ঈশানী চেয়েছিল আমার পানে। চোখ তুলতেই বলল–একটা কথা জানার ছিল। শিলাদকুমার লোকটা কীরকম?
কনকনে বরফ-খণ্ডের মতো কথাটা কানের পর্দায় গিয়ে আঘাত হানল। সঙ্গে সঙ্গে ভাবনার স্রোত বইল অন্যদিকে। জানি শিলাদ কি বলবে। আমাকে নিকেশ করে ঈশানী আমার বেশে ব্লু-টেম্পলে ফিরলেই শিলাদ শুধোবে–কিগো পরী, ঈশানীকে দেখলে?
ঈশানী নতুন ঢং শুরু করবে। বলবে, চুলটা হঠাৎ ছাঁটতে হল। শুনে শিলাদ সাদাসাদা ঝকঝকে দাঁত বার করে অট্টহাসি হাসবে। কাছে টেনে নেবে ঈশানীকে।
লুঠ হয়ে যাবে শিলাদকুমার! আমার জীবনের সবচাইতে দামি, সবচাইতে আদরের, সবচাইতে গোপনীয় মণিকোঠায় ধুলো পায়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করবে শয়তানী ঈশানী। হীরে জহরতকেও ছড়িয়ে রাখি, কিন্তু সন্তর্পণে সরিয়ে রাখি যে মানুষটিকে–সেই শিলাদকুমারকে কেড়ে নিয়ে যাবে ঈশানী–কিন্তু কেউ কোনওদিন জানতেও পারবে না! শিলাদের নিঃশ্বাসে উত্তপ্ত হবে ঈশানী, শিলাদের আদরে বিহ্বল হবে শয়তানি!
ভাবতে ভাবতেই লক্ষ লক্ষ অগ্নিশিখা যেন উদ্দাম নৃত্যে আগুন ধরিয়ে দিল শিরায় শিরায়, মগজের প্রতি স্নায়ুকোষে। যা হবার নয়, তাই হতে চলেছে–অসম্ভব সম্ভব হতে চলেছে। সেই মুহূর্তে দুর্বিসহ এই সম্ভাবনা নিঃশেষে মুছে নিয়ে গেল আমার সমস্ত ভয়, আতঙ্ক, আশঙ্কা। ইচ্ছে হল…প্রচণ্ড ইচ্ছে হল চুলোয় যাক রিভলভারের তপ্ত বুলেট…ইচ্ছে হল লাফিয়ে গিয়ে ঝাঁপিড়ে পড়ি কুচক্রী ঈশানীর ওপর…আঁচড়ে কামড়ে চড়িয়ে পিটিয়ে কেড়ে নিই নিকষ হাতিয়ার…খামচে খুবলে ছিঁড়ে মেরে বিচুর্ণ করি ওর আকাশ-কুসুম আশার…কিন্তু না.মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে..শয়তানী বুদ্ধি দিয়েই কজায় আনতে হবে।
অকস্মাৎ পরিকল্পনাটার আবির্ভাব ঘটেছিল মগজে। মস্তিষ্কের সেই মুহূর্তের উর্বরতায় পরে বিস্মিত হয়েছিলাম। মিথ্যে…একটা ডাহা মিথ্যেকে বলতে হবে সত্যির মতো করে…পারব না? নিশ্চয় পারব..আমি যে অভিনেত্রী…মিথ্যের বেসাতিতে বড় কারবারী!
ঈশানী, আবেগের পুঞ্জ মেঘ গলার মধ্যে সঞ্চয় করে বললাম–ঈশানী, শিলাদকুমারের সব কথাই তোমাকে বলতে পারি। যা জানি–সব। তারপর তুমি আমাকে খুনও করতে পারো। কিন্তু আমার ভাগ্যে যা লেখা, তা রোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। ঈশানী, তোমারও নেই।
বলে থামলাম। সেকেন্ড কয়েক শব্দহীন সাসপেন্স সৃষ্টি করলাম। তারপর একই সুরে কথার খেই টেনে বললাম–ঈশানী, আমার পরিণতি রোধ করবার ক্ষমতা তোমারও নেই। নিয়তির লিখন, ঈশানী, নিয়তির লিখন। একথা কেউ জানে না, কাউকে বলিনি। কাগজে কোথাও বেরোয়নি। জানো আমার শেষ কোথায়? কী অবস্থায়?
