*
পরমহংসের কৃপাধন্য হলেই যে সংসারের সমালোচকরা তাদের নির্মম সমালোচনা বন্ধ করে দেবেন একথা ভাববার কোনো অবকাশ নরেন্দ্রনাথ বা বিবেকানন্দর জীবনে নেই। কাশীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণের দেহাবসানের পর বরাহনগরের এক ভাঙা বাড়িতে রামকৃষ্ণ-শিষ্যদের মধ্যে যে অধ্যাত্মসাধনার সূচনা হয়েছিল একালের ইতিহাসে তা যে অভূতপূর্ব তা পরবর্তীযুগে উচ্চকণ্ঠে স্বীকৃত হলেও, সমকালীন বিড়ম্বনার হাত থেকে মুক্ত হতে পারেননি নরেন্দ্রনাথ, যিনি বিবিদিষানন্দ নামে সন্ন্যাসপথের প্রথম যাত্রা শুরু করেছিলেন।
বরাহনগর পর্বের তরুণ সংসারত্যাগীদের সুকঠোর জীবনযাত্রা মনকে অবশ্যই নাড়া দেয়, মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্যও মনে হয়। নরেন্দ্রনাথ তখন “অতি কঠোর তপস্যা করিতেছেন,… কি ত্যাগ, কি বৈরাগ্য! কি জপ-ধ্যান, কি অধ্যয়ন, কি তেজস্বী বাণী আর গুরুভাইদের প্রতি কি ভালবাসা!”
রামকৃষ্ণের ত্যাগী সন্তানদের মধ্যে তখন জ্বলন্ত বৈরাগ্য। কিন্তু সাধারণ লোকেরা তখন প্রকাশে কি বলে বেড়াচ্ছেন তার কিছু নমুনা স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত আমাদের জন্যে রেখে গিয়েছেন।”সাধারণের ভিতরে কথা উঠিল নরেনটা পাগল হয়ে গেছে, তার মাথাটা বিগড়ে গেছে। কি বকে তার মাথামুণ্ড নাই, আবার বলে বেদান্ত অদ্বৈতবাদ…আমরা তো কোনকালে এসব কথা শুনি নাই বাপু, আর শিখেছেন কতকগুলো বচনের ঝুড়ি। কাজকর্ম করবার নাম নেই, চাকরিবাকরি করবার নামগন্ধ মুখে নেই। এর বাড়ি, ওর বাড়ি পেট ঠেসে আসে, আর কাজের মধ্যে কতকগুলো ছোঁড়া বকিয়েছে। সেগুলোকে নিয়ে কিরকম করছে সব–একটা কৰ্মনাশার দল করেছে।”
শুধু অচেনা মহলে নয়, ভক্তপরিমণ্ডলে নরেন সম্বন্ধে মন্তব্য, তিনি নাকি শ্রীরামকৃষ্ণকেই মানতেননা। প্রসঙ্গত বলে রাখা যাক, শ্রীরামকৃষ্ণেরও একটা ব্যঙ্গনাম জুটেছিল। পরমহংস না বলে টিটকিরি দেওয়া হত ‘গ্রেটগু’ বলে।
নরেন সম্বন্ধে গরম গুজব, তিনি রামকৃষ্ণের মুখের ওপর তর্ক করতেন, বড় হামবড়াইয়ের ভাব। পরিব্রাজক জীবনের শুরুর পরেও এইসব বিড়ম্বনার অবসানের কোনো লক্ষণ ছিল না।
লোকে বলছে, “নরেন এখন আবার গুরুগিরি ধরেছে, সে পশ্চিমে গিয়ে চেলা করছে সন্ন্যাসী করছে। ঠাকুর কি তাকে গুরুগিরি করতে বলেছিলেন? তখন তাঁকেই মানতো না, তার মুখের ওপর তর্ক করত। এখন তো দেখছি স্বয়ং গুরু হয়ে আর একটা দল পাকাচ্ছে।” এই হচ্ছে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম মঠ বরানগর সম্বন্ধে সমকালের মন্তব্য!
