জি আছে।
একটা টেলিফোন করব।
আসুন, ভেতরে আসুন। বসুন আপনি। টেলিফোন সেটটা শোবার ঘরে। আমি নিয়ে আসছি।
রশিদ মোল্লার সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবারের অন্য সবাইও জেগে উঠেছে। অল্পবয়সী। একটি মেয়ে পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে গেল। মনে হচ্ছে-এই মেয়েটিই গোলাপের চাষ করে। তিনি রশিদ মোল্লাকে হক চকিয়ে দিতে এসে পরিবারের সবাইকে হকচকিয়ে দিয়েছেন।
নিন স্যার, টেলিফোন করুন। কত নাম্বারে করবেন?
মিসির আলি বললেন, আপনি নাম্বারটা বলুন?
রশিদ মোল্লা বললেন, কী নাম্বারের কথা বলছেন?
মুশফেকুর রহমানের টেলিফোন নাম্বারটা বলুন। নিশ্চয়ই তার বাড়িতে টেলিফোন আছে। আপনি তার নাম্বারও জানেন।
এখন টেলিফোন করে লাভ হবে না স্যার। উনি এখন টেলিফোন ধরবেন না। সন্ধ্যার পর উনি টেলিফোন ধরেন না।
তবু চেষ্টা করে দেখি। নাম্বারটা বলুন।
উনি যদি জানেন আমি নাম্বার দিয়েছি তা হলে খুব রাগ করবেন।
উনি জানবেন না।
রশিদ মোল্লা শুকনো গলায় নাম্বার বললেন, দু বার রিং হতেই ওপাশ থেকে টেলিফোন উঠানো হল। কেউ কোনো কথা বলছে না। মিসির আলি কুকুরের ক্রুদ্ধ গর্জন শুনতে পাচ্ছেন। কেউ একজন খুব হালকাভাবে টেলিফোন সেটের উপর নিশ্বাস ফেলল। মিসির আলি বললেন, হ্যালো!
ওপাশ থেকে ভারী গম্ভীর গলায় বলল, মিসির আলি সাহেব?
জি।
আপনার টেলিফোন কলের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।
গলার স্বর সম্পূর্ণ অচেনা। শুদ্ধ ভাষায় কেউ কথা বলছে–কিন্তু এর মধ্যেই গ্ৰাম্য টান আছে। পুরুষকণ্ঠ, তবে এই কণ্ঠের সঙ্গে মুশফেকুর রহমানের কণ্ঠস্বরের কোনো মিল নেই। গলার স্বর মানুষ বদলাতে পারে, কিন্তু এতটা পারে না। মিসির আলি বললেন, আপনি কে বলছেন?
আমাকে আপনি চিনবেন না। আমার সঙ্গে আপনার পরিচয় হয় নি। আমি তন্ময়ের টিচার ছিলাম। ওকে অঙ্ক শেখাতাম। তন্ময় সম্ভবত আমার কথা বলেছে আপনাকে?
হ্যাঁ বলেছে। শুনুন মিসির আলি সাহেব, আমি আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। কবে আসবেন?
বুঝতে পারছি না কবে আসব। প্ৰেতাত্মাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। ভালোও লাগে না।
ভালো লাগে না কী করে বললেন? আগে কি কখনো প্রেতাত্মার সঙ্গে কথা বলেছেন?
আপনার সঙ্গে বলছি।
বাহ্, আপনি মানুষ হিসেবেও তো রসিক। একবার আসুন। আসবেন?
আসতেও পারি।
দেরি না করে চলে আসুন। আজ রাতেই চলে আসুন।
আপনার বাড়ির ঠিকানা কী?
রশিদ মোল্লাকে জিজ্ঞেস করুন। ও আপনাকে ঠিকানা বলে দেবে। আপনি ওর বাসা থেকেই তো টেলিফোন করছেন। তাই না?
জি।
কিংবা এক কাজ করতে পারেন। ওকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসতে পারেন। ও দারুণ ভীতু ওকে একটা ধমক দিলেই ও আপনার সঙ্গে আসবে এবং দূর থেকে বাসা দেখিয়ে দেবে। কাছে আসবে না। সন্ধ্যার পর বাসার কাছে আসতে সে ভয় পায়?
