সবাই মুখ হাত ধুয়ে বসে বসে পান চিবুচ্ছি। এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে মাসুম ঘরে প্রবেশ করে বললো, নরেশদা, দানিয়েল ভাই শিগ্গির চলুন রেজোয়ান আত্মহত্যা করেছে। মাসুমের মুখে সংবাদটি শুনে আমরা সকলেই অভিভূত হয়ে গেলাম। দু’চারদিন আগেও আমাদের আড্ডায় এসেছিলো, সর্বক্ষণ অপরকে হাসাতো। সব সময়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা নবদ্বীপ হালদারের কমিক মুখস্ত বলতো। এই যুদ্ধ, দেশত্যাগ, খুন, জখম, বীভৎসতা কিছুই যেনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। মাঝে মাঝে আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, মানুষ এতো হাসে কেমন করে? স্বীকার করতে আপত্তি নেই, রেজোয়ানের প্রতি মনের কোণে একটুখানি বিদ্বেষ পুষে রাখতাম।
প্রথম বিস্ময়ের ধাক্কাটি কেটে গেলে মাসুমের মুখে রেজোয়ানের আত্মহত্যার কারণটা জানতে পারলাম। কিছুদিন আগে রেজোয়ানদের আড্ডায় কুমিল্লা থেকে মজিদ বলে আরেকটি ছেলে আসে। রেজোয়ানরা থাকতো রিপন স্ট্রীটে। মজিদ আর রেজোয়ান দু’জনেই কুমিল্লার কান্দিরপাড় এলাকার একই পাড়ার ছেলে। মজিদ কোলকাতা এসে সকলের কাছে রটিয়ে দেয় যে রেজোয়ানের যে বোনটি উম্যান্স কলেজের প্রিন্সিপাল, সে একজন পাকিস্তানী মেজরকে বিয়ে করে ফেলেছে। এই সংবাদটা পাওয়ার পর রেজোয়ান দু’দিন ঘরের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকে। কারো সঙ্গে একদম কথাবার্তা বলেনি। অনেক চেষ্টা করেও কেউ তাকে কিছু খাওয়াতে পারেনি। অবশেষে রাত্রিবেলা ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। সকালে সে বিছানা ছেড়ে উঠছে না দেখে রুমের অন্যান্যরা ঘুম ভাঙ্গাতে চেষ্টা করে দেখে মরে শক্ত হয়ে গিয়েছে। আর মুখের লালা পড়ে বালিশ ভিজে গেছে। তার মাথার কাছে পাওয়া গেলো একটি চিরকুট। তাতে লিখে রেখেছে, বড়ো আপা, যাকে আমি বিশ্বাস করতাম সবচাইতে বেশি, সে একজন পাকিস্তানী মেজরের স্ত্রী হিসেবে তার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমোচ্ছে, একথা আমি চিন্তা করতে পারিনে। দেশে থাকলে বড়ো আপা এবং মেজরকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতাম। এখন আমি ভারতে। সুতরাং সে উপায় নেই। অথচ প্রতিশোধ স্পৃহায় আমার রক্ত এতো পাগল হয়ে উঠেছে শেষ পর্যন্ত নিজেকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেই। যার আপন মায়ের পেটের বোন দেশের চরমতম দুর্দিনে, দেশের শত্রুকে বিয়ে করে তার সঙ্গে একই শয্যায় শয়ন করতে পারে তেমন ভাইয়ের বেঁচে থেকে লাভ কি? কি করে আমি দেশের মানুষের সামনে কলঙ্কিত কালো মুখ দেখাবো। আমার মতো হতভাগ্যের বেঁচে থাকার কোনো অর্থ হয় না। সকলকে কষ্ট দিতে হলো বলে আমি দুঃখিত এবং সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ইতি রেজোয়ান।
