হজরত মূসা নবীর মতো যীশু (হজরত ঈসা আ.)-ও মহাপ্রভুর দর্শন পাইয়াছিলেন। যীশুর খোদাদর্শন সম্বন্ধে বাইবেলে লিখিত বিবরণটি এইরূপ — “পরে যীশু বাপ্তাইজিত হইয়া অমনি জল হইতে উঠিলেন, আর দেখ, তাহার নিমিত্ত স্বর্গ (আকাশ) খুলিয়া গেল; এবং তিনি ঈশ্বরের আত্মাকে কপোতের ন্যায় নামিয়া আপনার উপরে আসিতে দেখিলেন, আর দেখ, স্বর্গ হইতে এই বাণী হইল, ‘ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, হঁহাতেই আমি প্রীত।” (মথি ৩; ১৬, ১৭)
এতদ্দেশের হিন্দুগণ গঙ্গানদীর জলকে পবিত্র মনে করেন এবং মুসলমানগণ পবিত্র মনে করেন জমজম কূপের পানি। ঐরূপ ইহুদিরা (খ্রীস্টানরাও) জর্দান নদীর পানিকে পবিত্র মনে। করেন। ইহুদিদের স্বধর্মে দীক্ষা গ্রহণের সময় ঐ নদীর জলে অবগাহন করিতে হয়। উহাকে বলা হয় বাপ্তাইজ। যে সমস্ত দূরদেশবাসীদের পক্ষে ঐ নদীর জলে অবগাহন সম্ভব নহে, সেই সমস্ত দেশবাসীদের বাপ্তাইজিত হইতে হয় ঐ নদী হইতে লওয়া কিছু জল গায়ে ছিটাইয়া।
তৎকালীন ইহুদিদের ধর্মযাজক ছিলেন হজরত জাকারিয়া নবীর পুত্র হজরত ইয়াহইয়া (যোহন)। ত্রিশ বৎসর বয়ঃক্রমকালে যীশু যোহনের নিকট ইহুদি ধর্মে বাপ্তাইজিত হন। অর্থাৎ দীক্ষা গ্রহণ করেন।
যীশু বাপ্তাইজিত হইয়া জর্দান নদীর তীরে উঠিয়া দেখিতে পাইলেন যে, একটি কবুতর পাখি উড়িয়া তাহার মাথার উপর আসিতেছে। তখন তিনি ভাবিলেন যে, ঐ কবুতরটি ঈশ্বরের আত্মা। আর তিনি শুনিতে পাইলেন, কবুতরটি বলিয়া গেল, “ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, ইহাতেই আমি প্রীত।” এই বাণীটির দ্বারাই যীশু পাইলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব।
যীশু ঈশ্বরের বাণী বা পয়গম্বরী প্রাপ্ত হন ৩০ বৎসর বয়সে। অতঃপর তিনি স্বীয় ধর্মমত (খ্রীস্টিয়ানিটি) প্রচার করিতে শুরু করেন। ধর্ম বিষয়ে তাঁহার মতামতসমূহই নূতন নিয়ম বা ইঞ্জিল কেতাব নামে পরিচিত। কাজেই ইঞ্জিল কেতাবের বর্তমান (১৯৭০) বয়স অনধিক ১৯৪০ বৎসর।
নূতন নিয়ম-এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিধান এই —
১. হিংসা করা নিষেধ –হজরত মূসা (আ.) বলিতেন যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চক্ষুর বদলে চক্ষু ও দন্তের পরিবর্তে দন্ত লইবে। কিন্তু যীশু বলিতেন, “তুমি দুষ্টের প্রতিরোধ করিও না। বরং যে কেহ তোমার ডান গালে চড় মারে, অন্য গাল তাহাকে ফিরাইয়া দাও। আর যে তোমার সহিত বিচারস্থানে বিবাদ করিয়া তোমার আঙরাখা লইতে চায়, তাহাকে চোগাও লইতে দাও। আর যে কেহ এক ক্রোশ যাইতে তোমাকে পীড়াপীড়ি করে, তাহার সহিত দুই ক্রোশ যাও।” (মথি ৫; ৩৯-৪১)
২. শপথ করা নিষেধ –হজরত মূসা (আ.) বলিতেন, “তুমি মিথ্যা দিব্য করিও না।” কিন্তু যীশু বলিতেন, “কোনো দিব্যই করিও না।” (মথি ৫; ৩৪)
৩. গোপনে দান করা –যীশু বলিতেন, “তুমি যখন দান কর, তখন তোমার দক্ষিণ হস্ত কি করিতেছে, তাহা তোমার বাম হস্তকে জানিতে দিও না।” (মথি ৬; ৩, ৪)
