শামায়োখের ছোট বোন বানু এসে আমাকে সরাসরি বলল, আমাদের বাড়ির ব্যাপারে আপনি নাক গলাবার কে? আমার বোন, আমার ভাবির সঙ্গে ঝগড়া করেছে, সেও আমার চাচাতো বোন। আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে আপনি বাইরে থেকে এসে বাগড়া দেবার কে? বানুর কথায় কোনোরকম কান না দিয়ে আমি শামায়োখকে নিয়ে আমার এক পরিচিত ডাক্তারের ডিসপেনসারিতে ছুটলাম।
শামারোখ আমাকে মস্ত একটা গোলক ধাঁধার মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছে। তার ব্যাপারে আমি কোনো ধারণা নির্মাণ করতে পারছি নে। তার কবিতা পড়ে মনে হয়েছে সে খুবই অসহায় এবং দুঃখী মহিলা। এই দুঃখবোধটাই তার কবিতায় অগ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে। প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের পাপড়িতে শেষ রাতের ঝরে-পড়া শিশিরের মতো সূর্যালোকে দীপ্তিমান হয়। তার মুখমণ্ডলের অমলিন সৌন্দর্যের প্রতি যখন দৃষ্টিপাত করি, পিঠময় ছড়িয়ে পড়া কালো কেশের দিকে যখন তাকাই, যখন নিশি রাতের নিশ্বাসের মতো তার আবেগী কবিতা পাঠ শ্রবণ করি, আমার মনে ঢেউ দিয়ে একটা বাসনাই প্রবল হয়ে জেগে ওঠে, এই নারীর শুধু অঙ্গুলি হেলনে আমি দুনিয়ার অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে যেতে পারি।
এই সময়ের মধ্যে শামায়োখের বিষয়ে আমার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতাও হয়েছে। শামারোখ আমার ঘরে সোলেমান চৌধুরীকে নিয়ে এসেছিল। এই চৌধুরীর সঙ্গে আমাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত যেতে হয়েছে এবং একসঙ্গে বসে শামারোখের কবিতা পাঠ শুনতে হয়েছে। শামারোখ এবং সোলেমানের সম্পর্কটি কি ধরনের? শামায়োখ যদি আমাকে টেনে না নিত, এই ধরনের নাসিক্য উচ্চারণে কথা বলা বঙ্গীয় ইংরেজের সঙ্গে কখনো আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অবধি যেতাম না। তারপর শামারোখ আমাকে কি কারণে সেই গ্রিন রোডের উদ্ধত অর্থবান আদিলের বাড়িতে নিয়ে গেল, তাও আমার বোধবুদ্ধির সম্পূর্ণ বাইরে। একবার সোলেমান, একবার আদিল, এই ধরনের মানুষদের সামনে শামারোখ আমাকে উপস্থিত করছে কেন? তার কি কোনো গোপন মতলব আছে? মাঝে মাঝে মনের কোণে একটা সন্দেহ কালো ফুলের মতো ফুটে উঠতে চায়। শামারোখ আমাকে এসব মানুষকে আটকাবার জন্য টোপ হিশেবে ব্যবহার করতে চায় কিনা।
শামারোখদের শান্তিনগরের বাড়িতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, তাতে মহিলার মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে। ক্যামব্রিজ থেকে পাস করে আসা একজন মহিলা কী করে তার আপন ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে জন্তুর মতো কামড়াকামড়ি করে থানা-পুলিশ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে পারে! মনে মনে ভেবে দেখতে চেষ্টা করি, এই মহিলা আমাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে। এই দুই বিপরীতমুখী ভাবনায় আমার ভেতরটা দুটুকরো হয়ে যাচ্ছে।
শামারোধের মুখটা যখন আমার স্মরণে আসে, সমগ্র শরীরের মধ্য দিয়ে একটা আবেগ প্রবাহিত হয়। আমি থর থর করে কেঁপে উঠতে থাকি। আমার ইচ্ছে হয়, এই সুন্দর নারী, প্রতি চরণপাতে যে পুষ্প ফুটিয়ে তোলে, তার জন্য জীবন মনপ্রাণ। সবকিছু উজাড় করে দিই। আবার যখন তার বিবিধ অনুষঙ্গের কথা চিন্তা করি এক ধরনের বিবমিষা আমার সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন করে ফেলে। এই মহিলাকে প্রাণের ভেতরে গ্রহণ করা যেমন অসম্ভব, তেমনি প্রাণ থেকে ডালেমূলে উপড়ে তুলে বিষাক্ত আগাছার মতো ছুঁড়ে ফেলাও ততধিক অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তার সম্পর্কে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলে কখনো অনুভব করি সে অমৃতের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কখনো মারাত্মক প্লেগের জীবাণুর মতো অস্পৃশ্য মনে হয়। এই দোলাচলবৃত্তির মধ্যেই আমি দিন অতিবাহিত করছিলাম।
.
