার চারদিকে তাকাতে লাগল। ওরা রবুঝে উঠতে পারলো না কোথা থেকে তীর ছুটে এলো। শাঙ্কো আবার তীর ছুঁড়ল। এই তীর একজন পাহারাদারের বুকে গিয়ে লাগল। সে উবু হয়ে দরজার কাছে মুখ থুবড়ে পড়ল। বাকি দুজন সভয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। শাঙ্কোর পরের তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। তীরটা ঠং করে লোহার দরজায় লেগে নীচে পড়ে গেল। দু’জন পাহারাদার আর ওখানে থাকতে সাহস পেল না। দু’জনেই অন্ধকারে লাফিয়ে নেমে ছুটল নিজেদের জাহাজের দিকে। অন্ধকারে শাঙ্কো লক্ষ্য স্থির করতে পারল না। ওরা নিশ্চয়ই জাহাজে গিয়ে আল জাহিরিকে খবর দেবে। হাতে সময় কম। ধনুক পিঠে ঝুলিয়ে শাঙ্কো দ্রুত ছুটে এলো। দেখল একজন পাহারাদার পা টিপে ধরে বসে আছে। অন্যজন উবু হয়ে পড়ে আছে। ওর কোমরেই শাঙ্কো দেখল চাবির গোছা। শাঙ্কো এক হ্যাঁচকা টানে চাবির গোছা নিয়ে নিল। শাঙ্কো আহত পাহারাদারকে স্পেনীয় ভাষায় বলল–একেবারে চুপ করে থাকবে। টু শব্দটি করেছো কি তোমাকে শেষ করে দেব। সব কথা না বুঝলেও পাহারাদারটি বুঝল ওকে চ্যাঁচামেচি করতে মানা করছে। ও চুপ করে হাত চেপে পায়ের রক্তপড়া বন্ধ করার চেষ্টা করতে লাগল।
শাঙ্কো আর দাঁড়াল না। ছুটে গেল কয়েদঘরের দরজার কাছে। বড়ো তালাটায় চাবি ঢুকিয়ে। ঢুকিয়ে দেখতে লাগল। একটা চাবি লেগে গেল। কন্ট্র করে তালাটায় শব্দ হল। তালা খুলে গেল। শাঙ্কো বেশ শব্দ করেই দরজা খুলল যাতে সবাই সজাগ হয়। ভেতরে ঢুকেশাঙ্কো চাপা গলায় বলল–ভাইসব–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের পালাতে হবে। জলদি। ভাইকিংরা সঙ্গে সঙ্গেউঠেদাঁড়াতে লাগল।তারপরছুটল দরজার দিকে। সবারই দু’হাত বাঁধা। ছুটে যেতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু উপায় নেই। পালাবার এই সুযোগ ছাড়া চলবে না।
সবাই কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এলো। শাঙ্কো বলল–এখন আমরা শহরে যাবো না অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকবো।
হ্যারি বলল–বাঁদিকে কিছুদুরে একটা জঙ্গলা জায়গা দেখা যাচ্ছে। ওখানেই আমরা আশ্রয় নেব। ছোটো সবাই। সবাই ছুটলে সেই জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলে ঢুকে একটা ফাঁকা জায়গামতো পেল। সেখানেই বসে পড়ল সবাই। হাঁপাতে লাগল।
শাঙ্কো কোমর থেকে ছোরা বের করল। তারপর মারিয়ার হাতবাঁধা দড়ি কেটে দিল। একে একে সবাইর হাতের দড়ি কাটা হল।
হ্যারি ওপরের দিকে তাকাল। একফালি আকাশ দেখল। তারাগুলোর আলো ম্লান হয়ে আসছে। তার মানে রাত শেষ হয়ে আসছে।
কিছু পরে সূর্য উঠল। হ্যারিরা জঙ্গলের মধ্যে থাকায় সূর্য ওঠা দেখতে পেল না। ততক্ষণে পাখিদের ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে।
আল জাহিরির কয়েদখানা থেকে তো পালানো গেল। এবার চাই খাদ্য আর আশ্রয়। এতজনের খাদ্যআরআশ্রয় জোগাড় করা একসমস্যা।হ্যারি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল ভাইসব–এবার খাদ্য আর আশ্রয় চাই। কিন্তু এতজন সবাই একসঙ্গে বাইরে বেরুনো যাবে না। আমি জনাদশেককে সঙ্গে নিয়ে বেরুবো। ফিরে এসে আবার জনা দশেককে নিয়ে যাবো। তোমরা কেউ গ্রীক ভাষা জানো না। কথা বলে আমাকেই সব ব্যবস্থা করতে হবে। এবার জনাদশেক আমার সঙ্গে চলো। হ্যারি থামল। তারপর মারিয়াকে বলল–আপনিও চলুন। মারিয়া বলল সবাইআশ্রয়পাকতারপরআমি যাবো।-না রাজকুমারী–আপনি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হন নি। আপনার কথা আমাকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। চলুন।
মারিয়া আর জনাদশেক বন্ধুকে নিয়ে হ্যারি বন থেকে বেরিয়ে এলো। দেখল কিছুটা খোলা মাঠের মতো। তারপর কেরিনিয়া নগরের রাস্তা।
ওরা রাস্তা দিয়ে চলল। রাস্তায় লোকজনের খুব একটা ভিড় নেই। একটা পাথরের বড়ো বাড়ির সামনে এসে হ্যারি বলল দাঁড়াও সবাই। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যারি এগিয়ে গিয়ে কাঠের দরজায় বড়ো কড়াটা দিয়ে ঠক্ঠক্শব্দ করল। একটু পরেই দরজা খুলে একজন প্রৌঢ় এসে দাঁড়ালেন। তিনি বেশ অবাক হয়েই হ্যারিদের তাকিয়ে দেখলেন। প্রৌঢ়ের গায়ে বেশ দামি পোশাক। বোঝা গেল যথেষ্ট স্বচ্ছল পরিবার। হ্যারি ভাঙাভাঙা গ্রীক ভাষায় বলল– আমরাবিদেশি–ভাইকিং। প্রৌঢ় বললেন তোমাদের কথা আমরা শুনেছি।দক্ষ জাহাজ চালক তোমরা। দুঃসাহসী। তবে জলদস্যু বলে তোমাদের দুর্নামও আছে।
