একস্থানের ইনি Evolution Theory ব্যাখ্যা করিয়া শেষে বলিতেছেন, “প্রবৃত্তিমার্গের শাসন পালন করিয়া তাহা খণ্ডনপূর্বক যাঁহারা নিবৃত্তি-মার্গে আরোহণ করিয়াছিলেন, বর্তমান ভারত তাহার লুপ্ত পদাঙ্ক পুনরুদ্ধার আর করিতে না পারিয়া অন্তভাগশায়ী অবশিষ্ট চিহ্নগুলিকে একান্তভাবে গ্রহণ করিয়াছে ও তাহাকে কৃপণের ধনের মত আঁকড়িয়া ধরিয়া রহিয়াছে।
তাহার পিছনে যে বিস্তৃত মুখগহ্বর অন্ধকারে মুখ ব্যাদিত করিয়া আছে, তাহাকে সে শুধু অসম্ভব প্রয়াসের দ্বারা আড়াল করিয়া রাখিতে চাহিতেছে, কিন্তু তাহার পায়ের নীচের মাটি তাহার ভারে যে খসিয়া পড়িতেছে, তাহার প্রতি তাহার দৃকপাত নাই।” অর্থাৎ ‘অন্ধকার গহ্বর’ ‘অসম্ভব প্রয়াস’ ‘পায়ের নীচের মাটি খসিয়া পড়া’ কথাগুলো লাগাইতেই হইবে। কেন তাহা বলা বাহুল্য। কিন্তু গোল হইতেছে এই যে, অন্তভাগশায়ী চিহ্নগুলিকে আঁকড়িয়া ধরিয়া থাকিবার মাঝখানে এত বড় গহ্বরটাই বা আসে কি সুবাদে এবং পায়ের নীচের মাটিই বা খসিয়া পড়ে কি হেতু? গহ্বরটা যে শুধু সে বেচারাই দেখিতে পায় নাই, তাহা নহে, আমরাও ত কৈ কোনদিকে চাহিয়া চোখে পড়িতেছে না। আর একস্থানে রাশি রাশি শাস্ত্রের দোষ দিয়া লিখিতেছেন, “জীবনের অবস্থা-ভেদে কর্তব্য ও ধর্মের প্রভেদ ঘটিয়া থাকে। পুরুষের যাহা ধর্ম নারীর ধর্ম তাহা হইতে পারে না। অপরন্তু,—সন্ন্যাসী যদি গৃহীর ধর্ম অবলম্বন করে, তবে সন্ন্যাসী ধর্মভ্রষ্ট হয়, এবং গৃহী যদি সন্ন্যাসীর পন্থানুসরণ করে, তবে গৃহীও ধর্ম হইতে স্খলিত হয়। …লোকসমাজে যখন একটা অনুভূতির স্পন্দনোচ্ছ্রয় ঘটিতে থাকে, বিধানের চাপ দিয়া তাহাকে বিমর্দিত করা যায় না, গর্জিত স্রোত তরঙ্গিণীর মত তাহা পথশায়ী প্রতিবন্ধক বিধ্বস্ত করিয়া পথ উন্মুক্ত করিয়া লইয়া অবতরণ করে। সুতরাং গৃহীদের সন্ন্যাসনুপন্থী হইবার সম্বন্ধে প্রবল শাস্ত্র-প্রতিষেধ থাকা সত্ত্বেও সমাজে তাহার প্রভাব অণুমাত্রও হ্রাস হয় নাই।”
আমার বিনীত নিবেদন এই, ‘সুতরাং’টির অর্থ কি? সমাজের বিলকুল গৃহীগুলা কি গৃহিণী ত্যাগ করিয়া বনে যাইবার সঙ্কল্প করিয়াছে? না, লুকাইয়া গেরুয়া কাপড় ছোবাইতেছিল, ধরা পড়িয়াছে। হইলে ভয়ের কথা নিশ্চয়ই, কিন্তু আমাদের বাড়িতে কাহারও ত ওসব লক্ষণ দেখি না। অন্ততঃ বড়কর্তার সম্বন্ধে আমি ত হলফ করিয়া বলিতে পারি। আজ এই ‘সুতরাং’ শব্দটায় বহুদিনের একটা কথা মনে পড়িতেছে। একবার গাড়ি করিয়া রাত্রে বাড়ি যাইতেছিলাম। পথে ডানদিকের মাঠে চাষারা পাট কাচিয়া শুকাইতে দিয়াছিল। পাছে ভয় পাই, এই আশঙ্কায় আমাদের পঞ্চা চাকর গাড়ির উপর হইতে সাহস দিয়া বলিল, “মা-ঠাকরুন ডানদিকে চেয়ে দেখুন,সুতরাং কেমন পাট শুকোচ্চে !” সেদিন বউমানুষের অত হাসি নিশ্চয়ই ভাল দেখায় নাই, কিন্তু ভাল দেখাইবার উপায় ত আমার হাতে ছিল না।
