কে, ঘোষ-সাহেব?
আলেখ্য মাথা নাড়িয়া বলিল—না, কমলকিরণ। ঘোষ-সাহেব এবং ইন্দুর মা বোধ হয় পাঁচ-ছ’দিন পরে আসবেন।
পিতা কহিলেন—আচ্ছা।
আলেখ্য কহিল—তাদের অভ্যর্থনার উপযুক্ত কিছুই বন্দোবস্ত করে উঠতে পারিনি।
পারনি? এই পাঁচ-ছ’দিনের মধ্যেও কি হতে পারবে না মনে হয়?
আলেখ্য পূর্বের মত মাথা নাড়িয়া কহিল, সম্ভব নয় বাবা—এই বলিয়া সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে থাকিয়া কহিল, একটা অত্যন্ত বিশ্রী কাণ্ড হয়ে গেছে বাবা, তুমি বোধ হয় শুনেচ? কি দুঃখের বিষয়।
সাহেব বলিলেন, হাঁ।
তাদের সম্বন্ধে কি কোনরকম ব্যবস্থা করলে বাবা?
না, বিশেষ কিছুই করা হয়নি—এই বলিয়া সাহেব নীরব হইলেন। মেয়েকে তিনি কোনদিনই তিরস্কার করেন নাই, বিশেষতঃ সমস্ত মরিয়া-ঝরিয়া গিয়া এই বৃদ্ধ বয়সে সংসারের সর্বপ্রকার বন্ধন যখন এই কন্যাটাতেই স্থিরতা লাভ করিয়াছে, তখন হইতে এই মেয়ের কাছেই আপনাকে তিনি ধীরে ধীরে শিশুর মত করিয়া তুলিয়াছেন। সে-ই তাঁহার সর্ববিষয়ে অভিভাবক। তাহার বিরুদ্ধে বা অমতে কাজ করার শক্তি তাঁহার স্বভাবতই তিরোহিত হইয়াছে।
আলেখ্য কহিল—উপযুক্ত ব্যবস্থা কেন করে এলে না বাবা?
সাহেব বলিলেন—মা, বিষয় তোমার। সমস্ত তোমার হাতে তুলে দিয়ে আমি ছুটি নিয়েছি, এর ভাল-মন্দর ভার তোমার। যা কর্তব্য, তা তুমিই করবে।
আলেখ্য করুণকণ্ঠে কহিল—যদি বুঝতে না পেরে কোন অন্যায় করি বাবা, তবুও কি তুমি তার প্রতিকার করবে না?
পিতা বলিলেন—আমিই কি বড় বুদ্ধিমান? অন্তত: সংসারে সে প্রমাণ ত আজও দিতে পারিনি মা। আর, না বুঝে অন্যায় যদি কিছু করেই থাক, যিনি বুদ্ধি দেবার মালিক, তিনিই তোমাকে তার নিবারণের পথ বলে দেবেন।—এই বলিয়া বৃদ্ধের সজল দৃষ্টি একমুহূর্তে খোলা জানালার বাহিরে গিয়া অকস্মাৎ কোন্ অনির্দেশ্য শূন্যতায় স্থিতিলাভ করিল। পিতার ঠিক এই ভাবটি আলেখ্য পূর্বে কখনও লক্ষ্য করে নাই—সে যেন অবাক হইয়া গেল। ছেলেবেলা হইতে তাঁহাকে সে ষোল-আনা সাহেব বলিয়াই জানে। ধর্মমত লইয়া তিনি আলোচনা করিতেন না, ঈশ্বরে ভক্তি-বিশ্বাস আছে কি নাই, এ কথাও কোনদিন প্রকাশ করিতেন না, এবং করিতেন না বলিয়াই লোকের ঘরে-বাহিরে তাঁহাকে অবিশ্বাসী বলিয়া ধারণা ছিল। অথচ, সাবেক দিনের ক্রিয়া-কর্ম ঠাকুর-দেবতার পূজা-অর্চনা সমস্তই অব্যাহত ছিল। এই জটিল সমস্যার সমাধান করিতে আলেখ্যের জননী ইহাকে ভয় এবং দুর্বলতা বলিয়া অভিহিত করিয়াছিলেন, আলেখ্যের নিজেরও তাহাতে সংশয় ছিল না, কিন্তু বৃদ্ধ পিতার আজ এই অদৃষ্টপূর্ব মুখের চেহারা চক্ষের পলকে যেন তাহাকে আর একটা দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল।
আলেখ্য ধীরে ধীরে বলিল—তুমি বেঁচে থাকতে আমাকে এ-দায়িত্ব দিয়ো না বাবা।
কেন মা?
