“প্রতারক ধূর্ত পণ্ডিতগণ আপনাদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে পরলোক ও স্বর্গ-নরকাদির কল্পনা করিয়া জনসমাজকে বৃথা ভীত এবং অন্ধ করিয়া রাখিয়াছে। বেদ অধ্যয়ন, অগ্নিহোত্র, দণ্ডধারণ, ভস্মলেপন প্রভৃতি বুদ্ধি ও পৌরুষশূন্য ব্যক্তিবৃন্দের উপজীবিকা মাত্র। প্রতারক শাস্ত্ৰকারেরা বলে, যজ্ঞে যে জীবকে বলি প্রদান করা যায়, সেই জীবের স্বর্গলাভ হইয়া থাকে। উত্তম, কিন্তু তবে তাহারা আপন আপন মাতা-পিতাকে বলি প্রদান করিয়া তাহাদিগকে স্বর্গলাভের অধিকারী করে না কেন? তাহা না করিয়া আপনাদের রসনাতৃপ্তির জন্য ছাগাদি অসহায় পশুকে বলি দেয় কেন? এইরূপে মাতা-পিতাকে স্বর্গগামী করাইতে পারিলে তজ্জন্য আর শ্রাদ্ধাদির প্রয়োজন হয় না। শ্রাদ্ধও ধূর্তদিগের কল্পনা। শ্রাদ্ধ করিলে যদি মৃত ব্যক্তির তৃপ্তি হয়, তবে কোনো ব্যক্তি বিদেশে গমন করিলে তাহাকে পাথেয় না দিয়া, তাহার উদ্দেশে বাটীতে কোনো ব্রাহ্মণকে ভোজন করাইলেই তো তাহার তৃপ্তি হইতে পারে। আর প্রাঙ্গণে শ্রাদ্ধ করিলে যখন দ্বিতলোপরিস্থিত ব্যক্তির তৃপ্তি হয় না, তখন শ্রাদ্ধ দ্বারা বহু উচ্চস্থিত স্বর্গবাসীর কিরূপে তৃপ্তি হইবে? সুতরাং স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে যে, শ্রাদ্ধাদিকার্য কেবল অকর্মণ্য ব্রাহ্মণদিগের জীবনোপায় ব্যতীত আর কিছুই নহে। বেদ –ভণ্ড, ধূর্ত ও রাক্ষস –এই ত্রিবিধ লোকের রচিত। স্বর্গ-নরকাদি ধূর্তের কল্পিত, আর পশুবধ ও মাংসাদি নিবেদনের বিধি রাক্ষসপ্রণীত। ‘অশ্বমেধ যজ্ঞে যজমানপত্নী অশ্বশিশ্ন (ঘোড়ার লিঙ্গ) গ্রহণ করিবে’ ইত্যাদি ব্যবস্থা ভণ্ডের রচিত। সুতরাং এই বৃথাকল্পিত শাস্ত্রে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিই বিশ্বাস করিতে পারেন না।
“এই দেহ ভস্মীভূত হইলে তাহার আর পুনরাগমনের সম্ভাবনা নাই। অতএব —
“যাবজ্জীবং সুখং জীবেৎ,
ঋণাং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ।
“অর্থাৎ যতদিন বাঁচিয়া থাকা যায়, ততদিন সুখে কালহরণ করাই কর্তব্য। এই জন্য ঋণ করিয়াও ঘৃতাদি উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাদ্য, ভোজনে পশ্চাদপদ হইবে না। এই শরীর ব্যতীত আর কোনো আত্মা নাই। যদি থাকিত এবং যদি তাহার দেহান্তর গ্রহণের ক্ষমতা থাকিত, তবে সে বন্ধু-স্বজনের স্নেহে বাধ্য হইয়া পুনর্বার ঐ দেহেই প্রবেশ করে না কি জন্য? অতএব দেখা যাইতেছে– বেদ-শাস্ত্ৰ সকলই অপ্রমাণ্য; পরলোক, স্বর্গ, মুক্তি সকলই অবান্তর; অগ্নিহোত্র, ব্রহ্মচর্য, শ্রাদ্ধাদিকর্ম সমস্তই নিষ্ফল।”
পূর্বোক্ত আলোচনায় জানা যায় যে, বৈদিক ঋষিদের পূজা-পার্বন, হোম-যজ্ঞ, শ্রাদ্ধাদি ও স্বর্গ-নরক বিষয়ক অলীক কল্পনার বিরুদ্ধে চার্বাক অভিযান চালাইয়াছিলেন সেই বৈদিক যুগেই। তবে চার্বাকের রোপিত অভিযানবৃক্ষ বিশাল আকার ধারণ করিতে পারে নাই। কিন্তু বৈদিক ধর্মের প্রবল বাত্যায় উহা নির্মূল হইয়াও যায় নাই। বৈদিকরা চার্বাকপন্থীদের বলিতেন ম্লেচ্ছ, যবন, নাস্তিক ইত্যাদি। বস্তুত চার্বাকীয় মতবাদ ছিল অভিজ্ঞতাভিত্তিক, যাহা পরবর্তীকালে আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতবাদ-এর ভিত্তিরূপে স্বীকৃত। বর্তমান জগতের বিশেষত বিজ্ঞান জগতের অনেকেই বাহ্যত না হইলেও কার্যত চার্বাকীয় মতবাদের অনুসারী।
.
