মাথা গরম হয়ে গেল আমার : নিজেকে বিরাট মনে করছিস মনে হচ্ছে? আমার না হয় কলমের জোর নেই, তোরও গোয়েন্দাগিরির জোর এমন কিছু নেই যে রাতারাতি পৃথিবী বিখ্যাত হবি। এত অহঙ্কার ভালো নয়। পতনের পূর্ব লক্ষণ।
যেন শুনতেই পায়নি। এমন ভাবে জানলা দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে ইন্দ্রনাথ আত্মগত ভাবে বলে চলল, যত ভাবি ততই অবাক হই। গোয়েন্দা কে নয়? সব মানুষই নিজের নিজের পেশায় অল্পবিস্তর গোয়েন্দা। চিন্তাকে যে ডিসিপ্লিনে আনতে পেরেছে, বুদ্ধিকে যে একাগ্র করতে পেরেছে, পর্যবেক্ষণকে যে প্রয়োগ করতে পেরেছে–গোয়েন্দা হবার যোগ্যতা তার মধ্যে আছে। ভালো ডাক্তারকেও ফাঁদ পেতে রোগকে সন্ধান করতে হয়। এইরকম একটি চরিত্র শার্লক হোমস এবং সুবিখ্যাত ডিটেকটিভ মেথডের সৃষ্টি করেন কোনান ডয়াল। অফিসার যদি অন্ধ হয়, কারবারি যদি ভোঁতা-বুদ্ধি হয়, তাহলে লুঠেরা জোচ্চোরেরা দুদিনেই রাজা হয়ে বসত। বুদ্ধির লড়াই চলছে। সর্বক্ষেত্রে। এরকম টুকটাক অনেক ঘটনা আমার জানা আছে। অফিসার নিজেই গোয়েন্দা হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা বাঁচিয়ে দিয়েছে কোম্পানির।
তা ঠিক, সায় দিল কবিতা : প্রবঞ্চকরা দুষ্ট জীবাণুর মতোই কিলবিল করছে আশেপাশে। যে যত ভালো গোয়েন্দা, সে তত নিরাপদ। কথাগুলো দামি কথা সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার নিরীহ সোয়ামীকে ঠেস দিয়ে কথা বলার কি দরকার বলতে পারো?
কেন বলব না বলতে পারো? চুরুট নামিয়ে বলল ইন্দ্রনাথ, স্ট্যানলি গার্ডনার, সিরিল হেয়ার–এঁরা প্রত্যেকেই পেশায় উকিল। তাই তাদের গোয়েন্দা গল্পে অত ধার। কোনান ডয়াল, নীহার গুপ্ত পেশায় ডাক্তার–তাই লেখাও ক্ষুরধার। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, জি-কে চেস্টারটন সাহিত্যের সম্রাট–গোয়েন্দা গল্পেও তার আভাস। কিন্তু আমাদের মৃগাঙ্ক রায়ের কি গুণ আছে বলতে পারো। না, না, চটলে চলবে না। গুণীর কাছে প্রশস্তির চেয়ে সমালোচনার কদর বেশি।
কিন্তু এর নাম ছিদ্রান্বেষণ–সমালোচনা নয়। মুখ টিপে হেসে বলল কবিতা।
ছিদ্র অন্বেষণ করাই তো আমার কাজ। চুরুট ফের কামড়ে ধরে বলল ইন্দ্রনাথ, নিচ্ছিদ্র চক্রান্তে ছিদ্র খুঁজে বার করার সাধু নাম হল গোয়েন্দাগিরি। সত্য আর ছিদ্র এক্ষেত্রে একই টাকার এপিঠ-ওপিঠ।
মুখ লাল করে বললাম, এর শোধ আমি তুলব, ইন্দ্র। এখন থেকে তোকে ছিদ্রান্বেষী ইন্দ্রনাথ বলেই চালাব–সত্যান্বেষী নয়।
অট্টহেসে বললে ইন্দ্রনাথ, ভালোই তো, তাতে এক ঢিলে দু-পাখি মরবে। তোর ভাষায় গ্ল্যামারের অভাব প্রকাশ পাবে। আর, এতদিন বাদে আমার কপালে একটা খেতাব অন্তত জুটবে।
এমন সময়ে কবিতা বললে সবিস্ময়ে, ওকি অবনীবাবু, নাক টিপে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
রাগ জল হয়ে গেল দরজার দিকে তাকাতেই। অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অবনী চাটুয্যে দাঁড়িয়ে সেখানে। তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে আছেন বাঁ-নাকের বাম ছিদ্র। বললেন অনুনাসিক কণ্ঠে, দেখছি উঁন ফুটোয় নিসে পড়ছে কিনা।
তাজ্জব হয়ে বললাম, সে আবার কী?
