তারপর সোমদেব চৌধুরী একটির পর একটি প্রমাণ নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। বিশেষজ্ঞের রিপোর্টে প্রকাশ, ঊরুর হাড়ে যে বিকৃত-গঠন দেখা গেছে, তার ফলে নরকঙ্কালটির পক্ষে বিজ্ঞাপন–বর্ণিত ভাবে অবিকল ওই রকম খুঁড়িয়ে চলা উচিত–আর এই বিশেষ ভাবে খোঁড়ানোটাই হল কমলা সরকারের একমাত্র বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বাদীপক্ষ বিবিধ যুক্তিতর্কের সাহায্যে ডাক্তারদের স্বীকার করতে বাধ্য করেছে যে এ ধরনের বিকৃত গঠন অস্বাভাবিক হলেও অদ্বিতীয় নয়। শুধু বলা চলে এটা অসাধারণ। কিন্তু আবার খুব অসাধারণ নয়। শেষকালে, একজন ডাক্তার স্বীকার করলেন যে তাঁর তিরিশ বছর হসপিটাল এবং প্রাইভেট প্র্যাকটিশকালে, ঊরুর বিকৃত-গঠন অস্থির কেস তিনি মাত্র পাঁচবার শুনেছেন। সোমদেব চৌধুরী ছোট্ট একটি স্বস্তির শ্বাস ফেললেন; তিনি যেন অন্তর দিয়ে অনুভব করলেন যে এরপর বিচারকের রায় কি হবে।
জুরির কাছে এই সব খুঁটিনাটি তথ্য তিনি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন। যতক্ষণ না অপরাধ সম্পর্কিত অন্যান্য বস্তু, দেহ অথবা দেহের সনাক্তকরণযোগ্য কোনও অংশ প্রমাণরূপে উপস্থাপিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে যে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া অনুচিত–এই যুক্তিটির ওপর বারংবার জোর দিতে লাগলেন। বিষ্ণুপুরের সেই কাহিনীটা তিনি বললেন, হত্যাপরাধে তিনটি লোকের ফাঁসি হয়ে যাবার দু-বছর পর কীভাবে নিহত ব্যক্তি শিশ দিতে দিতে গ্রামে ঢুকেছিল। ভদ্রমহোদয়গণ, তিনি বললেন, সবশেষে আমি যা জানি, এবং আপনারাও যা জানেন, তা হল এই যে, যে কোনও মুহূর্তে কমলা সরকার প্রাকুটি করে এই আদালত-কক্ষ প্রবেশ করতে পারেন। (কয়েকটা শ্রোতা ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকে বারকয়েক লক্ষ্য করল) আমি নির্ভীকভাবে শুধু এই কথাই বলব যে তিনি মৃত, এই ধরনের কোনও অনুমান করা আমাদের কোনওমতেই উচিত নয়।
জগদীশবাবুর আত্মপক্ষ সমর্থন অবশ্য খুবই সংক্ষিপ্ত। যে কঙ্কালটি তিনি শ্রীকান্ত মিত্রের কাছে বিক্রয় করেছেন, সেটি গত তিন বছর যাবৎ বিভিন্ন অস্থি সংযোজন করে ধীরে-ধীরে তৈরি করেছিলেন। দুটি হাতে যে হুবহু মিল নেই, এদিকেও তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। আর, বাস্তবিকই এই ছোট্ট বৈষম্যটুকুও তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি।
সিদ্ধান্ত প্রকাশ করার আগে জুরিবর্গ আধঘণ্টা ধরে নিজেরা আলোচনা করলেন। তারপর ঘোষিত হল, জগদীশ সরকার নির্দোষ।
