নিন্দা সম্পর্কে স্বামীজির সুচিন্তিত নীতি কি তা তিনি নিজেই আলাসিঙ্গা পেরুমলকে লেখা এক চিঠিতে (২৭ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪) বিশ্লেষণ করেছেন।
“আমার বন্ধুগণকে বলবে যারা আমার নিন্দাবাদ করছেন, তাঁদের জন্য আমার একমাত্র উত্তর–একদম চুপ থাকা। আমি তাদের ঢিলটি খেয়ে যদি তাদের পাটকেল মারতে যাই, তবে তো আমি তাদের সঙ্গে একদরের হয়ে পড়লুম। তাদের বলবে–সত্য নিজের প্রতিষ্ঠা নিজেই করবে, আমার জন্যে তাদের কারও সঙ্গে বিরোধ করতে হবে না। আমার বন্ধুদের এখনও ঢের শিখতে হবে, তারা তো এখনও শিশুতুল্য।..সাধারণের সঙ্গে জড়িত এই বাজে জীবনে এবং খবরের কাগজের হুজুগে আমি একেবারে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি। এখন প্রাণের ভেতর আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে হিমালয়ের সেই শান্তিময় ক্রোড়ে ফিরে যাই।” . নিন্দায় অবিচলিত থাকার কঠিন সংকল্প গ্রহণ করলেও স্বামীজি একটি বিষয়ে বিচলিত, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার যে চারিত্রিক নিন্দা ছড়াচ্ছেন তা তার মায়ের কাছে পৌঁছলে কি হবে?
এই সময়ে বিদেশ থেকে স্বামীজির একটি করুণ চিঠি : “আমার বুড়ি মা এখনও বেঁচে আছেন, সারাজীবন তিনি অসীম কষ্ট পেয়েছেন, সেসব সত্ত্বেও মানুষ আর ভগবানের সেবায় আমাকে উৎসর্গ করার বেদনা তিনি সহ্য করেছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে ভালবাসা যে ছেলেটিকে তিনি দান করেছেন, সে দূরদেশে গিয়ে–কলকাতার মজুমদার যেমন রটাচ্ছে–জঘন্য নোংরা জীবনযাপন করছে, এ সংবাদ তাকে একেবারে শেষ করে দেবে।”
চরিত্রহননের অপচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে শিকাগো থেকে অধ্যাপক রাইটকে (২৪মে ১৮৯৪) স্বামীজি একটা গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লেখেন।
“আমি যে যথার্থই সন্ন্যাসী, এ-বিষয়ে সর্বপ্রকারে আপনাকে আশ্বস্ত করতে আমি দায়বদ্ধ। কিন্তু সে কেবল আপনাকেই। বাকি নিকৃষ্ট লোকরা কি বলে না বলে, আমি তার পরোয়া করি না। ‘কেউ তোমাকে বলবে সাধু, কেউ বলবে চণ্ডাল, কেউ বলবে উন্মাদ, কেউ বলবে দানব, কোনদিকে না তাকিয়ে নিজের পথ চলে যাও’–এই কথা বলেছিলেন বার্ধক্যে সন্ন্যাসগ্রহণকারী রাজা ভর্তৃহরি–ভারতের একজন প্রাচীন সম্রাট ও মহান সন্ন্যাসী।”
শিকাগোর অভাবনীয় সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে মজুমদার সম্বন্ধে পাঠকের মনে যেসব কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক তার কিছুটা ভ্রাতা মহেন্দ্র নাথ দত্তের জবানিতে বলে রাখা যায়।
প্রতাপ মজুমদার কলকাতায় কেশবচন্দ্র সেনের সমাজে ও রামকৃষ্ণদেবের কাছে এসেছিলেন, তাকে চিনতেন। তার ধারণা ছিল যে স্বামীজি একটা কলকাতার গাইয়ে, ভেঁপো ছোঁড়া, পরে সন্ন্যাসী হইয়াছে, পথে-পথে ঘুরিয়া বেড়ায় ও ভিক্ষা করিয়া খায়। লেখাপড়া বা ভদ্র আচার ব্যবহার কিছুই জানে না, মোটকথা একটি ভ্যাগাবন্ড ছোঁড়া।”
