৭ মে ১৯০২ সালে সংবাদ থেকে জানা যায় কাশিমবাজারের মাননীয় মহারাজার অর্থানুকূল্যে মাদাম মেরি লুই আবার ভারতে আসেন। স্বামীজির দেহত্যাগের সময় (৪ জুলাই ১৯০২) তিনি এদেশে ছিলেন এবং বিভিন্ন ধনীপরিবারে গিয়ে বক্তৃতা করেন। ৭ জুলাই ১৯০২-এর আগে স্বামীজির তিরোধান সংবাদ অমৃতবাজার পত্রিকায় বেরোয়নি–রিপোর্টের আকার সিকি কলম, কিন্তু একই দিনে অভয়ানন্দের একটা বক্তৃতার রিপোর্ট ছিল ঠাসা কয়েক কলম ভর্তি। ১৪ জুন ১৯০২ মিসেস সারা বুলকে স্বামীজি এই শিষ্যা সম্বন্ধে লেখেন, “শুনতে পাচ্ছি, জনকয়েক ধনী তাকে লুফে নিয়েছে। সে যেন এবারে প্রচুর অর্থ পায়–এই আমার আকাঙ্ক্ষা।”
“আমাকে যে যে ভাবে উপাসনা করে, আমি সেভাবেই তাকে অনুগ্রহ করি। সে টাকা চেয়েছিল। ভগবান তাকে প্রচুর টাকা দিন।”
স্বামী অভেদানন্দের স্মৃতি কথায় আরও একটি কাহিনী আছে। সেটাও জেনে রাখা মন্দ নয়। অভেদানন্দ সূত্র থেকে আরও জানা যায়, পরে আমেরিকায় অনেক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে অতি শোচনীয় ভাবে সন্ন্যাসিনী শিষ্যা অভয়ানন্দের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯১৩ সালে শিকাগোর বাড়িতে আগুন লেগে অভয়ানন্দ সর্বস্বান্ত হন। ১৯১৫ সত্তর বছরের এই বৃদ্ধাকে কোল্ড, হাংরি ও পেনিলেস বলে বর্ণনা করা হয়। তিনি দুঃখ করেন, জীবনে অনেক ভুল করেছি, এখন কর্মফল ভুগতে হবে। কিন্তু তারও আগে স্বামী অভেদানন্দের মুখে শোনা যায়, মেরি লুই ভারতে এসে বিশেষভাবে সংবর্ধিত হন এবং ঢাকায় তিনি কয়েকটি বক্তৃতা করেন। সেখান থেকে ফিরবার পরে তিনি বেলুড়ে উপস্থিত হন, তখন সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ, সিস্টার নিবেদিতা, মিসেস ওলি বুল, মিস ম্যাকলাউড প্রভৃতি হোমাগ্নির চারপাশে ব্যাঘ্র ও মৃগচর্মাসনে বসেছিলেন। মেরি লুই আচমকা উপস্থিত হওয়ায় এবং অন্য কিছু না পাওয়ায় তাকে একখানি ছাগচর্মের আসন দেওয়া হয়। এতে তিনি ভীষণ রেগে যান এবং স্বামীজির বিরুদ্ধ-দলে যোগ দেন।
শুধু এক কোকিলে যেমন বসন্ত আসে না তখন একজন অভয়ানন্দ বা কৃপানন্দ কোনো মহামানবের জীবনে কষ্ট আনেন না। নির্দোষ বিবেকানন্দের হতভাগ্য জীবনে এঁরা অনেকেই হাজির হয়েছেন কালো মেঘের মতন।
ই টি স্টার্ডির জীবনের সঙ্গে বিবেকানন্দ ও তার আন্দোলন একসময়ে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। ইনি একজন স্কট ভদ্রলোক। ভাগ্যানুসন্ধানে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বছরখানেকের মধ্যে দশ হাজার পাউন্ড উপার্জন করে তিনি ইংলন্ডে ফিরে আসেন। থিওজফি তাকে ভারতে নিয়ে আসে, পরে তিনি সন্ন্যাসী হন এবং যথাসময়ে বিবেকানন্দের কয়েকজন গুরুভাইর প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। পরবর্তী সময়ে স্টার্ডি ইংলন্ডে ফেরেন এবং বিয়ে করে সংসারী হন। মহেন্দ্রনাথের ‘লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ’ গ্রন্থে আমরা স্টার্ডি ও তার স্ত্রীর অনেক বর্ণনা পাই। আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণ রয়েছে শ্ৰীমতী মেরি লুইস বার্কের বইতে।
