তারপর গুহার মুখে এসে দড়িটা ধরে কিভাবে নেমে এসেছিলাম, আজও জানি না। পর পর পাঁচদিন ধরে বুনো ফল আর ঝরনার জল খেয়ে হাঁটতে লাগলাম। গভীর জঙ্গলে কতবার পথ হারালাম, বুনো জন্তু জানোয়ারের পাল্লায় পড়লাম। তারপর যেদিন এক সন্ধ্যার মুখে ওঙ্গালির বাজারে এসে হাজির হলাম, সেদিন আমার চেহারা দেখে অনেকেই ভূত দেখবার মত চমকে উঠেছিল।
মকবুলের গল্প শেষ। দু’জনেই চুপ করে বসে রইল। দু’জনের কারোরই খেয়াল নেই যে রাত হয়েছে। এবার দোকান বন্ধ হবে।
–এই দেখুন–মকবুল ডান হাতটা বাড়াল। মাঝের মোটা আঙুলটায় একটা হীরের আংটি।
–সেই হীরের টুকরো নাকি? ফ্রান্সিস বিস্ময়ে প্রশ্ন করল।
মকবুল মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল, বলল–বুঙ্গা যখন হাতুড়ি চালাচ্চিল তখন কয়েকটা টুকরো ছিটকে এসে আমার জামারআস্তিনে আটকেগিয়েছিল। তখন জানতে পারিনি, পরে দেখেছিলাম।
দোকানী এসে তাড়া দিল, রাত হয়েছে দোকান বন্ধ করতে হবে।
দু’জনে উঠে পড়ল। দোকানীর দাম মেটাতে গিয়ে ফ্রান্সিস ওর থলিটা বের করল। সুলতানী মুদ্রাগুলোর সঙ্গে মোহরটাও ছিল। মোহরটা দেখে মকবুল যেন হঠাৎ খুব চঞ্চল হয়ে পড়ল। থাকতে না পেরে বলেই ফেলল–মোহরটা একটু দেখব?
–দেখুন না–ফ্রান্সিস মোহরটা ওর হাতে দিল। ফ্রান্সিস দাম মেটাতে ব্যস্ত ছিল। তাই লক্ষ্য করল না মোহরটা দেখতে দেখতে মকবুলের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল। কিন্তু নিজের মনের ভাব গোপন করে ও মোহরটা ফিরিয়ে দিল।
-সুন্দর মোহরটা, রেখে দেওয়ার মত জিনিস।
–হুঁ, –রাখতে আর পারলাম কই? ফ্রান্সিস সখেদে বলল।
–কেন?
–আর একটা ঠিক এরকম দেখতে মোহরও ছিল।
–কি করলেন সেটা?
–এখানকার বাজারে এক জহুরীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।
–ইস, –মকবুল মাথা নাড়ল–ও ব্যাটা নিশ্চয়ই ঠকিয়েছে আপনাকে।
–কি আর করব, নইলে না খেয়ে মরতে হত।
–কোন্ জহুরীর কাছে বিক্রি করেছেন?
–রাস্তায় নেমে মকবুল জিজ্ঞেস করল–কোথায় থাকেন আপনি?
–এখনো কোন আস্তানা ঠিক করিনি।
–বাঃ, –বেশ–মকবুল হাসল–চলুন আমার সঙ্গে।
–কোথায়?
–সুলতানের এতিমখানায়।
–এতিমখানায়!
–নামেই এতিমখানা–গরীব মানুষেরা থাকতে পায় না। আসলে বিদেশীদের আড্ডাখানা ওটা।
–চলুন–মাথা তো গোঁজা যাবে।
রাস্তায় আসতে-আসতে ফ্রান্সিস মকবুলকে জহুরীর দোকানটা দেখাল। মকবুল গভীরভাবে কি যেন ভাবছিল। দোকানটা দেখে মাথা নেড়ে শুধু বলল–ও।
ফ্রান্সিস আন্দাজও করতে পারেনি মকবুল মনে মনে কি ফন্দি আঁটছে।
মকবুলের কথা মিথ্যে নয়। সত্যিই এতিমখানা বিদেশী ব্যবসায়ীদের আড্ডাখানা। কত দেশের লোক যে আশ্রয় নিয়েছে এখানে। আফ্রিকার কালো কালো কোঁকড়া চুল মানুষ, যেমন আছে, তেমনি নাক চ্যাপ্টা কুতকুতে চোখ মোঙ্গল দেশের লোকও আছে।
মকবুল একটা ঘরে ঢুকল। দু’জন লোক কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। আর একটা বিছানা খালি, ওটাই বোধহয় মকবুলের বিছানা। ঘরের খালি কোণটা দেখিয়ে মকবুল বলল–ওখানেই আপনার জায়গা হয়ে যাবে, সঙ্গে তো আপনার বিছানা পত্তর কিছুই নেই?
