‘ ঐ যে ঈশানে উড়েছে নিশান ,
বেজেছে বিষাণ বেগে—
আমার বরষা কালো বরষা যে
ছুটে আসে কালো মেঘে । ‘
ওরে নীলজল , অতল অটল
ভরা ছিলি কূলে কূলে ,
হঠাৎ এমন শিহরি শিহরি
উঠিলি কেন রে দুলে ।
তালতরুছায়া করে টলমল—
কেন কলকল , কেন ছলছল—
কী কথা বলিতে হলি চঞ্চল ,
ফুটিতে চাহে না বাক্—
কাঁদিয়া হাসিয়া সাড়া দিতে চাস ,
কার শুনেছিস ডাক ।
‘ ঐ – যে আকাশে পুবের বাতাসে
উতলা উঠেছে জেগে—
আজি মোর বর মোর কালো ঝড়
ছুটে আসে কালো মেঘে । ‘
পরান আমার , রুধিয়া দুয়ার
আপনার গৃহ – মাঝে
ছিলি এতদিন বিশ্রামহীন
কী জানি কত কী কাজে ।
আজিকে হঠাৎ কী হল রে তোর ,
ভেঙে যেতে চায় বুকের পাঁজর ,
অকারণে বহে নয়নের লোর ,
কোথা যেতে চাস ছুটে ।
কে রে সে পাগল ভাঙিল আগল ,
কে দিল দুয়ার টুটে ।
‘ জানি না তো আমি কোথা হতে নামি
কী ঝড়ে আঘাত লেগে
জীবন ভরিয়া মরণ হরিয়া
কে আসিছে কালো মেঘে । ‘
জাগরণ
কৃষ্ণপক্ষে আধখানা চাঁদ
উঠল অনেক রাতে ,
খানিক কালো খানিক আলো
পড়ল আঙিনাতে ।
ওরে আমার নয়ন , আমার
নয়ন নিদ্রাহারা ,
আকাশ – পানে চেয়ে চেয়ে
কত গুনবি তারা ।
সাড়া কারো নাই রে , সবাই
ঘুমায় অকাতরে ।
প্রদীপগুলি নিবে গেল
দুয়ার – দেওয়া ঘরে ।
তুই কেন আজ বেড়াস ফিরি
আলোয় অন্ধকারে ।
তুই কেন আজ দেখিস চেয়ে
বনপথের পারে ।
শব্দ কোথাও শুনতে কি পাস
মাঠে তেপান্তরে ।
মাটি কোথাও উঠছে কেঁপে
ঘোড়ার পদভরে ?
কোথাও ধুলো উড়ছে কি রে
কোনো আকাশ – কোণে ।
আগুনশিখা যায় কি দেখা
দূরের আম্রবনে ।
সন্ধ্যাবেলা তুই কি কারো
লিখন পেয়েছিলি ।
বুকের কাছে লুকিয়ে রেখে
শান্তি হারাইলি ?
নাচে রে তাই রক্ত নাচে
সকল দেহ – মাঝে ,
বাজে রে তাই কী কথা তোর
পাঁজর জুড়ে বাজে ।
আজিকে এই খণ্ড চাঁদের
ক্ষীণ আলোকের’পরে
ব্যাকুল হয়ে অশান্ত প্রাণ
আঘাত করে মরে ।
কী লুকিয়ে আছে ওরে ,
কী রেখেছে ঢেকে—
কিসের কাঁপন কিসের আভাস
পাই যে থেকে থেকে ।
ওরে , কোথাও নাই রে হাওয়া ,
স্তব্ধ বাঁশের শাখা—
বালুতটের পাশে নদী
কালির বর্ণে আঁকা ।
বনের’পরে চেপে আছে
কাহার অভিশাপ—
ধরণীতল মূর্ছা গেছে
লয়ে আপন তাপ ।
ওরে , হেথায় আনন্দ নেই—
পুরানো তোর বাড়ি ,
ভাঙা দুয়ার বাদুড়কে ওই
দিয়েছে পথ ছাড়ি ।
সন্ধ্যা হতে ঘুমিয়ে পড়ে
যে যেথা পায় স্থান—
জাগে না কেউ বীণা হাতে ,
গাহে না কেউ গান ।
হেথা কি তোর দুয়ারে কেউ
পৌঁছোবে আজ রাতে—
এক হাতে তার ধ্বজা তুলে ,
আলো আর – এক হাতে ?