থাক্—আর না। এখনো অনেক কথা বলিবার ছিল, কিন্তু কাজ নাই। তা ছাড়া, আমরা মেয়েমানুষ হাঁড়ির একটা ভাতই টিপিয়া দেখি। শ্রীমতী আমোদিনী শিক্ষিতা রমণী, আমরা সেকেলে অশিক্ষিতা মূর্খ মেয়েমানুষ। হয়ত, তাঁহাকে ভুল বুঝিয়াছি। কিন্তু ভুল হোক, নির্ভুল হোক, যাহা বুঝিয়াছি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছি। যদি আবশ্যক হয় নিজের লেখা তিনি অনায়াসে সমর্থন করিতে পারিবেন। তবে, একটা কথা বলিয়া রাখি। মেয়েমানুষের নাক ডাকে জানি, কিন্তু এত জোরে ডাকিতে শুনিলে অন্য স্ত্রীলোকেও যেন লজ্জা করিতে থাকে। ভয় হয়, এই বুঝি বা পুরুষমানুষে চমকাইয়া উঠিয়া পড়ে। তাই উৎকণ্ঠায় যদি বা একটু নিষ্ঠুরের মতই ঘুম ভাঙ্গাইবার চেষ্টা করিয়া থাকি, সে চেষ্টার মধ্যে আন্তরিক মঙ্গলেচ্ছা ব্যতীত আর কিছুই নাই। কিন্তু তাঁর ভাষা যে অতি সুন্দর, অতি মধুর, তাহা অকপটে স্বীকার করি। প্রতি ছত্র গভীর পাণ্ডিত্যে পরিপূর্ণ। বহুমূল্য ঘড়ির সুগঠিত কলকবজার ন্যায় তাঁহার প্রত্যেক শব্দবিন্যাসটির আশ্চর্য কৌশল দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি। ঘড়িটি দামী এবং চলিতেছেও। কিন্তু কাঁটা দুটি না থাকায় কবি পোপের মত সময়টা ঠিক ঠাহর করিতে অক্ষম হইয়াছি।
এইবার শ্রীমতী অনুরূপা ও নিরুপমার রচনা সম্বন্ধে দুই-একটা কথা বলিব। যদিও শ্রীমতী অনুরূপার ‘পোষ্যপুত্রে’র গোড়াও পড়ি নাই, শেষও পড়ি নাই, শুধু মধ্যের গুটিকয়েক অধ্যায় মাত্র পড়িবার সুযোগ পাইয়াছি, এবং এত অল্প পুঁজি লইয়া বলিতে যাওয়াও বিপজ্জনক জানি, কিন্তু বুড়ো-মানুষের নাকি বেশি পুঁজির আবশ্যক হয় না, তাই বলিতেছি। ইঁহারও ভাষা যে অতি মধুর তাহাতে সন্দেহ নাই। আমার মেয়ে বলিতেছিল, এত মধুর যে মুখ মারিয়া যায়, আর গিলিতে পারা যায় না। তা’ ভাষা যাহাই হোক, প্রায়ই উপমাগুলিই যে না জানিয়া লেখা তাহা পড়িলেই চোখে ঠেকে। আর একটা জিনিস তার চেয়েও বেশী ঠেকে—সেটা অসহ্য জ্যাঠামো। এ কথা আমার বলিবার ইচ্ছা ছিল না। কেন না, এইখানেই তর্ক বাধে। গ্রন্থকারের তারিফ্কারীরা ধরিয়া বসেন, কোথায় জ্যাঠামো দেখাও। আমি যাহাই দেখাই না কেন, তাঁহারা প্রতিবাদ করিয়া বলিবেন— কখ্খন না। এটা হিউমার, ওটা উইট্, সেটা আর্ট ইত্যাদি।
জ্যাঠামো অন্তরে অনুভব করা যায়, কিন্তু উইট্ কোথায় অশ্লীল হইয়া উঠে, আর্ট কোথায় আতিশয্যে ও ছিবলামিতে রূপান্তরিত হয়, সেটা যে-বয়সে বোঝা যায়, ততটা বয়স এখনও লেখিকার হয় নাই। তবে, আশা করি এ দোষ একদিন শুধরাইবে। কিন্তু, তাঁহার না জানিয়া যা-তা উপমা দিবার স্বপক্ষে সে-রকম কৈফিয়ত কিছু নাই। তাই দৃষ্টান্তের মত দুই-একটা উল্লেখ করিব মাত্র।