নাক ছেড়ে দিয়ে বাঁ-পা আগে বাড়িয়ে ঘরে পদার্পণ করলেন অবনীবাবু। বললেন, শাস্ত্র তো মানেন না। মানলে এত দুর্ঘটনা দেশে ঘটত না।
সকৌতুকে বলল ইন্দ্রনাথ, ইড়া আর পিঙ্গলার ব্যাপার মনে হচ্ছে?
ভীষণ খুশি হলেন অবনীবাবু ও যাক, জানেন তাহলে। শুভকর্মে চন্দ্রনাড়ী প্রশস্ত। মানে, বাঁ-নাকে নিসে পড়লেই শুভকর্ম করা উচিত।
এখন কোন নাকে পড়ছে দেখলেন?
বাঁ-নাকে। সেই জন্যেই তো বাঁ-পা ফেলে ঢুকলাম মশায়।
অশুভ ঝাটে পড়েছেন মনে হচ্ছে?
টাক চুলকে বললেন অবনীবাবু, আর বলেন কেন, একেবারে নিচ্ছিদ্র প্লট মশাই– স্কাউড্রেলটাকে ধরেও ধরতে পারছি না।
অপাঙ্গে আমার পানে চাইল ইন্দ্রনাথ। বলল, ছিদ্র খুঁজতে হবে তো? বলুন, বলুন, ছিদ্রান্বেষী হাজির।
.
বলব কি মশায়, রাত দুটোর সময়ে সে কি উৎপাত! ঝনঝনঝন। বুঝছেন তো কীসের উৎপাত? টেলিফোন! টেলিফোন! যতক্ষণ মরে থাকে, ততক্ষণ ঘুমিয়ে খেয়ে জিরিয়ে বাঁচি মশায়, জ্যান্ত হলেই প্রাণান্ত!
যাক, যা বলছিলাম, রাত দুটোর সময়ে আরম্ভ হল টেলিফোনের বাঁদরামি। ঠিক যেন ঘুংড়ি কাসি। ইচ্ছে হল দিই ব্যাটাকে এক ডোজ স্পঞ্জি খাইয়ে। হোমিওপ্যাথি বিদেশ থেকে এসেছে বলে এত হেনস্থা করবেন না। গরু হারালে শুধু গরু খুঁজে পাওয়া যায় না। বাদবাকি সব হয়। মহাত্মা হানিম্যান বলেছেন…
যাচ্চলে! যা বলতে যাচ্ছিলাম ভুলে গেলাম…। ও হ্যাঁ, নিচ্ছিদ্র প্লট। রাত দুটো। টেলিফোন। ঘুম ভাঙতেই তেড়েমেড়ে রিসিভার খামচে ধরে চেঁচিয়ে উঠলাম, কে? কে? এত রাত্রে কীসের দরকার?
অমনি মিষ্টি গলায় তোতলা স্বরে ককিয়ে উঠছিল একটা মেয়েছেলে : অবনীবাবু? বাঁ-বাঁচান! ওরা আ-আ-আমাকে কিডন্যাপ করতে আসছে!
সে এক জ্বালা মশায়! ভগবান তোতলাদের মেরেছেন। আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু কথা বলতে গেলে বলুন দিকি মাথা গরম হয় না?
যাই হোক, হড়বড় করে তোতলাতে তোতলাতে মেয়েটা বললে পার্ক টেরেসের দশতলার ফ্ল্যাট থেকে তাকে গায়েব করতে আসছে ডাকাতরা। এক্ষুনি না এলেই নয়।
কথার শেষ পর্যন্ত শোনা গেল না, কড়-ড়-ড় করে গেল লাইনটা কেটে। এদিকে অ্যাটম বোমা ফাটিয়ে মরছি; অথচ টেলিফোনটা পর্যন্ত নিখুঁত বানাতে পারি না। মাইক্রোস্কোপ আনাই বিলেত থেকে। ঘেন্না ধরে গেল মশাই দেখে শুনে।