উৎকণ্ঠা। নৈঃশব্দ্য। ঈশানীর নির্নিমেষ চাহনি।
আর মাত্র ছমাস। ছমাস পরেই আমাকে যেতে হবে অ্যাসাইলামে..রাঁচির পাগলাগারদে… দুরারোগ্য ব্যাধিতে দিনে দিনে পাকিয়ে যাচ্ছি আমি…এত খাই কিন্তু গায়ে মাংস লাগে না (ব্রেকফাস্টে ক্রিম খাওয়া নিয়ে শিলাদকুমারের রঙ্গ পরিহাস আমার মিথ্যেকে অনেকটা সত্যির বনেদ জোগাল)… আর মাত্র ছমাস, ছমাস বাইরে থাকার অনুমতি দিয়েছে ডাক্তার…এই ছমাস শেষ বিশ্রাম নিচ্ছি। ব্লু-টেম্পলে..কাগজে কে না সে খবর পড়েছে…কিন্তু এ বিশ্রাম যে শেষ বিশ্রাম তা কেউ জানে না…জানে না শিলাদকুমার আমাকে শেষ সঙ্গসুখ দিচ্ছে বহু অর্থের বিনিময়ে…
এইখান থেকেই আমার অভিনয় প্রাণবন্ত হল। শিলাদকুমার যে দেহ মনে একটা অসুর ছাড়া কিছু নয়–এ সত্য বলতে বলতে আমি কেঁদে ফেললাম। শিলাদকুমার যে বহু অভিনেত্রীর শয্যায় অংশ নিয়েছে, এ ঈর্ষা আমার অন্তর সেই মুহূর্তে বিষিয়ে তুলল। শিলাদকুমারের সাত মাস কাম্বোডিয়া প্রবাস যে অনেক গোপন রঙ্গের মুখরোচক ইতিহাস, এ কল্পনা চোখের জল আরও বৃদ্ধি করল। ফলে, অশ্রু যেন বন্যার মতো উপচে পড়ল দু-গাল বেয়ে। রমণীমোহন শিলাদকুমার তুমি আমার যৌবন-সুধার শেষ বিন্দুটিও লুঠে নিতে এসেছ…তারপর যাবে নতুন ফুলে, নতুন মধুর লোভে। এ ফুল যাবে ঝরে…ছমাস পরে রাঁচির পাগলাগারদে শুরু হবে অনিশ্চিত জীবন। ডাক্তাররা? চেষ্টার ত্রুটি করেনি। কিন্তু শেষ ঘনিয়ে এসেছে…কেউ জানে না…জানি শুধু আমি আর শিলাদকুমার…
শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার আমার ভাগ্যে একাধিকবার জুটেছে। কিন্তু সেদিনের অভিনয় বুঝি সব রেকর্ডকেও ম্লান করে দিয়েছিল। তিল তিল করে আমার দীপ নিভে যাওয়ার কাহিনির শেষে আমি অঝোর ধারে কাঁদতে লাগলাম।
ঘর নিস্তব্দ। আমার উচ্ছ্বাস এবার নীরব অশ্রুধারায় পর্যবসিত। দুহাতে মুখ ঢেকে বেশ কিছুক্ষণ ডুকরে কাঁদলাম। মনের চোখ দিয়ে দেখলাম, কালো রিভলভারের মিশমিশে নলটা আমার ব্রহ্মরন্ধ্রে তাগ করেছে…অন্তিম নির্ঘোষের প্রত্যাশায় কাঠ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।
কিন্তু কোনও শব্দ নেই। নিস্তব্ধ ঘরে কেবল আমার ফোঁপানি যেন শ্মশানপুরীর হাহাকার সৃষ্টি করে চলেছে। দু-হাত নামিয়ে মাথা তুললাম। অবাক হয়ে গেলাম ঈশানীকে দেখে।
ঈশানী কাঁদছে। চেয়ারের পেছনে মাথা হেলিয়ে দিয়ে কাঁদছে। রিভলভারের নলচে নির্মমভাবে চেপে ধরেছে চিবুকের নীচে।
আপনিও…আপনিও… ফুঁপিয়ে উঠল ও।
ঈশানী! আমার আর্ত চিৎকারে আমি নিজেই চমকে উঠেছিলাম। ঈশানী! না..না…! বলতে-বলতে ছিটকে গিয়েছিলাম চেয়ার ছেড়ে। এক, ঝটকায় ওর শিথিল মুঠি থেকে কেড়ে নিয়েছিলাম রিভলভার। ঈশানী হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল আমার ওপর। দু-হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে সেকি কান্না!