হঠাৎ কিসের চঞ্চলতা
ছুটে আসবে বেগে ,
গ্রামের পথে পাখিরা সব
গেয়ে উঠবে জেগে ।
উঠবে মৃদঙ বেজে বেজে
গর্জি গুরুগুরু ,
অঙ্গে হঠাৎ দেবে কাঁটা ,
বক্ষ দুরুদুরু ।
ওরে নিদ্রাবিহীন আঁখি ,
ওরে শান্তিহারা ,
আঁধার পথে চেয়ে চেয়ে
কার পেয়েছিস সাড়া ।
ঝড়
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ে ,
ঝড় এল রে আজ—
মেঘের ডাকে ডাক মিলিয়ে
বাজ্ রে মৃদঙ বাজ্ ।
আজকে তোরা কী গাবি গান
কোন্ রাগিণীর সুরে ।
কালো আকাশ নীল ছায়াতে
দিল যে বুক পূরে ।
বৃষ্টিধারায় ঝাপসা মাঠে
ডাকছে ধেনুদল ,
তালের তলে শিউরে উঠে
বাঁধের কালো জল ।
পোড়ো বাড়ির ভাঙা ভিতে
ওঠে হাওয়ার হাঁক ,
শূন্য খেতের ও পার যেন
এ পারকে দেয় ডাক ।
আমাকে আজ কে খুঁজেছে
পথের থেকে চেয়ে ।
জলের বিন্দু পড়ছে রে তার
অলক বেয়ে বেয়ে ।
মল্লারেতে মীড় মিলায়ে
বাজে আমার প্রাণ ,
দুয়ার হতে কে ফিরেছে
না গেয়ে তার গান ।
আয় গো তোরা ঘরেতে আয় ,
বোস্ গো তোরা কাছে ।
আজ যে আমার সমস্ত মন
আসন মেলে আছে ।
জলে স্থলে শূন্যে হাওয়ায়
ছুটেছে আজ কী ও ।
ঝড়ের’পরে পরান আমার
উড়ায় উত্তরীয় ।
আসবি তোরা কারা কারা
বৃষ্টিধারার স্রোতে
কোন্ সে পাগল পারাবারের
কোন্ পরপার হতে ।
আসবি তোরা ভিজে বনের
কান্না নিয়ে সাথে ,
আসবি তোরা গন্ধরাজের
গাঁথন নিয়ে হাতে ।
ওরে , আজি বহু দূরের
বহু দিনের পানে
পাঁজর টুটে বেদনা মোর
ছুটেছে কোন্খানে—
ফুরিয়ে – যাওয়ার ছায়াবনে ,
ভুলে – যাওয়ার দেশে ,
সকল – গড়া সকল – ভাঙা
সকল গানের শেষে ।
কাজল মেঘে ঘনিয়ে ওঠে
সজল ব্যাকুলতা ,
এলোমেলো হাওয়ায় ওড়ে
এলোমেলো কথা ।
দুলছে দূরে বনের শাখা ,
বৃষ্টি পড়ে বেগে ,
মেঘের ডাকে কোন্ অশান্ত
উঠিস জেগে জেগে ।
টিকা
আজ পুরবে প্রথম নয়ন মেলিতে
হেরিনু অরুণশিখা— হেরিনু
কমলবরন শিখা ,
তখনি হাসিয়া প্রভাততপন
দিলেম আমারে টিকা— আমার
হৃদয়ে জ্যোতির টিকা ।
কে যেন আমার নয়ননিমেষে
রাখিল পরশমণি ,
যে দিকে তাকাই সোনা করে দেয়
দৃষ্টির পরশনি ।
অন্তর হতে বাহিরে সকলি
আলোকে হইল মিশা ,
নয়ন আমার হৃদয় আমার
কোথাও না পায় দিশা ।
আজ যেমনি নয়ন তুলিয়া চাহিনু
কমলবরন শিখা— আমার
অন্তরে দিল টিকা ।
ভাবিয়াছি মনে দিব না মুছিতে
এ পরশ – রেখা দিব না ঘুচিতে ,
সন্ধ্যার পানে নিয়ে যাব বহি
নবপ্রভাতের লিখা—
উদয়রবির টিকা ।
ত্যাগ
ওগো মা ,
রাজার দুলাল গেল চলি মোর
ঘরের সমুখপথে ,
প্রভাতের আলো ঝলিল তাহার
স্বর্ণশিখর রথে ।
ঘোমটা খসায়ে বাতায়নে থেকে
নিমেষের লাগি নিয়েছি মা দেখে ,
ছিঁড়ি মণিহার ফেলেছি তাহার
পথের ধুলার’পরে ।
মা গো , কী হল তোমার , অবাক নয়নে
চাহিস কিসের তরে !
মোর হার – ছেঁড়া মণি নেয় নি কুড়ায়ে ,
রথের চাকায় গেছে সে গুঁড়ায়ে
চাকার চিহ্ন ঘরের সমুখে
পড়ে আছে শুধু আঁকা ।
আমি কী দিলেম কারে জানে না সে কেউ—
ধুলায় রহিল ঢাকা ।
তবু রাজার দুলাল গেল চলি মোর
ঘরের সমুখপথে—
মোর বক্ষের মণি না ফেলিয়া দিয়া
রহিব বলো কী মতে ।
