মহাসমুদ্রের অপরপারে সুদূর মার্কিন দেশে বিজয়ী বিবেকানন্দকে আঘাতে অপমানে ক্ষতবিক্ষত করার যে বিরামহীন প্রচেষ্টা চলেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ মার্কিন গবেষিকা মেরি লুইস বার্ক তার ছ’খণ্ডের ইংরিজি বইতে রেখে গিয়েছে। এমন ধৈর্যময় গবেষণার জন্য এই মার্কিনী লেখিকা আমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে শ্রদ্ধার আসনটি দখল করে নিয়েছেন। গুরু অশোকানন্দের নির্দেশে এই গবেষিকা ১৯৪৪ সাল থেকে কয়েক যুগ ধরে স্বামীজি সম্বন্ধে নানা অজানা তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের বিস্ময়ের পাত্রী হয়েছেন।
সুদূর মার্কিন মুলুকে স্বামী বিবেকানন্দ যেমন বহুজনের হৃদয়েশ্বর হয়ে উঠেছিলেন, তেমন একই সঙ্গে প্রবাসের পরিবেশে কপর্দকশূন্য সন্ন্যাসীর ভাগ্যে জুটেছে নানা ধরনের অত্যাচার ও অপমান। কখনও তিনি বিচিত্র বেশবাসের জন্য পথচারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, কখনও বিতাড়িত হয়েছেন চুলছাটার সেলুন থেকে, কখনও পয়সা দিয়েও প্রবেশ করতে পারেন নি রাতের আশ্রয়স্থল কোনো হোটেলে। এই সেই সন্ন্যাসী যাঁর সম্বন্ধে মেরি লুইস বার্ক আবিষ্কার করেছেন রেল ইয়ার্ডে ওয়াগনে শুয়ে থাকার কথা।
মেরি লুইস বার্ক পাঁচহাজার পাতা ধরে মার্কিনদেশের সংবাদপত্র এবং সমসাময়িক ব্যক্তিদের যে স্মৃতিকাহিনি বিপুল নিষ্ঠার সঙ্গে পুনরুদ্ধার করেছেন এই নিবন্ধে তার প্রতি সুবিচার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মহাসমুদ্রকে হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশিতে সংক্ষেপিত করার প্রচেষ্টার কোনো অর্থ হয় না। আমরা বরং প্রথমে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার উদ্দেশ্যে খোদ বিবেকানন্দর মার্কিনদেশ থেকে লেখা কিছু চিঠিপত্রের ওপর নির্ভর করি।
২৮ ডিসেম্বর ১৮৯৩, হেল পরিবারের ডিয়ারবর্ন এভিনিউ, চিকাগো থেকে হরিপদ মিত্রকে লেখা স্বামীজির চিঠি: “আমি এদেশে এসেছি, দেশ দেখতে নয়, তামাসা দেখতেনয়,নাম করতেনয়, এই দরিদ্রের জন্য উপায় দেখতে। সে উপায় কি, পরে জানতে পারবে, যদি ভগবান্ সহায় হন।” ২৪ জানুয়ারি ১৮৯৪, একই ঠিকানা থেকে স্বামীজি খবরের কাগজের অংশ কেটে পাঠাচ্ছেন মাদ্ৰাজী ভক্তদের কাছে। “কাগজটার অতিরিক্ত গোঁড়ামি ও আমাকে গালাগালি দিয়া একটা নাম জাহির করিবার চেষ্টা সত্ত্বেও উহাদের স্বীকার করিতে হইয়াছিল যে আমি সর্বসাধারণের প্রিয় বক্তা ছিলাম।”
১৮ মার্চ ১৮৯৪ ডেট্রয়েট থেকে মিস মেরী হেলকে লেখা চিঠি :পত্রে গুরুভাইরা কলকাতা থেকে লিখেছেন, : “ম–কলকাতায় ফিরে গিয়ে রটাচ্ছে যে বিবেকানন্দ আমেরিকায় সব রকমের পাপ কাজ করছে।…এই তো তোমাদের আমেরিকার অপূর্ব আধ্যাত্মিক পুরুষ।’ ‘ম—’ বেচারীর এতোদূর অধঃপতনে আমি বিশেষ দুঃখিত। ভগবান ভদ্রলোককে ক্ষমা করুন।” বলাবাহুল্য এই ‘ম’ প্রতাপচন্দ্র মজুমদার ছাড়া আর কেউ নন।
