অতি মূল্যবান দ্বিতীয় উপদেশটি এসেছিল গর্ভধারিণী জননী ভূবনেশ্বরী দেবীর কাছ থেকে। প্রিয় নরেন্দ্রনাথকে তিনি বলেছিলেন, “খুব শান্ত হবে, কিন্তু আবশ্যক হলে হৃদয় দৃঢ় করবে।” জননী ভূবনেশ্বরী সেই সঙ্গে আরও মারাত্মক কথা বলেছিলেন, “আজীবন পবিত্র থাকবে, নিজের মর্যাদা রক্ষা করবে এবং কখনও অপরের মর্যাদা লঙ্ঘন করবে না।” মায়ের এই নির্দেশ যে তিনি কোনো অবস্থাতেই অমান্য করতে রাজি ছিলেন না তার নানা প্রমাণও বিড়ম্বিত বিবেকানন্দর জীবনে খুঁজে পেতে পারেন যে কেউ।
আজীবন বিড়ম্বিত হওয়ার যে দুঃখ তার শুরু নরেনের স্কুলজীবনে। এই স্কুলটি যে বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত সুকিয়া স্ট্রিটের মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন তা আজ কারও অজানা নয়। এই ইস্কুলের শিক্ষক পড়াচ্ছিলেন ভূগোল, তার হঠাৎ ধারণা হল নরেন ভুল করেছে, অতএব অবিলম্বে দৈহিক শাস্তি দিলেন। নরেন বারবার বলতে থাকেন, আমার ভুল হয়নি, আমি ঠিকই বলেছি, তাতে শিক্ষকের ক্রোধ গেল আরও বেড়ে, তিনি বালক নরেন্দ্রকে নির্দয়ভাবে বেত্রাঘাত শুরু করলেন।
“জর্জরিত দেহে নরেন্দ্রনাথ গৃহে ফিরিয়া অশ্রুলোচনে মাতার নিকট এই ঘটনা বিবৃত করিলে স্নেহময়ী ভূবনেশ্বরী…বিগলিতকণ্ঠে বলিলেন, বাছা যদি ভুল না হয়ে থাকে, তবে এতে কি আসে যায়? ফল যাই হোক না কেন, সর্বদা যা সত্য বলে মনে করবে, তাই করে যাবে। অনেক সময় হয়তো এর জন্য অন্যায় বা অপ্রীতিকর ফল সহ্য করতে হবে, কিন্তু সত্য কখনো ছাড়বে না।”
শোনা যায় এই শিক্ষক পরে অনুতপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু শুনুন একই স্কুলের আরেক মাস্টারের কথা। এই রাগী শিক্ষক একজন ছাত্রকে মারতে মারতে হঠাৎ নরেনের ওপর চটে উঠলেন এবং তাকেও প্রহার করতে লাগলেন। শিক্ষক ক্রমশই প্রহারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে দু হাতে কান মলতে লাগলেন, পরে কান ধরে উঁচু করে তাঁকে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। মেজ ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তর মূল্যবান স্মৃতি অনুযায়ী : “মাস্টার এত জোরে কান ধরিয়া টানিয়াছিল যে শিশুর কান ছিঁড়িয়া গিয়াছিল এবং রক্তে চাপকান ইজের ভিজিয়া গিয়াছিল।…নরেন্দ্রনাথ বাড়িতে ফিরিয়া আসিলে খুব একটা হৈ চৈ পড়িল। বিশ্বনাথ দত্ত ও তারকনাথ (কাকা) মাস্টারকে উকিলের চিঠি দিয়া আদালতে আনিয়া শাস্তি দিবেন…এই রূপ স্থির করিলেন। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ নিজে মধ্যস্থ হইয়া নালিশ মকদ্দমা রহিত করিল এবং পরদিন যথাসময়ে স্কুলে যাইল। এই শাস্তির কথা বিদ্যাসাগরের কানে গেলে তিনি ছেলেদের মারিবার প্রথা উঠাইয়া দিলেন।