আজ আসতে পারছি না। তবে হয়তো শিগগিরই আসব।
শুনুন মিসির আলি সাহেব, আজ আসাই ভালো। জোছনা রাত আছে। জোছনা আপনার ভালো লাগে নিশ্চয়ই।
ভালো লাগে না। জোছনা অনেক রহস্য তৈরি করে। রহস্য আমি পছন্দ করি না। বলেই দিনের আলো জোছনার চেয়ে বেশি ভালো লাগে।
রহস্য আপনি পছন্দ করেন না?
জি না।
এই জন্যেই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি। চলে আসুন।
আসব আসব, এত ব্যস্ত হবেন না।
আমি মোটেই ব্যস্ত নই। আপনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এই জন্যেই বলছি। ও আরেকটা কথা-আগের ম্যানেজারের মেয়েটির ঠিকানা রশিদ মোল্লা জানে না। বের করার চেষ্টা করেছে। পারে নি। তবে আমি আপনাকে ঠিকানা দিতে পারি। ওরা মায়ায়ণগঞ্জে থাকে। আপনার কাছে কি কাগজ-কলম আছে? থাকলে লিখে নিন…
মিসির আলি বললেন, থাক, ঠিকানার প্রয়োজন নেই।
আমি যে এতকিছু জানি আপনি কি এতে অবাক হচ্ছেন না।
আমি এত সহজে অবাক হই না। আপনার নাম তো জানা হল না।
দেখা হলেই নাম বলব। এত তাড়া কিসের?
মিসির আলি টেলিফোন নামিয়ে রেখে রশিদ মোল্লাকে বললেন, চলি রশিদ সাহেব। অনেক রাতে আপনাকে বিরক্ত করেছি। কিছু মনে করবেন না।
রশিদ মোল্লা কিছু বলল না। জবুথবু হয়ে বসে রইল। এই শীতের রাতেও তার কপালে ঘাম। সে খুব ভয় পেয়েছে।
আগের বার রশিদ মোল্লা গোট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিল। এবার এল না। দরজা বন্ধ করতেও উঠল না। রশিদ মোল্লার মেয়েটি দরজা বন্ধ করার জন্যে উঠে এসেছে। সে খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে মিসির আলির দিকে। তার বাবার মতো মেয়েটিও ভয় পেয়েছে।
অসম্ভব ঠাণ্ডা পড়েছে! বুদ্ধি করে মাফলার এনেছেন বলে রক্ষা। মাফলার ভেদ করে শীতল হাওয়া ঢুকছে। নাক জ্বালা করা শুরু হয়েছে। ঠাণ্ডা মনে হয় লেগে যাবে। নিউমোনিয়ায় না ধরলে হয়। শরীর দুর্বল। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গেছে। ছোট অসুখই দেখতে দেখতে ভয়াবহ হয়ে যায়।
আজকের রাতের ঘটনায় তিনি তেমন বিস্মিত বোধ করছেন না। বড় ধরনের রহস্যময় ঘটনায় তিনি তেমন বিস্মিত হন না। ছোটখাটো ঘটনাগুলো বরং তাঁকে অনেক বেশি অভিভূত করে। একবার এক রিকশাওয়ালার সঙ্গে ছটাকা ভাড়া ঠিক করে রিকশায় উঠলেন। নামার সময় তাকে একটা পঁচি টাকা এবং একটা দুটাকার নোট দিলেন। দুটাকার নোটটা ছিল পঁচি টাকার নোটের ভেতর। রিকশাওয়ালার তা দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। সে টাকাটা নিয়ে পকেটে রেখে দিল এবং লুঙ্গির খুঁট থেকে একটা এক টাকার নোট ফেরত দিল। মিসির আলি বিষ্ময়ে অভিভূত হলেন। একবার ভাবলেন, রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেন, সে কী করে ঘুঝল পাঁচ টাকার নোটের আঁজে একটা দুটাকার নোট আছে? তিনি শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেন নি। থাক না কিছু রহস্য! সব রহস্য ভেঙে দেওয়ার দরকার কি?
