স্বামীজির সেবাধর্মে অনুপ্রাণিত কয়েকজন সন্ন্যাসীর বিচিত্র ত্যাগের কথাও আমরা বিস্মৃত হয়েছি। এঁদের নাম স্বামী শুভানন্দ (আদি ঠিকানা কলকাতার মুসলমানপাড়া লেন), স্বামী কল্যাণানন্দ (আদি নিবাস বরিশাল বানারিপাড়া), স্বামী নিশ্চয়ানন্দ যাঁর জন্ম মহারাষ্ট্রে, স্বামী স্বরূপানন্দ (জন্ম কলকাতায়) এবং স্বামী অচলানন্দ (আদি ঠিকানা কাশী)। জীবিতকালে যাঁদের হাতে নিগৃহীত হয়ে স্বামীজি জীবনের শেষ পর্বে বেশ মনোকষ্ট পেয়েছেন তাদের মধ্যে তার প্রিয় শিষ্য, শিষ্যা, অনুরাগী এবং অনুরাগিনীরা আছেন, জ্ঞাত অজ্ঞাত কারণে তারা ভক্তের আসন ত্যাগ করে প্রবাসের মাটিতেও প্রাক্তন গুরুর তিক্ত বিরোধিতা করেছেন। এঁদের কয়েকজনকে বিড়ম্বিত বিবেকানন্দ পর্বে আমরা দেখেছি, যেমন, স্বামী কৃপানন্দ, অভয়ানন্দ, মিস হেনরিয়েটা মুলার ও বহুদিনের ভারতপ্রেমী ই টি স্টার্ডি। বিদেশের মাটিতে চারজন অনুরাগী যেমন তিক্ত বিচ্ছেদের সৃষ্টি করলেন তেমন কয়েকজনের কথা বলা যেতে পারে যাঁরা গুরুনির্দেশে প্রতিটি কথা মান্য করার জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে দ্বিধা করলেন না। কোন্ মন্ত্রে বিবেকানন্দ তাদের এমনভাবে অনুপ্রাণিত করলেন তা তিনিই জানেন।
মনে রাখতে হবে, প্রিয়জনদের অপ্রত্যাশিত শত্রুভাব এবং অনুরাগীর প্রশ্নাতীত প্রেম দুই-ই বিবেকানন্দকাহিনিকে অবিশ্বাস্য মহিমায় আলোকিত করেছে।
এবারের নিবন্ধেআমরা স্বদেশের চারজনঅনুরাগীর গুরুনির্দেশেঅবিশ্বাস্য ত্যাগের অনুসন্ধান করবো। তার আগে, অনেকের কৌতূহল, এদেশে শ্রীরামকৃষ্ণের নামাঙ্কিত যেক’টি আরোগ্যনিকেতন রয়েছে তার কোনটিকে হাসপাতাল বলা হয় না কেন? কলকাতার সেবাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত এক প্রবীণ সন্ন্যাসী আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, পৃথিবীর প্রথম হাসপাতাল বহু শত বর্ষ আগে বৌদ্ধ যুগে এই দেশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার আরও নিবেদন, শুধু চিকিৎসাতেই আরোগ্য হয় না, মস্ত বড় ভূমিকা রয়েছে সেবার। নার্সিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝে সারা বিশ্ব এখন এই প্রফেশনের জয়গানে মুখর,কিন্তু সেবকও সেবিকাদের আচরণবিধি বৌদ্ধযুগের ভারতীয় সন্ন্যাসীরাই রচনা করেছিলেন। অঙ্কটা এইরকম : চিকিৎসা + সেবা = আরোগ্য।
রামকৃষ্ণ মিশন হাসপাতালগুলি তাই ‘সেবাশ্রম’ অথবা ‘সেবা প্রতিষ্ঠান’।
কনখলের সেবাশ্রমের আদিযুগের এক গল্প বলা যেতে পারে। বরিশালের বানারিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করে এক গোঁয়ার বাঙাল স্রেফ স্বামীজির ইচ্ছায় হাজির হয়েছিলেন হরিদ্বারের লাগোয়া জনপদ কনখলে। সেখানে একবার কয়েকজন কর্মী চাইলেন, এটাকে হাসপাতাল বলা হোক এবং কাজের সময় নির্দিষ্ট হোক।
সন্ন্যাসী তার উত্তরে বললেন, “দেখ, আমাদের তো আর হাসপাতাল নয়। স্বামী বিবেকানন্দ পাঠিয়েছেন সেবা করবার জন্য। এটা হচ্ছে সেবাশ্রম। এখানে বাপু ঘড়ি ধরে কাজ চলবে না। আমাদের হল সেবা ভাব।” অর্থাৎ হাসপাতাল নয়, সাধন-ক্ষেত্র–ভগবদুপাসনার স্থান।