কিছুদিন বাদে শুনেছিলাম জগদীশবাবু দিল্লিতে চলে গেছেন, সেখানেই তাঁর শিল্পনৈপুণ্য এবং নব বিবাহিতা নম্র স্বভাবা একটি বন্ধু নিয়ে সুখে আছেন। একজন পুরোনো বন্ধুর সাথে তার দেখা হয়েছিল। কথায় কথায় সৌম্যমুর্তি জগদীশবাবু স্নিগ্ধ স্বরে বলেছিলেন, আমার বিচক্ষণ আইনজ্ঞটি আমায় একথাও বলেছিলেন যে, বেচারী কমলার মৃত্যু হয়েছে, একথা অনুমান করে নিলেও আমায় আর কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। প্রসন্নভাবে তিনি হেসে এরপর অন্য বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন।
সর্বশেষে একথা আমি বলে রাখতে চাই যে, আমার এ বর্ণনা হয়তো আংশিক কাহিনি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সোমদেব চৌধুরীর অপূর্ব বাগ্মীতা স্মরণ করে যতটুকু আমি বলতে পারি, তা হল এই যে জগদীশবাবু নির্দোষ। খুব সম্ভব তাঁর কাহিনি সম্পূর্ণ সত্য। কমলা সরকারও বহাল তবিয়তেই জীবিত আছেন, বিষ্ণুপুরের মতো তিনিও হয়তো একদিন সাদা নিমফুল ভক্ষিত মুখ নিয়ে ফিরে আসতে পারেন। আমার এ কাহিনিতে যদি কিছু সংশয়ছায়া কারও ওপর আমি ফেলে থাকি, তখন তা হয়তো শূন্যে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
যুক্তির পথে দেখলে কাঞ্চনপুর-রহস্য তাহলে মীমাংসিত রহস্য। নিশ্চয় তাই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে?
* রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত। ফাল্গুন, ১৩৬৩।
মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
কুরুক্ষেত্র। প্রতুল লাহিড়ী
স্থান–নির্জন কক্ষ । কাল–রাত্রি
(বিছানার ওপর তাকিয়া ঠেস দিয়ে বসে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম; মুখখানা চিন্তাচ্ছন্ন। কৃষ বসে অদুরে একখানা চেয়ারে। সেক্রেটারিয়েট টেবিলে ছড়ানো কাগজপত্র।)
কৃষ্ণ : বেশ, তাহলে ধ্বংসই চলুক।
ভীষ্ম : পাঁচখানা তরবারির বিরুদ্ধে একশোটা তরবারি ঝলসে উঠবে…
কৃষ্ণ : এটা তরবারির যুদ্ধ হবে না, ঠাকুরদা।
ভীষ্ম? তবে কীসের যুদ্ধ হবে?
কৃষ্ণ : এটা বিজ্ঞানের যুগ…
ভীষ্ম : (অসহ্য বিস্ময়ে) বিজ্ঞানের যুগ আবার কী হে? চার যুগের নামই তো জানি, সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি, এটা আবার কীসের ফ্যাকড়া?
কৃষ্ণ : (হাসলেন) বিজ্ঞানের যুগের সঙ্গে কারুর চালাকি খাটবে না। খাপের তরবারি খাপেই থাকবে, হাতের লাঠি থাকবে হাতে, তির-ধনুক পিঠেই ঝুলবে, মাঝ থেকে যোদ্ধার অকস্মাৎ পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটবে, অর্থাৎ হাত দুটো উড়ে যাবে দক্ষিণে, পা দুটো উড়ে যাবে উত্তরে, ধড়টার কোনও অস্তিত্বই থাকবে না।
ভীষ্ম : কিন্তু তা কী করে সম্ভব?
কৃষ্ণ : (দৃঢ়কণ্ঠে) বুদ্ধি, ঠাকুরদা, বুদ্ধি, স্রেফ কৃষ্ণের ক্ষুরধার বুদ্ধি…
ভীষ্ম : বুদ্ধিটা কি তোমার বৈজ্ঞানিক যুগেরই স্বধর্ম?
কৃষ্ণ ও আমার বুদ্ধি আমারই স্বধর্ম, বৈজ্ঞানিক যুগের নয়। যুদ্ধের নামে লোকধ্বংসের জন্য বৈজ্ঞানিকরা সৃষ্টি করবে এরোপ্লেন, মাস্টার্ড গ্যাস, বিমান বিধ্বংসী কামান, হাউইজার, শ্ল্যাপনেল, ইউবোট আর আমি…