এই সময়ে নরেন্দ্রনাথের মানসিক ও শারীরিক কষ্ট দুর্বিষহ পর্যায়ে উপস্থিত হয়েছে। লোকেরা যখন উপহাস করছে, নরেন পাগলা হয়ে গেছে, কি বলে, কি কয়, কথার মাথামুণ্ডু নেই, তখন বরানগরে নরেন্দ্রনাথের জীবনে মহাকষ্ট–”অনাহার, অনিদ্রা, সকলেই বিবস্ত্র, বিকট, মলিন, পাংশুগুণ্ঠিত এবং রাত্রে শয়ন ধরণীতলে। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন অন্নাভাবে কাতর ও নিরাশ্রয়। জ্ঞাতিদের সঙ্গে মামলা মোকদ্দমা।”
মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার জনৈক বন্ধুর সেই সময়কার একটি উক্তি ভাবীকালকে উপহার দিয়েছেন : “তাইত হে, নরেন্দ্রনাথ পাগল হয়ে বেরিয়ে গেল। এমন গানটা মাটি করে গেল; এত বছর গানটা শিখে গলা সেধে সব মাঠে মারা গেল।”
গায়ে ধুলো কাদা মাখা, বড় বড় নখ, মাথায় ঝাঁকড়া আঁকড়া উড়ি খুড়ি চুল, তাতে কত ধুলো কাদা রয়েছে, কোনো হুঁশ নেই, কোনো লক্ষ্য নেই, এই হচ্ছে তখনকার নরেন্দ্রনাথের পরিচিতমহলের ভাবমূর্তি।
শুধু মুখের নিন্দা এবং কুৎসা নয়, আমরা এখন ভালভাবেই জানি যে নরেন্দ্রনাথকে বরাহনগরে খুন করার চেষ্টাও হয়েছিল। বরাহনগরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং অনাহারে নরেন্দ্রনাথ প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন।
১৮৮৭ সালে গ্রীষ্মের প্রারম্ভে নরেনের টাইফয়েড এমনই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে জননী ভূবনেশ্বরী তার এক ছেলেকে নিয়ে বরাহনগরের ভাড়াটে বাড়িতে ছুটে এলেন। বড্ড গায়ের জ্বালা, একসময় গুরুভাই স্বামী প্রেমানন্দ নাড়ির গতি খারাপ দেখে কেঁদে উঠলেন। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে নরেন্দ্রনাথ বললেন, “কাদিসনি, আমি এখন মরব না, তুই ভয় করিসনি। আমাকে ঢের কাজ করতে হবে, আমি কাজগুলো যেন চোখে দেখতে পাচ্ছি, আমার মরবার সময় নেই।”
কিন্তু রোগ ছাড়াও মৃত্যু তখন অন্যপথে তার অভীষ্ট সিদ্ধ করার চেষ্টায় রয়েছে। সেদিন ছিল রবিবার। সকাল দশটা-সাড়ে দশটার দু’জন ভাড়া করা গুণ্ডা নিয়ে একজন লোক বরাহনগরের মঠে ঢুকলো। তার এক আত্মীয় বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তার সন্দেহ নরেন দত্ত আত্মীয়টিকে ছাড়পত্তর দিয়েছে। আগন্তুকটি বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গালমন্দ করছে। লাঠিখেলায় বিশেষ পারদর্শী নিরঞ্জন মহারাজ সেদিন বাধা না দিলে অসুস্থ নরেন্দ্রনাথের কি হত কে জানে। নিরঞ্জন মহারাজের পূর্বাশ্রমের নাম নিত্যনিরঞ্জন ঘোষ।
শুধু প্রাণের আশঙ্কা নয়, মহেন্দ্রনাথ দত্ত বরাহনগর মঠের সন্ন্যাসীদের অন্য প্রলোভনের একটি মনোগ্রাহী ছবি উপহার দিয়েছে। “খ্রীষ্টধর্ম প্রচারকরা খবর পেল যে বরাহনগরে কতকগুলি যুবক একটি বাড়িতে থাকে, বিবাহ করে নাই এবং বেশ ঈশ্বরানুরাগী।” যুবক সন্ন্যাসীদের নিজধর্মে টানবার জন্য প্রচারকরা স্পষ্টাস্পষ্টি বলতে লাগলো অনেক যুবতী মেম এসেছে, তাহাদের সহিত বিবাহ করাইয়া দিব, তোমরা খৃষ্টান হও, রাগে অগ্নিশর্মা তরুণ সন্ন্যাসীগণ তাদের প্রতি এতই বিরক্তি প্রকাশ করলেন যে বরাহনগর বাজারে প্রচারকরা যে আজ্ঞাটি খুলেছিল তা বন্ধ হয়ে গেল।