ঘুরে-ফিরে কয়েকজন স্মরণীয় শিষ্য ও অনুরাগীর নাম এতদিন পরেও খুঁজে পাওয়া যায়। এঁদের একজনের জন্ম মহারাষ্ট্রের দক্ষিণ কানাড়ায়, একজনের ভবানীপুরে, একজনের চব্বিশ পরগণা ইছাপুরে, একজনের বেনারসে এবং আর একজনের বরিশাল উজিরপুরের হানুয়া গ্রামে। কী ছিল বিধাতার মনে, এঁদের মানবপ্রেমের প্রকাশ ঘটল কাশিতে এবং কনখলে।
তৃতীয় জনের বিবেকানন্দ অনুরাগের উৎস কাব্যপাঠ। সদ্য প্রকাশিত ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় স্বামীজি অবিশ্বাস্য একটি কবিতা লিখেছিলেন। অধুনালুপ্ত আর একটি পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যায় স্বামীজির হস্তক্ষরে কবিতাটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। এবারের নাম ‘আঁধারে আলোক’।উদ্বোধনে নাম ছিল ‘সখার প্রতি’। কবি বিবেকানন্দের রচনাটি কলকাতায় ছাপা হয়ে সুদূর কাশীধামে পৌঁছে তার জীবিতকালেই কী কাণ্ড করেছিল তা যথাস্থানে নিবেদন করবো।অনুপ্রাণিত ভক্তরা বলে থাকেন, এমন কবিতা পৃথিবীতে আর লেখা হয়নি।
কবিতার শেষ দুটি লাইন- বহুরূপে সম্মুখে তোমার, হাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।–বোধ হয় আমাদের পরমপ্রিয় মহামানবের মহত্তম বাণী, কিন্তু বাকি কবিতাটি কি সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের অকপট স্বীকারোক্তি? এবার বসুমতী পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় ফেরা যাক। “শ্রীমদ্ স্বামী বিবেকানন্দের হস্তলিপির নতুন শিরোনাম ‘আঁধারে আলোক’।” এই নামটি কোথা থেকে এল? এই নামেই কি প্রথম কবিতাটি লেখা হয়েছিল? না পরে নামের পরিবর্তন হয়? এই পরিবর্তনের মালিকানা কি স্বয়ং কবির? না পরবর্তীকালের সম্পাদকের? কিন্তু এই কবিতা তো কবির জীবিতকালেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। বসুমতীতে মুদ্রিত এই হস্তলিপিটিই কি কবি বিবেকানন্দের প্রথম পাণ্ডুলিপি? কারণ, যা এখন আমরা ছাপার অক্ষরে পঞ্চাশ লাইনে পড়তে অভ্যস্ত তা স্বামীজির নিজস্ব হস্তলিপিতে অর্ধেক আকারে পঁচিশ লাইনে আবদ্ধ হতে দেখা যাচ্ছে।
বিবেকানন্দর এই কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় উদ্বোধন পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায়। উদ্বোধন প্রথম সংখ্যার প্রকাশ ১৪ জানুয়ারি ১৮৯৯।
এই সময়কার ঘটনা শুনুন। পাঠকের নাম চারুচন্দ্র দাস, কলকাতার ঠিকানা মুসলমানপাড়া লেন, রিপন কলেজে পড়াশোনা। একসময় কলকাতার অ্যাটর্নি ফার্ম সোইলহ এন্ড চন্দ্রতে কেরানি হিসেবে সকাল দশটা থেকে চারটে পর্যন্ত কাজ করতেন। স্বামীজি যেদিন পাশ্চাত্যদেশ জয় করে প্রথমবার স্বদেশে ফিরলেন, সেদিন (১৮৯৭, ২১ ফেব্রুয়ারি) শিয়ালদহে স্বামীজির ঘোড়ার গাড়ি টেনে চারুচন্দ্র ভেবেছিলেন পুরীতে জগন্নাথদেবের রথ টানছেন। পরের বছর পিতা শ্যামশঙ্কর দাস ও মা কাশীবাসী হলে চারুচন্দ্রও কাশীবাসী হন, ওখানে একটা স্কুলে মাস্টারি করেন, মাইনে নেই তবে বিনামূল্যে মধ্যাহ্নভোজন আছে।