# বৈজ্ঞানিক মত
অত্র পুস্তকের ‘প্রলয়’ পরিচ্ছেদে ‘বিজ্ঞানীদের মত’ আলোচনার একস্থানে বলা হইয়াছে, “মহাবিশ্বের যাবতীয় জ্যোতিষ্ক অর্থাৎ সূর্য, নক্ষত্র, নীহারিকা ইত্যাদি সকলই অতিশয় উষ্ণ পদার্থ এবং উহারা সকলেই নিয়ত তাপ বিকিরণ করিতেছে। জ্যোতিষ্কপুঞ্জ হইতে এইরূপ তাপবিকিরণ হইতে হইতে এককালে এমন অবস্থা আসিতে পারে, যখন মহাবিশ্বের কোথায়ও তাপের ন্যূনাধিক্য থাকিবে না। হয়তো তখন ঘটিবে বিশ্বজোড়া মহাপ্রলয়। কিন্তু ঐরূপ মহাপ্রলয় ঘটিলে তাহা কতকাল পরে ঘটিবে, কোনো বিজ্ঞানীই তাহার নিশ্চয়তা প্রদান করিতে পারেন নাই।”
উপরোক্ত মতে, বিশ্বের যাবতীয় নীহারিকা বা নক্ষত্ররাজ্যের প্রতিটি নক্ষত্র বা সূর্য একদিন না একদিন নিভিয়া যাইবে। তখন বিশ্বের কোথায়ও উত্তাপ বা আলোকের নামগন্ধও থাকিবে না, সর্বত্র বিরাজ করিবে কল্পনাতীত শৈত্য ও অন্ধকার। সেই হিমান্ধকার ব্যোমসমুদ্রে ভাসিতে থাকিবে নক্ষত্র ও গ্রহ-উপগ্রহাদির মৃতদেহগুলি।
শৈত্যে সঙ্কুচিত ও উত্তাপে প্রসারিত হওয়া বস্তুজগতের একটি সাধারণ নিয়ম। সেই কালান্তকালের মহাশৈত্যে তখনকার বস্তুপিণ্ডগুলি সম্ভবত অতিমাত্রায় সকুচিত হইবে এবং উহার ফলে বস্তুপিণ্ডের মধ্যে প্রবল চাপের সৃষ্টি হইবে, যাহার ফলে পদার্থের পরমাণু ভাঙ্গিয়া উহা তেজ বা শক্তিতে রূপান্তরিত হইবে।
শক্তি কখনও নিষ্ক্রিয় থাকিতে পারে না। তাই শক্তির সক্রিয়তার ফলে আবার শুরু হইবে (অত্র পুস্তকে লিখিত সৃষ্টির ধারা পরিচ্ছেদের বিবরণমতে) ধাপে ধাপে নূতন সৃষ্টির প্রবাহ। অর্থাৎ আবার সৃষ্টি হইতে থাকিবে ইলেকট্রন-প্রোটন, পরমাণু, নীহারিকা, নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহাদি বস্তুসমূহ, অবশেষে প্রাণ ও প্রাণী। কালান্তে আবার প্রলয় আবার সটি আবার প্রলয়। এইভাবে অনাদিকাল হইতে চলিয়াছে এবং অনন্তকাল চলিবে সৃষ্টি ও প্রলয় কাণ্ড। সুতরাং সৃষ্টি ও প্রলয় একবার-দুইবার নহে, অসংখ্যবার। অর্থাৎ সৃষ্টি ও প্রলয়ের কোনো আরম্ভ বা শেষ কল্পনাতীত।
১৯. উপসংহার
উপসংহার
