ফ্রান্সিস! ডাক শুনে ফ্রান্সিস মঞ্চের দিকে তাকালো। দেখলো বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে ভাইকিংদের রাজা। দুজনেই মিটিমিটি হাসছেন। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। রাজা বললেন তুমি ভাইকিং জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছে।
–তবু–ফ্রান্সিসের বাবা বললেন, জাহাজ চুরির অপরাধটা?
রাজা বললেন, হ্যাঁ, শাস্তিটা তো পেতেই হবে, এই রাজত্বের শাসনভার তোমাকে দিলাম।
ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি বলে উঠল দোহাই, ঐ-টি আমি পারবো না। জাহাজ চলানো, ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করা তরোয়াল চালানো, এসব এক জিনিস, আর একটা রাজত্ব চালানো, সে অন্য ব্যাপার। যদি অভয় দেন তো একটা কথা বলি, এই রাজত্বের ভার ফজলকে দিন।
–কে ফজল?
–আমার বন্ধু। সবদিকে থেকে ফজলের মত উপযুক্ত আর কেউ নেই। সেই এই দেশেরই মানুষ। যাদের দেশ, তারাই দেশ শাসন করুন, এটাই কি আপনি চান না?
–নিশ্চয়ই চাই। বেশ! ডাক ফজলকে।
ফ্রান্সিস চারিদিকে তাকিয়ে ফজলকে খুঁজলো। কিন্তু কোথাও তার দেখা পেল না। ফ্রান্সিস বললো–ফজল এখানেই আছে কোথাও। আমাকে সময় দিন, ওকে খুঁজে বের করব।
–বেশ, রাজা সম্মত হলেন।
ফ্রান্সিস দেখলো যুদ্ধ থেমে গেছে। সুলতানের সৈন্যদের বন্দী করা হচ্ছে। সুলতানের মৃতদেহ ঘিরে শোকার্ত মানুষের ভীড়। ফ্রান্সিসের ভালো লাগছিল না এসব। নাঃ আবার বেরিয়ে পড়তে হবে। মাথার ওপরে অন্ধকার ঝোড়ো আকাশ, পায়ের কাছে পাহাড়ের মত উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ছে, উন্মত্ত বাতাসের বেগ। জীবন তো সেখানেই।
ফ্রান্সিস পায়ে-পায়ে রাজার কাছে গিয়ে বললো–এবার একটা ভাল জাহাজ দেবেন?
রাজা সবিস্ময়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন–কেন?
–আফ্রিকার ওঙ্গালি বাজারে যাব—
–আবার?
–চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না–ফ্রান্সিস উৎসাহের সঙ্গে বলতে লাগল–কি বিরাট হীরে! কি চোখ ধাঁধানো আলো ছিটকে পড়ছে!
ফ্রান্সিসের আর বলা হলো না। পেছন থেকে বাবার গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল–এখান থেকে আমার সঙ্গে সোজা বাড়ি ফিরে যাবে।
হীরের পাহাড় – ফ্রান্সিস সিরিজ – অনিল ভৌমিক
ফজল সুলতান হল। আমদাদ নগর জুড়ে খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হল্লা চলল সাতদিন ধরে। ভাইকিংদের রাজা, মন্ত্রী, ফ্রান্সিস আর তার বন্ধুরা সকলেই আনন্দ-উৎসবে যোগ দিল।
সাতদিন পরে আনন্দ-উৎসব শেষ হল। এবার ঘরে ফেরার পালা। আমদাদ বন্দরে ভাইকিং-রাজার তিনটে জাহাজ তৈরী হল। জাহাজগুলোর কিছু মেরামতির কাজ ছিল, তাও শেষ হল। যে কাঠের পাটাতনে সোনার ঘণ্টাটা রাখা হয়েছে, সেটা একটা জহাজের পেছনে কাছি দিয়ে বাঁধা হল। রাজা, মন্ত্রী, ফ্রান্সিস, তার বন্ধুরা, আর সব সৈন্যরা সবাই জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস ফজলকে অনুরোধ করল, মকবুলকে যেন তার সঙ্গে যেতে দেওয়া