নিজের বেলায় কোনো লড়াইয়ে না নামলেও, ভাই মহেন্দ্রনাথ একবার স্কুলে অকারণে শাস্তি পাওয়ায় নরেন্দ্রনাথ কিন্তু জ্বলে উঠেছিলেন। মহেন্দ্রনাথের কথায় : “প্রকৃতপক্ষে আমি কোন দোষ করি নাই বা দোষের কারণ জানিতাম না। বাড়িতে আসিয়া এই বিষয়ে বলায় নরেন্দ্রনাথ তখনই সুপারিন্টেন্ডেন্ট শ্রী ব্রজনাথ দে মহাশয়কে শিক্ষকের বিরুদ্ধে চিঠি লিখিয়া দিয়াছিলেন, ফলে নূতন শিক্ষকটির চাকুরি হইতে জবাব হইয়া গিয়াছিল।”
ইস্কুলে শুধু ছাত্র হিসেবে নয়, পরবর্তী জীবনে শিক্ষক হিসেবেও আমাদের বিবেকানন্দ যে চূড়ান্ত অপমানের মুখোমুখি হয়েছিলেন তার কথা এখনই সেরে নেওয়া যাক।
বিশ্বনাথের আকস্মিক মৃত্যুর পরে পিতার ডুবন্ত সংসারকে রক্ষা করার জন্য নরেন্দ্রনাথ অফিস পাড়ায় চাকরি খুঁজছেন হন্যে হয়ে। সেকালের কলকাতাতেও সাধারণ চাকরির কী শোচনীয় অবস্থা তার একটি প্রমাণ উমেদার নরেন্দ্রনাথের ব্যর্থ কর্মর্সন্ধান। কত অফিসে কতবার তিনি আবেদনপত্র হাতে নিয়ে বিফল হয়ে ফিরে এসেছেন, সামান্য একজন কেরানির কাজের যোগ্যতাও যে নিয়োগকর্তারা তার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন না তা ভাবলে আমাদের নিজের কালের দুঃসহ বেকার সমস্যাকে বুঝতে কষ্ট হয় না।
অবশেষে ১৮৮৪ সালের কোনো সময়ে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের রচয়িতা হেডমাস্টার শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্তর চেষ্টায় সুকিয়া স্ট্রিটের মেট্রোপলিটান ইস্কুলের মেন ব্রাঞ্চে নরেন্দ্রনাথের কাজ জোটে কয়েকমাসের জন্যে। পরে (জুন ১৮৮৬) চাঁপাতলায় সিদ্ধেশ্বর চন্দ্র লেনে ইস্কুলের নতুন শাখা খোলার পরে তাঁকে সেখানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হল।
শুনুন পরের ঘটনা স্বামী গম্ভীরানন্দের লেখা থেকে : “তিনি ঐ কার্যে মাত্র একমাস ছিলেন, কারণ শ্ৰীম-দর্শনের মতে ঐ বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি ছিলেন বিদ্যাসাগরের জামাতা। তিনি চাহিতেন যে হেডমাস্টার তাহার কথামতো চলেন। কিন্তু নরেন্দ্রনাথের প্রকৃতি ছিল অন্যরূপ।”
সুতরাং উচ্চতম দুই শ্রেণীর ছাত্রদের দ্বারা বিদ্যাসাগরের নিকট লিখিত অভিযোগ গেলনতুন হেডমাস্টার পড়াতে পারেন না। তখন বিদ্যাসাগর বললেন, তাহলে নরেন্দ্রনাথকে বললা–আর না আসে।”
শ্ৰীম-দর্শন থেকেই শুনুন : “ফার্স্ট ও সেকেন্ড ক্লাশের ছেলেরা লিখল তিনি ভাল পড়াতে পারেন না। বিদ্যেসাগরমশায় আমাকে (শ্রীমকে) বললেন, তাহলে নরেন্দ্রকে বলো আর না আসে। দরকার হবে না। এই কথা শুনে আমাদের মাথা ঘুরে গেল।”
বিবরণ পড়ে আজও সারা বিশ্বে পাঠকের মাথা ঘোরে, বিশ্বসংসারকে শিক্ষা দেবার জন্য যাঁর অবিস্মরণীয় আবির্ভাব তিনি তাঁর ছাত্রদের এবং স্কুলের মালিকদের হাতে নিগৃহীত হলেন চরমতম অভিযোগে মানবজাতির শিক্ষক বিবেকানন্দ রূপে যিনি কিছুদিনের মধ্যে সারা বিশ্বের বিস্ময় হতে চলেছেন তিনি চাপাতলা স্কুলে শিক্ষকতার অযোগ্য!