১৫.
আমার গ্রামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে বায়তুল মোকাররম গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। পরিবার-পরিজনের কাপড়-চোপড় কেনার জন্য আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাজার থেকে কাপড়-চোপড় কেনার কাজটি আমি অপছন্দ করি। অথচ মানুষ সেই অপছন্দের কাজটি করার জন্য আমাকে বার বার ধরে নিয়ে যায়। এ-দোকান সে-দোকান ঘুরে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ঘোরার চাইতে পাঁচমিশেলি মানুষের ভিড়ই হয়রান করেছে বেশি। গ্রামের ভদ্রলোককে বিদেয় করার পর ভাবলাম, যাক বাঁচা গেল!
আমি বায়তুল মোকাররমের সামনে এসে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিলাম। সন্ধ্যের বাতি জ্বলে উঠেছে। গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ, মানুষের আওয়াজ, বিচিত্র বর্ণের আলোর উদ্ভাস সবকিছু মিলিয়ে আমার মনে হলো, সন্ধ্যেবেলার ঢাকা যেন ভূতপ্রেতের বাগানবাড়ি। এখানে সবকিছুই ভুতুড়ে। আমি পথ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। একা একা পথ চলার সময় মনে নানারকম ভাবনার উদয় হতে থাকে। জেনারেল পোস্টাফিস ছাড়িয়ে আমি আব্দুল গনি রোডে চলে এলাম। এই রাস্তাটিতে রিকশা চলে না। সুতরাং অল্পস্বল্প ফাঁকা থাকে। হঠাৎ করে পেছন থেকে কে একজন আমার শরীরে হাত রাখল। আমি চমকে উঠলাম। হাইজ্যাকারের পাল্লায় পড়ে গেলাম না তো! এ মাসের স্কলারশিপের পুরো টাকাটা এখনো আমার পকেটে। যদি নিয়ে যায় সারা মাস আমার চলবে কেমন করে? পেছনে তাকিয়ে দেখি অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর তায়েবউদ্দিন সাহেব। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। অদূরে তার সাদা ফিয়াটখানা দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন, কি ভায়া, তোমার ভাবনার ব্যাঘাত ঘটালাম নাকি? বেশ হেলতে-দুলতে যাচ্ছে একাকী। আমি একটুখানি লজ্জিত হলাম। বললাম, না স্যার, এই সন্ধ্যেবেলায় এই ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে ভাল লাগে। তিনি বললেন, তুমি তো আবার ভাবুক মানুষ। গাড়িতে উঠতে বললে রাগ করবে? আমি বললাম, রাগ করব কেন স্যার। আমি গাড়ির পেছনে বসতে যাচ্ছিলাম। তায়েবউদ্দিন সাহেব তার পাশের সিটটি দেখিয়ে বললেন, এখানেই বসো, কথা বলতে সুবিধে হবে। গাড়ি চলতে আরম্ভ করল। তিনি বনানীর স্কাইলার্ক রেস্টুরেন্ট-কাম বারের গেটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললেন, তোমাকে পেয়ে খুবই ভাল হলো। আজকে তোমার সঙ্গেই চুটিয়ে আড্ডা দেব। এত ব্যস্ত থাকতে হয় শিল্প-সাহিত্য সম্বন্ধে কোনো খবরাখবর রাখাই সম্ভব হয় না। তোমার মুখ থেকেই এ বিষয়ে কিছু শুনব। প্রফেসর তায়েবউদ্দিন লিফটে উঠে বোতাম টিপলেন। আমার কেমন বাধোবাধো ঠেকছিল। একজন নামকরা প্রফেসরের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে এসে আড্ডা দেয়া, এরকম কিছু আমাদের দেশে সচরাচর ঘটে না।