মহেন্দ্রনাথ লিখছেন, আমেরিকায় ধর্মসভায় এসে প্রতাপচন্দ্রের “আর্থিক অবস্থা তখন তত সচ্ছল ছিল না, তাহার উপর তিনি বৃদ্ধও হইয়াছিলেন। এই সময় এক বিশ্ববিদ্যালয় হিন্দুধর্মের উপর বক্তৃতা দিবার জন্য স্বামীজিকে নির্বাচন করেন। যে চারটি বক্তৃতা দিতে হইবে, প্রত্যেক বক্তৃতার জন্য ১০০০ টাকা সম্মানমূল্যে। স্বামীজি অর্থ লইবেন না এইজন্যে নিজে এই বক্তৃতার ভার গ্রহণ না করিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার মহাশয়ের নাম উল্লেখ করিয়া দেন। প্রতাপচন্দ্র সেই চারটি বক্তৃতা দিয়া চারি হাজার টাকা পাইয়াছিলেন।”
ফল উল্টো হল, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার শুরু করলেন কুৎসা–”ছোঁড়াটা রাস্তায় ভিক্ষে করে খায়, পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, বোধ হয় কোন বিপদে পড়ে এখানে পালিয়ে এসেছে।”
প্রতাপের নিন্দা সম্বন্ধে স্বামীজি তখনও নিশ্চিন্ত–”করুকগে, আমরা রামকৃষ্ণের তনয়। করিয়াই কি করিবে? মহাশক্তির প্রভাবে তৃণবৎ সব উড়িয়া যাইবে।”
প্রবাসে গোঁড়া পাদ্রিদের বিরুদ্ধাচরণ সম্বন্ধেও স্বামীজির একই নীতি। কত কুৎসা তখনকার খবরের কাগজে প্রচার হল। স্বামীজি তার এক শিষ্যকে বলেছিলেন, “আমি কিন্তু কিছু গ্রাহ্য করতুম না।
সন্দেহ এবং বিরুদ্ধাচরণ শুধু বাইরে থেকে নয়, ঘরেও। আমেরিকায় যাবার ব্যাপারটা গোপন রাখবার জন্য স্বামীজি বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল ও স্বামী সারদানন্দকে অনুরোধ করেছিলেন।
এর কারণ নিয়ে যথেষ্ট জলঘোলা হয়েছে। “কেহ কেহ প্রশ্ন তুলিলেন যে সেখানে ইংরাজিতে কথা কহিতে হয় ও ইংরাজিতে বক্তৃতা দিতে হয়, স্বামীজি তো এ সব কিছু জানেন না, তবে যাইয়া কি করিবেন। কেহ কেহ আপত্তি তুলিলেন যে সেখানে অপরের সহিত আহার করিতে হইবে, সাধু বা হিন্দুর পক্ষে কি করিয়া সম্ভব? কেহ কেহ বলিল, হিন্দুর পক্ষে সমুদ্রযাত্রা তত নিষেধ তবে স্বামীজি কি করিয়া যাইতে পারেন? একজনের এক ভীষণ আপত্তি উঠিল এবং তিনি মীমাংসা করিতে না পারিয়া ক্রমে ক্রমে জিজ্ঞাসা করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, আমেরিকা ঠাণ্ডা দেশ, সাহেবদের দেশ, সেখানে ইজের পরিতে হয়, স্বামীজি গেরুয়া পরেন, তিনি কি করিয়া ইজের পরিবেন এবং গেরুয়া কাপড় পরিত্যাগ করিয়া অন্য রঙের কাপড় কি করিয়া পরিবেন?…তখনকার কলিকাতার সমাজে এই সকল কথা অতি ভীষণ বলিয়া বোধ হইতেছিল।”
ঘরের ভিতরের কিছু কিছু খবর মহেন্দ্রনাথ ইত্যাদি কয়েকজনের স্মৃতিচারণে ধরা পড়েছে। “স্বামীজির চিকাগোর সংবাদ প্রকাশে আলমবাজার মঠে মহাগণ্ডগোল উঠিল। বলরামবাবুর (বসু) বাড়িতে সন্ধ্যার সময় যখন বক্তৃতাটি একজন পড়িতে লাগিলেন এবং অপর সকলে বসিয়া শুনিতে লাগিলেন, তখন জনকয়েক ব্যক্তি বিশেষত তাহার ভিতর একজন হস্ত প্রসারণ করিয়া নানা ভাব-ভঙ্গি করিয়া অতি বিদ্রূপ করিতে লাগিলেন। নানারকম করিয়া মাথা ঘুরাইয়া বক্তৃতা হইতে একটু একটু উদ্ধৃত করিয়া অবজ্ঞা করিয়া নানাপ্রকার ব্যঙ্গ ও কুৎসা করিতে লাগিলেন।”