আমি আদেশ তোমার লঙ্ঘন করেছি।
বৃদ্ধ সবিস্ময়ে কন্যার মুখের প্রতি চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—কি আদেশ আলো? আমার ত কোন আদেশের কথাই মনে পড়ে না মা!
আলেখ্য অধোমুখে অঞ্চলের পাড়টা আঙুলে জড়াইতে জড়াইতে চুপ করিয়া রহিল।
পিতা কহিলেন—কৈ, বললে না যে?
আলেখ্য তথাপি কিছুক্ষণ নীরবে থাকিয়া অভিমানরুদ্ধ-স্বরে আস্তে আস্তে বলিল—তবে এসে পর্যন্ত আমার সঙ্গে তুমি কথা কও না যে বড়? আমি ত এক শ’বার স্বীকার করছি, বাবা, আমি অত্যন্ত অন্যায় কাজ করেছি। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবিনি, আমাকে তিনি এত বড় শাস্তি দিয়ে যাবেন। আমি তোমার কাছেও মুখ দেখাতে পারছি নে বাবা, আমি এদেশে আর থাকবো না।—এই বলিয়া সে ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল।
সাহেব কাছে আসিয়া ধীরে ধীরে মেয়ের মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে লাগিলেন,—কিছুই বলিলেন না। এমনিভাবে কিছুক্ষণ কাটিল, বোধ হয় মিনিট পাঁচ-ছয়ের বেশী নয়, কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যে তাহার দুর্বলচিত্ত বৃদ্ধ পিতার যে পরিচয় আলেখ্যের ভাগ্যে জুটিল, তাহা যেমন অভাবনীয়, তেমনি মধুর। এই বিশ বৎসর বয়েসের মধ্যে ইহার আভাস পর্যন্তও কখনও তাহার চোখে পড়ে নাই। আজ মায়ের জন্য তাহার ক্লেশ বোধ হইতে লাগিল, এত বড় মাধুর্যের কোন আস্বাদই তিনি জীবনে উপভোগ করিয়া যাইতে পারিলেন না। পিতা সমাজে কখনও যান নাই, উপাসনায় কোন দিন যোগ দেন নাই, ভগবৎ-বিশ্বাসহীন নাস্তিক বলিয়া মনে মনে জননীর যেমন ক্ষোভ ছিল, স্বামীর চিত্ত-দৌর্বল্যের জন্যও পরিচিত আত্মীয়বন্ধুজনের সমক্ষেও তাঁহার তেমনি লজ্জার কারণ ছিল। পিতার প্রতি আলেখ্যের স্নেহ ও প্রীতি সংসারে কোনও সন্তানের চেয়েই হয়ত কম ছিল না, কিন্তু পুরুষোচিত শক্তি, সামর্থ্য ও দৃঢ়তার অভাব এই রোগ-জীর্ণ নিরীহ লোকটির বিরুদ্ধে আরোপ করিয়া মায়ের নিকট হইতে একটা করুণ অশ্রদ্ধার ভাবই সে উত্তরাধিকারের মত পাইয়াছিল। সেই পিতাকে অকস্মাৎ আজ সে এক সম্পূর্ণ নূতন দিক হইতে লক্ষ্য করিবার অবকাশ পাইয়া ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় একেবারে বিগলিত হইয়া গেল। এমন করিয়া সে একটা দিনও তাঁহাকে দেখিবার সুযোগ পায় নাই। নানা লোকের নানা উক্তি ও বিভিন্ন মতামত দিয়া এই দিকটাই যেন তাহার চোখের সম্মুখে একেবারে আঁটিয়া বন্ধ করিয়া দেওয়া ছিল। আজ অনুশোচনায় ও আত্মধিক্কারে হৃদয় পূর্ণ করিয়া সে পিতার স্নেহস্পর্শের নীচে নিঃশব্দে বসিয়া ভাবিতে লাগিল, হয়ত পিতা নিজের মত দুর্বল ও শক্তিহীন জানিয়াই তাঁহার বহুদিনের আশ্রিত অতিবৃদ্ধ গাঙ্গুলীকে মনে মনে স্নেহ করিতেন, তাঁহার প্রতি এত বড় কঠিন অবিচার হইয়া গেল, তিনি নিবারণ করিতে পারিলেন না, তাই নীরবে তাঁহার শোকাচ্ছন্ন কন্যা-দৌহিত্রের কাছে গিয়া তেমনি নীরবে কি যে করিয়া আসিলেন, কাহাকেও জানিতে দিলেন না, অথচ এতবড় অন্যায় যাহার দ্বারা অনুষ্ঠিত হইল, তাহাকে একটি ক্ষুদ্র তিরস্কারেও লাঞ্ছিত করিলেন না, দুই বিভিন্ন দিকের সমস্ত ব্যথাই নির্বাক হইয়া নিজের বুক পাতিয়া গ্রহণ করিলেন।