–না।
–আমার বিছানা থেকেই কিছু কাপড়-চোপড় দিচ্ছি, পেতে নিন। ফ্রান্সিস বিছানামত একটা করে নিল। সটান শুয়ে ক্লান্তিতে চোখ বুজল। ঘুম আসার আগে পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিল ঘরের দু’জন লোকের সঙ্গে মকবুল মৃদুস্বরে কি যেন কথাবার্তা বলছে। সে সব কথার অর্থ সে কিছুই বুঝতে পারে নি।
ঘুম ভাঙতে ফ্রান্সিস দেখল বেশ বেলা হয়েছে। লোকজনের কথাবার্তায় এতিমখানা সরগরম। ফ্রান্সিস পাশ ফিরে মকবুলের বিছানার দিকে তাকাল। আশ্চর্য! কোথায় মকবুল? মকবুলের বিছানাও নেই। পাশের বিছানায় লোকটি তখন দু’হাত ওপরে তুলে মুখ হাঁ করে মস্ত বড় হাই তুলছিল। ফ্রান্সিস তাকেই জিজ্ঞাসা করল–আচ্ছা, মকবুল কোথায়?
লোকটা মৃদু হেসে হাতের চেটো ওল্টাল, অর্থাৎ সে কিছুই জানেনা। মরুক গে এখন হাত মুখ ধুয়ে কিছু খাওয়ার চেষ্টা দেখতে হয়, ভীষণ খিদে পেয়েছে। হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে এসেফ্রান্সিস দেখল, ঘরের আর একজন তখন ফিরছে। কিন্তু মকবুল একেবারেই বেপাত্তা। ফ্রান্সিস খেতে যাবে বলে থলেটা কোমর থেকে বের করল, কিন্তু এ কি? থলে যে একেবারে খালি। সুলতানী মুদ্রাগুলো তো নেই-ই, সেই সঙ্গে মোহরটাও নেই। সর্বনাশ! এই বিদেশ বিই। কে চেনে ওকে? মাথা গোঁজার ঠাঁই না হয় এই এতিমখানায় জুটল। কিন্তু খাবে কি? খেতে তো দেবে না কেউ। তার ওপর কাঁধের ঘাটা এখনও শুকোয় নি। শরীরের দুর্বলতাও সবটুকু কাটিয়ে উঠতে পারে নি। এই অবস্থায় ও একেবারে সর্বশান্ত হয়ে গেল। ফ্রান্সিস চোখে অন্ধকার দেখল।
ওর চোখমুখের ভাব দেখে ঘরের আর দু’জনেও বেশ অবাক হল–কি ভিনদেশী লোকটার? ওদের মধ্যে একজন উঠে এল। লোকটার চোখের ভুরু দুটো ভীষণ মোটা। মুখটা থ্যাবড়া। ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল–কি হয়েছে?
ফ্রান্সিস প্রথমে কথাই বলতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। লোকটা আবার জিজ্ঞেস করল–হল কি? ও-রকম ভাবে তাকিয়ে আছেন?
–আমার সব চুরি গেছে।
–ও, তাই বলুন। লোকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার বিছানায় গিয়ে বসল। বলল—
–এটা এতিমখানা–চোর, জোচ্চোরের বেহেস্ত মানে স্বর্গ আর কি? তা কত গেছে? ফ্রান্সিস আন্দাজে হিসেব করে বলল। মোহরটার কথাও বলল।
–ও বাবা। মোহর-ফোহর নিয়ে এতিমখানায় এসেছিলেন? কত সরাইখানা রয়েছে, সেখানেই গেলে পারতেন।