পরের দিন ১৯ মার্চ চিকাগো ডিয়ারবর্ন এভিনিউ থেকে শশীমহারাজকে কলকাতায় লেখা চিঠি : “বড় ভয় ছিল যে, আমার নাক কান খসে যাবে, কিন্তু আজিও কিছু হয় নাই। তবে রাশীকৃত গরমকাপড়, তার উপর সলোম চামড়ার কোট, জুতো, জুতোর উপর পশমের জুতো ইত্যাদি আবৃত হয়ে বাইরে যেতে হয়।…প্রভুর ইচ্ছায় মজুমদার মশায়ের সঙ্গে এখানে দেখা। প্রথমে বড়ই প্রীতি, পরে যখন চিকাগোসুদ্ধ নরনারী আমার উপর ভেঙে পড়তে লাগলো তখন মজুমদার ভায়ার মনে আগুন জ্বলল!…দাদা আমি দেখেশুনে অবাক! বল বাবা, আমি কি তোর অন্নে ব্যাঘাত করেছি? তোর খাতির তো যথেষ্ট এদেশে, তবে আমার মতো তোমাদের হ’ল না, তা আমার কি দোষ?…আর মজুমদার পার্লামেন্ট অব রিলিজিয়নের পাদ্রীদের কাছে আমার যথেষ্ট নিন্দা করে, ও কেউ নয়, ঠক জোচ্চোর; ও তোমাদের দেশে এসে বলে–আমি ফকির ইত্যাদি বলে তাদের মন আমার উপর যথেষ্ট বিগড়ে দিলে। ব্যারোজ প্রেসিডেন্টকে এমনি বিগড়ালে যে, সে আমার সঙ্গে ভাল করে কথা কয় না। তাদের পুস্তকে প্যালেটে যথাসাধ্য আমায় দাবাবার চেষ্টা; কিন্তু গুরু সহায় বাবা! মজুমদার কি বলে? সমস্ত আমেরিকান যে আমায় ভালবাসে, ভক্তি করে, টাকা দেয়, গুরুর মত মানে–মজুমদার করবে কি?…দাদা মজুমদারকে দেখে আমার আকেল এসে গেল।..ভায়া, সৰ যায়, ওই পোড়া হিংসেটা যায় না। আমাদের ভিতরও খুব আছে। আমাদের জাতের ঐটে দোষ, খালি পরনিন্দা আর পরশ্রীকাতরতা। হামবড়া, আর কেউ বড় হবে না।”
৯ এপ্রিল ১৮৯৪ নিউ ইয়র্ক থেকে প্রিয় আলাসিঙ্গা পেরুমলকে স্বামী বিবেকানন্দ : “গোঁড়াপাদ্রীরা আমার বিপক্ষে, আর তারা আমার সঙ্গে সোজা রাস্তায় সহজে পেরে উঠবেন না দেখে আমাকে গালমন্দ নিন্দাবাদ করতে আরম্ভ করেছেন, আর ‘ম–’ বাবু তাদের সাহায্য করছেন। তিনি নিশ্চয় হিংসেয় পাগল হয়ে গেছেন। তিনি তাদের বলছেন, আমি একটা ভয়ানক জোচ্চোর ও বদমাশ, আবার কলকাতায় গিয়ে সেখানকার লোকদের বলছেন, আমি ঘোর পাপে মগ্ন, বিশেষত আমি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছি!!! প্রভু তাকে আশীর্বাদ করুন।”
মে, ১৮৯৪, ১৭ বীকন স্ট্রিট, বস্টন থেকে অধ্যাপক রাইটকে স্বামী বিবেকানন্দ : “হে সহৃদয় বন্ধু, সর্বপ্রকারে আপনার সন্তোষ বিধান করতে ন্যায়ত আমি বাধ্য। আর বাকি পৃথিবীতে তাদের বাতচিতকে আমি গ্রাহ্য করি না। আত্মসমর্থন সন্ন্যাসীর কাজ নয়। আপনার কাছে তাই আমার প্রার্থনা…বুড়ো মিশনারীগুলোর আক্রমণকে আমি গ্রাহ্যের মধ্যে আনি না। কিন্তু আমি দারুণ আঘাত পেয়েছি মজুমদারের ঈর্ষার জ্বালা দেখে। প্রার্থনা করি, তার যেন চৈতন্য হয়।…সাধু ও পবিত্র হবার যত চেষ্টাই কেউ করুক না কেন, মানুষ যতক্ষণ এই পৃথিবীতে আছে, তার স্বভাব কিছু পরিমাণে নিম্নগামী হবেই।”