৪. সঞ্চয় না করা –যীশু বলিয়াছেন, “তোমরা পৃথিবীতে আপনাদের জন্য ধন সঞ্চয় করিও না; এইখানে তো কীটে-মরিচায় ক্ষয় করে এবং চোরে সিধ কাটিয়া চুরি করে। কিন্তু স্বর্গে আপনাদের জন্য ধন সঞ্চয় কর, সেইখানে কীটে ও মরিচায় ক্ষয় করে না, সেইখানে চোরেও সিধ কাটিয়া চুরি করে না।” (মথি ৬; ১৯, ২০)
যীশুর এই আদেশটি হাল জামানার অর্থনীতির পরিপন্থী। কেননা বর্তমান যুগের রাজনীতিতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে সঞ্চয়কেই প্রথম স্থান দেওয়া হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে যীশুর এই আদেশটি ধর্মান্তরে প্রতিফলিত হওয়ার ফলে নিরীহ ধর্মভীরুদের শ্রমার্জিত অর্থ লুটিতেছে একদল ব্যবসায়ী ধর্মপ্রচারক।
৫. পরনিন্দা না করা –যীশু বলিয়াছেন, “তোমরা বিচার করিও না, যেন বিচারিত না হও। … আর তোমার ভ্রাতার চক্ষে যে কুটা আছে, তাহাই কেন দেখিতেছ, কিন্তু তোমার নিজের চক্ষে কড়িকাঠ আছে, তাহা কেন ভাবিয়া দেখিতেছ না?” (মথি ৭; ১-৩)
৬. সর্বস্ব ত্যাগ করা –একদা এক ব্যক্তি যীশুকে জিজ্ঞাসা করিল, “হে গুরু! অনন্ত জীবন পাইবার জন্য কিরূপ সৎকর্ম করিব?” যীশু বলিলেন, “নরহত্যা করিও না, চুরি করিও না, ব্যভিচার করিও না এবং তোমার প্রতিবেশীকে আপনার মতো প্রেম করিও।” সেই ব্যক্তি বলিল যে, “আমি ঐ সমস্ত আদেশ পালন করিয়াছি, এখন আমার কি ত্রুটি আছে?” উত্তরে যীশু তাহাকে বলিলেন, “যদি সিদ্ধ হইতে ইচ্ছা কর, তবে চলিয়া যাও, তোমার যাহা আছে, বিক্রয় কর এবং দরিদ্রদিগকে দান কর, তাহাতে স্বর্গে ধন পাইবে। … আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, ধনবানের পক্ষে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করা দুষ্কর। আবার তোমাদিগকে কহিতেছি, ঈশ্বরের রাজ্যে (স্বর্গে) ধনবানের প্রবেশ করা অপেক্ষা বরং সূচীর ছিদ্র দিয়া উটের যাওয়া সহজ।” (মথি ১৯; ২১-২৪)।
.
# ৫. কোরান
পবিত্র কোরান মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ এবং ইহা ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলিয়া পরিচিত। যে সব গ্রন্থকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ বলিয়া দাবি করা হয়, পবিত্র কোরান তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বরং অতুলনীয়। পবিত্র কোরানের প্রচারক হজরত মোহাম্মদ (সা.)। তিনি ৫৭১ খ্রীস্টাব্দের ২০ এপ্রিল পবিত্র মক্কা নগরে জন্মলাভ করেন এবং শৈশবেই মাতৃ-পিতৃহীন হইয়া বহু দুঃখ-কষ্টে তদীয় পিতামহ কর্তৃক প্রতিপালিত হন। শৈশবে তিনি লেখাপড়া শিখিবার সুযোগ পান নাই। তিনি ছিলেন আশৈশব শান্ত, ধীর, সত্যবাদী ও চিন্তাশীল। যৌবনে পদার্পণ করার সাথে সাথে তিনি হন একাধারে বিশ্বাসী, ন্যায়বান, দয়ালু, নিভীক, পরোপকারী ও ক্ষমাশীলাদি শত শত সদগুণের অধিকারী এবং ভাবুক।