অনেকের ধারণা স্টার্ডির স্ত্রীর প্রচণ্ড প্রভাব থেকেই পরবর্তী কালে অশান্তির সূত্রপাত। ১৮৯৯ সালের মাঝামাঝি তিনি স্বামীজির কাজের নিন্দা শুরু করলেন এবং বেদান্ত আন্দোলনের সঙ্গে হঠাৎ সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। ব্যাপারটা যে স্বামীজির কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়েছিল তা এখন কারও অজানা নয়।
সম্পর্ক ছিন্ন হবার আগে ই টি স্টার্ডি মিসেস ম্যাকলাউডকে জানান, স্বামীজি লন্ডনে এসে তার বাড়িতে থাকুন। কিন্তু ছ’মাস পরে স্বামীজি যখন লন্ডনে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন তিনি পরিষ্কারভাবে জানালেন তার পক্ষে কোনো খরচাপাতি করা সম্ভব হবে না। ৩১ জুলাই ১৮৯৯ স্বামীজি যখন বিলেতে ফিরে এলেন তখন স্টার্ডি তাকে অভ্যর্থনা করতে বন্দরেও এলেন না।
মিস হেনরিয়েটা মুলারের বাবা ছিলেন জার্মান, চিলিতে গিয়ে কাঠের ব্যবসায় তিনি রীতিমতো ধনী হন এবং পরে ইংলন্ডে ফিরে এসে ছেলেমেয়েদের মধ্যে তার সম্পদ ভাগ করে দেন। মিস মুলার পরে দলত্যাগী হয়ে, প্রকাশ্যে অভিযোগ তুললেন, মুখে যাই বলা হোক, হিন্দুধর্মের প্রধান কথা হলো লিঙ্গপূজা। আরও গুরুতর অভিযোগ তুললেন, ভারতবর্ষে কাজের জন্য স্বামী বিবেকানন্দকে যে টাকা দেওয়া হয়েছিল তা তিনি নিজের পরিবারের পিছনে ঢেলেছেন।
এই ধাক্কা সাসময়ে ই টি স্টার্ডির ওপরও এল। তিনি সম্পর্ক ছাড়বার আগে যুক্তি খুঁজতে গিয়ে স্বামীজির কাছে টাকা কড়ির হিসেব চাইলেন। ৬ আগস্ট ১৮৯৯ স্বামীজি ইংলন্ডের উইম্বলডন থেকে মিসেস বুলকে হিসেব সংক্রান্ত একটা স্পষ্ট চিঠি লেখেন। “আপনি এবং অন্যরা কাজের জন্য আমাকে যে টাকা দিয়েছেন তার থেকে একটা টাকাও আমি নিইনি। আমার মাকে সাহায্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত জানিয়ে ক্যাপটেন সেভিয়ার আমাকে ৮০০০ টাকা দিয়েছিলেন আমার মাকে দেবার জন্য। সে টাকারও বারটা বেজেছে মনে হচ্ছে। এর বাইরে আমার পরিজনের জন্য অথবা
এমনকি আমার ব্যক্তিগত খরচের জন্যও আর কিছুই খরচ করা হয়নি। আমার খাইখরচের দায়িত্ব নিয়েছেন খেতড়ির রাজা, তারও প্রধান অংশ প্রতিমাসে মঠে চলে যায়। যদি না ব্রহ্মানন্দ তার থেকে কিছু অংশ আমার খুড়ির বিরুদ্ধে মামলায় খরচ করেন। যদি তিনি তা করে থাকেন তা হলে যে কোনো উপায়েই হোক আমি তা পূরণ করে দেব, যদি তা করতে বেঁচে থাকি।” এই চিঠি এখনও বাংলা বাণী ও রচনায় স্থান পায়নি।