হয়। ফজলের আপত্তি থাকার কোন কারণ নেই, কিন্তু মুশকিল হল ভাইকিংদের রাজাকে নিয়ে। তিনি বিদেশী বিধর্মী মকবুলকে নিজের দেশে নিয়ে যেতে রাজি হলেন না। ফ্রান্সিস রাজামশাইকে বোঝাল-মকবুল মানুষ হিসেবে খুবই ভাল। তার দায়িত্ব ফ্রান্সিস নিজেই নিল। রাজা আর আপত্তি করলেন না। ফ্রান্সিস তাদের নৌকোটা একটা জাহাজের সঙ্গে বেঁধে নিল। এই নৌকোটাতে করেই বিরাট লম্বা কাছি নিয়ে ফ্রান্সিসরা কুয়াশা ঝড় আর ডুবো পাহাড়ের বিপদ পার হয়ে সোনার ঘন্টা আনতে পেরেছিল। সবাই ঐ নৌকোটার কথা ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু ফ্রান্সিস তা ভোলে নি। নৌকোটাকে বরাবর নিজেদের জাহাজের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। আসল কথা, ফ্রান্সিস আবার পালাবার ফিকির খুঁজছিল। নৌকোটা থাকলে জাহাজ থেকে পালানো সহজ হবে। ফ্রান্সিসের এই পালানোর ফন্দীর কথা কেউ জানত না, জানত শুধু ফ্রান্সিসের বন্ধু হ্যারি। নৌকো করে জাহাজ থেকে পালিয়ে আফ্রিকায় নামা যাবে।
–তা যাবে। কিন্তু সেই পাহাড়টাতে যেভাবে ধ্বস নেমেছিল, তারপর এখন যে ওটার কী অবস্থা হয়েছে–
–পাহাড়ের অবস্থা যাই হোক, হীরেটা তো আর পালাবে না?
–হুঁ, কিন্তু আমাদের তো প্রথমে ওঙ্গালির বাজারে যেতে হবে। অনেকটা পথ।
–তাই যাব আমরা। –বেশ আমার কোন আপত্তি নেই।
–মকবুল, তুমি হবে গাইড। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।
–বেশ।
ফ্রান্সিস বলল–মকবুল সমস্ত ঘটনাটা আর একবার বলো তো।
–কোন্ ঘটনা?
–সেই হীরের পাহাড়ের সন্ধান তুমি কীভাবে পেয়েছিলে। কী ঘটেছিল সেখানে।
–কেন? তোমাকে তো সব ঘটনাই বলেছিলাম।
–আবার শুনতে চাইছি। ঘটনাটা আবার শুনলে বুঝতে পারব, ওখানে যে হীরেটা ছিল, সেটার কী হল।
–বেশ, শোন; বলে মকবুল বলতে আরম্ভ করল–আমি কার্পেট বিক্রীর ধান্দায় গিয়েছিলাম ওঙ্গালিতে। জায়গাটাতে কেরুর বন্দর থেকে যেতে হয়। আমি ঘোড়ায় টানা গাড়ীতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ গাড়ীর চাকাটা রাস্তায় পাথরের সঙ্গে লেগে গেল ভেঙে। কাছেই এক কামারের কাছে সারাতে দিলাম। কামারটার নাম বুঙ্গা। ওই আমাকে প্রথম সেই অদ্ভুত গল্পটা শোনাল। ওঙ্গালি থেকে মাইল পনেরো উত্তরে একটা পাহাড়। গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। পাহাড়টার মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে একটা গুহা। দূর থেকে গাছ-গাছালি ঝোঁপ-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গুহাটার সমান্তরালে এসে সূর্যের আলো সরাসরি গিয়ে গুহাটায় পড়ে। তখনই দেখা যায় গুহার মুখে আর তার চারপাশের গাছের পাতায়, ডালে-ঝোপে এক অদ্ভুত আলোর খেলা। আয়না থেকে যেমন সূর্যের আলো ঠিকরে আসে, তেমনি রামধনুর রঙের মত বিচিত্র সব রঙীন আলো ঠিকরে আসে গুহাটা থেকে। অনেকেই দেখেছে এই আলোর খেলা। ধরে নিয়েছে ভূতুড়ে কাণ্ড কারখানা। ভূত-প্রেতকে ওরা যমের চেয়েও বেশী ভয় করে। কাজেই কেউ এই রঙের খেলার কারণ জানতে ওদিকে পা বাড়াতে সাহস করে নি।
