.
১৪.
দুদিন পর শান্তিনগরে শামারোখদের বাড়িতে গেলাম। বাড়ি চিনে নিতে বিশেষ কষ্ট হয়নি। আবুলের হোটেলের সামনের পানের দোকানটিতে যখন জিজ্ঞেস করলাম, দোকানদার আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়েই বলল, যে বাড়িতে তিনজন সুন্দরী। মাইয়া মানুষ আর একটা বুইড়া মানুষ থাকে, হেই বাড়ি তালাশ করতাছেন? নাক বরাবর সিধা যাইবেন, তারপর বামে ঘুইরবেন, গেইটের সামনে দেখবেন একটা জলপাই গাছ, সেই বাড়ি। জলপাই গাছ দেখে আমি ভেতরে ঢুকলাম। এক বিঘের মতো জমির মাঝখানে একটা ছোট একতলা ঘর। আর জমির চারপাশে বাউন্ডারি দেয়াল দেয়া আছে। একপাশে তরিতরকারির বাগান। এক ভদ্রমহিলা প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পানি দিচ্ছেন। অনিন্দ্যসুন্দরী মহিলা, চোখ ফেরানো যায় না। মুখমণ্ডলটা ভাল করে তাকালে শামায়োখের সঙ্গে একটা মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। এই ধরনের ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলতে গেলে হঠাৎ করে মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে আসতে চায় না। আমি ডান হাতটা তুলে সালাম দেয়ার ভঙ্গি করলাম। ভদ্রমহিলা আমার দিকে মুখ তুলে তাকালে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা এটা কি শামারোখদের বাড়ি? মহিলা কথা শুনে বিরক্ত হলেন মনে হলো। আঙুল দিয়ে সামনের দরজা দেখিয়ে বললেন, ওদিক দিয়ে ঢোকেন।
ঘরের দরজা খোলা ছিল। আমি জুতো না খুলেই ভেতরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম একেবারে সাধারণ একটি তক্তপোশের ওপর একজন প্রবীণ ভদ্রলোক ঝুঁকে পড়ে কি সব লিখছেন। চারপাশে ছড়ানো অজস্র ধর্মীয় পুস্তক। ভদ্রলোকের মুখের দাড়ি একেবারে বুকের ধার অবধি নেমে এসেছে এবং সবগুলো পেকে গেছে। ভদ্রলোককে আমি সালাম দিলাম। তিনি হাত তুলে আমার সালাম নিলেন এবং কড়া পাওয়ারের চশমার ভেতর দিয়ে আমার আপাদমস্তক ভাল করে লক্ষ্য করলেন। ভদ্রলোক খুবই নরম জবানে জানতে চাইলেন, আমি কেন এসেছি? আমি বিনয় সহকারে বললাম, শামারোখ আমাকে আসতে বলেছিল। এবার ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে খুব সুন্দর করে হাসলেন। গামছা দিয়ে ঝেড়ে একটা কাঠের চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন, বসুন। আমি বসলাম। কিন্তু বাড়ির ভেতরে শামায়োখের উত্তপ্ত চিৎকার শুনতে পেলাম। আরেক মহিলার সঙ্গে শামায়োখ চেঁচিয়ে ঝগড়া করছে। দুজনে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা কইছে না। এমন সব খারাপ শব্দ তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে, শুনলে কানে আঙুল দেয়ার প্রয়োজন হয়। ভদ্রলোক টুলু টুলু বলে কয়েকবার ডাকলেন। ঝগড়ার আওয়াজের মধ্যে ভদ্রলোকের ডাক চাপা পড়ে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে করুণ হাসি হেসে বললেন, আজ সকালবেলা থেকে আমার মেয়ে এবং পুত্রবধূ তুমুল ঝগড়াঝাটি করছে। এই প্রচণ্ড চিল্কারের মধ্যেও ভদ্রলোককে নির্বিকার পড়াশোনা করে যেতে দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি লিখছেন? তার চোখে-মুখে একটা লজ্জার আভাস খেলে গেল। বললেন, আমি কোরআন শরিফের ইয়াসিন সুরাটা বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আরবি জানেন? তিনি বললেন, এক সময় তো ভালই জানতাম। পঁচিশ বছর সরকারি চাকরি করেছি। ভাবছিলাম রিটায়ার করার পর শান্তমনে আল্লা-রসুলের কাজ করব। তা আর হচ্ছে কই! সব সময় অশান্তি। দেখছেন না মেয়ে এবং ছেলের বউ কিভাবে ঝগড়া করছে। ভদ্রলোককে আমার মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদের নির্জন গম্বুজের মতো মনে হলো। ভদ্রলোক অনুবাদের কিছু অংশ আমাকে দেখালেন। পড়তে আমার বেশ লাগল। তিনি বললেন, কোরআনের ভাষা-রীতির মধ্যে একটা কবিত্ব আছে। সেই জিনিসটা ফুটিয়ে তুলতে না পারলে অনুবাদ সঠিক হয় না। আমি ভাষার অর্থটা বুঝি, কিন্তু সুপ্ত কবিত্ববোধটুকু বাংলা ভাষায় আনতে পারিনে, আল্লাহ আমাকে সে শক্তি দান করেন নি।
তরকারি বাগানে যে ভদ্রমহিলা পানি দিচ্ছিলেন, তিনি এসে বললেন, আল্লুজান, আজ বিকেলে আমি মেজো আপার কাছে চলে যাচ্ছি। এই জাহান্নামের মধ্যে আমার থাকা সম্ভব হবে না। ভদ্রলোক বললেন, আজ বিকেলেই যেতে চাও? তিনি বললেন, হা। ভদ্রলোক বললেন, আচ্ছা। ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন, তার আয়ত চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল, আপনি যে যাই করুক সব সময়ে আচ্ছা বলে পাশ কাটিয়ে যান। আম্মাজান বেঁচে থাকলে এরকম আচ্ছা বলে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারতেন? ভদ্রলোক কোনোরকম উচ্চবাচ্য না করে চুপ করে রইলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার ছোট মেয়ে বানু।
ভেতরের ঘর থেকে আর কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হয় দুজনেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমি চলে আসব কিনা চিন্তা করছিলাম। শামারোখের বাবা বললেন, আপনি একটু বসুন, আমি ভেতরে গিয়ে দেখে আসি কি অবস্থা। ভদ্রলোক ভেতরে গেলেন। অতর্কিতে শামায়োখ বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, এই যে জাহিদ সাহেব, কখন এসেছেন? সহসা আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। শামারোখকে এই অবস্থায় না দেখলে আমাদের দুজনের জন্যই ভাল হতো। শামারোখ বলল, আপনি এসেছেন, খুবই ভাল হয়েছে। আমাকে থানায় নিয়ে চলুন। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম, থানায় কেন? শামারোখ তার ডান বাহুটা আমার সামনে তুলে ধরে দেখালো, দেখছেন, হারামজাদি কামড়ে আমার কি দশা করেছে। আমি দেখলাম শামায়রাখের সুন্দর বাহুর মাংসের ওপর মনুষ্য দন্তের ছাপ। মাংস কেটে ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং দরদর করে রক্ত বেরিয়ে আসছে। আমি কি করব ঠিক করে উঠতে পারলাম না। বললাম, বাড়িতে ডেটল জাতীয় কিছু থাকলে লাগিয়ে আগে রক্তপাত বন্ধ করুন। শামারোখ বলল, না, না, রক্তপাত বন্ধ করলে থানা কেস নিতে চাইবে না। আগে হারামজাদিকে অ্যারেস্ট করাই, তারপর অন্য কিছু।