শুনেই আমি, নরেশদা এবং খুরশিদ রিপন স্ট্রীটে ছুটলাম। সেখানে গিয়ে শুনি রেজোয়ানের লাশ থানায় নিয়ে গেছে। অগত্যা থানায় যেতে হলো। ময়না তদন্ত ছাড়া লাশ বের করে আনতে কম হ্যাঙ্গামাহুজ্জত পোহাতে হলো না। এতে সমস্যার শেষ নয়। তারপরেও আছে কবর দেয়ার প্রশ্নটি। আমরা কোলকাতা শহরে সবাই ভাসমান মানুষ। মৃত ব্যক্তিকে এখানে কোথায় কবর দিতে হয়, কি করে কবর দিতে হয়, এসব হাজারটা কায়দাকানুনের কিছুই আমরা জানিনে। তাছাড়া আমাদের সকলের পকেট একেবারে শূণ্য। টাকা থাকলে বুকে একটা জোর থাকে। সেটাও আমাদের নেই। কি করি। আমাদের একজন ছুটলো কাকাবাবু মুজফফর আহমদের কাছে। তিনি নিজে অসুস্থ মানুষ। তাঁকে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হয়। তিনি এক সময়ে বাংলাদেশের মানুষ ছিলেন, এই দাবিতে আমরা সময়ে অসময়ে তার কাছে গিয়ে হাত পেতেছি। তিনি সাধ্যমতো আমাদের দাবি পূরণ করেছেন। এই রকম একটা ব্যাপার নিয়ে তাঁকে বিব্রত করা ঠিক হবে কিনা এ নিয়ে আমাদের মনে যথেষ্ট দ্বিধা ছিলো। তবু তাঁর কাছে যেতে হলো। তিনি তাঁর পার্টির একজন মানুষকে বলে গোবরা কবরস্থানে কবর দেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। তারপরেও আমাদের টাকার প্রয়োজন। লাশকে গোসল দিতে হবে, কাফন কিনতে হবে, কবর খুঁড়তে হবে, কবরস্থানে নিয়ে যেতে হবে, জানাজা পড়াতে হবে-এসবের প্রত্যেকটির জন্য টাকার প্রয়োজন। টাকা কোথায় পাওয়া যাবে। আমাদের আরেকজন ছুটলো প্রিন্সেপ স্ট্রীটে অধ্যাপক ইউসুফ আলির কাছে। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাহলেও আমাদের সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক আছে। ইচ্ছে করলে তিনি টাকাটা ম্যানেজ করে দিতে পারেন। আমাদের অনুমানই সত্য হলো। ইউসুফ সাহেব কাফন দাফনের টাকাটা ব্যবস্থা করলেন। ক্ষেত্র বিশেষে জীবিত মানুষের চাইতে মৃত মানুষের দাবি অধিক শক্তিশালী।
রেজোয়ানকে গোসল ইত্যাদি করিয়ে কবর দিতে দিতে সন্ধ্যে হয়ে গেলো। আমার ধারণা হয়েছিলো মৃত্যু আর আমাকে বিচলিত করে না। পঁচিশে মার্চের পর থেকে ভারতে আসার পূর্ব পর্যন্ত মৃত্যু তো কম দেখিনি। আমি নীলক্ষেত দেখেছি, রাজারবাগ দেখেছি, শাঁখারি বাজার দেখেছি। আমার নিজের কানের পাশ দিয়েও পাকিস্তানী সৈন্যের রাইফেলের গুলি হিস হিস করে চলে গেছে। কিন্তু রেজোয়ানের মৃত্যুটি একেবারে অন্যরকম। আমার সমস্ত সত্তার মধ্যে একটা আলোড়ন জাগিয়ে দিয়ে গেছে। যার বোন পাকিস্তানী মেজরকে বিয়ে করেছে, তাকে আত্মহত্যা করতে হয়। সেদিন আমাদের সকলের হৃদয় এমন গভীর বিষাদে ভারাক্রান্ত ছিলো যে কেউ কারো সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারিনি।
