তবে একটি বিষয় তাকে বড়ই চিন্তিত করে তোলে। এবার কোথায় যাবে, কোথায় তার জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলি কাটাবে? সে জানে, তিন ঘাট দূরে তালগাছের পাশে ডোবার ধারে তার দেশের বাড়িতে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়। সেখানে তার জায়গা কোথায়? গ্রামবাসী দুটি ভাই-এর ক্রমবর্ধমান পরিবার কোথাও একটু ফাঁক রেখেছে কি? তাছাড়া বহুদিন স্টিমার-কোম্পানির চাকুরির উপলক্ষে বাইরে-বাইরে জীবনযাপন করার ফলে পৈতৃক বাড়ির ওপর একদিন যে স্বত্বাধিকার ছিল তা যেন কী করে হারিয়ে ফেলেছে। তা দাবি করা যায় বটে কিন্তু দাবি করার সাহস হবে না। অবশ্য পৈতৃক ভিটার পাশে কিছু জমি কিনে আস্তানা গাড়ার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু কী কারণে তাও সম্ভব মনে হয় না। আসল কথা, ভাইদের সঙ্গে কি পাশে বাস করতে পারবে না। কথাটি আগে পরিষ্কারভাবে ভেবে দেখার অবকাশ হয় নি, প্রয়োজনও পড়ে নি, কিন্তু আজ না-ভেবে উপায় নেই। ভাইদের সঙ্গে তেমন আর মিল কোথায়? এতদিন কোম্পানির চাকুরি করার ফলে তাদের রুচি আর এক নয়। তার বড় ছেলেটা বি.এ. ফেল হলেও পাটের কলে চাকুরি নিয়েছে, মেয়েটাও কিছু পড়াশুনা করেছে, ভাইদের ছেলেমেয়েদের মতো অজ্ঞ মূর্খ বা চাষাভুষা থেকে যায় নি। কয়েক বছর আগে বৃদ্ধা গর্ভধারিণীর মৃত্যু ঘটলে তার দাফন-জানাজার জন্যে খতিব মিঞা সেই যে একবার দেশে গিয়েছিল তারপর আবার যাবার সুযোগ হয় নি, প্রবৃত্তিও হয় নি। হয়তো সে বারই বুঝেছিল সেখানে আর কখনো ফিরে যেতে পারবে না। না, দেশের বাড়ি চিরতরেই ছেড়েছে।
কিন্তু কোথায় যাবে, কোথায়-বা জীবনের শেষ কয়েকটি দিন অতিবাহিত করবে? সে বেশ ভাবিত হয়ে পড়ে, কারণ সপ্তাখানেকের মধ্যে নদীর তীরে কোম্পানির যে বাড়িতে গত পাঁচবছর বসবাস করেছে তা ছেড়ে দেবার পর কোথায় যাবে তা বুঝে উঠতে পারে না। এবার অবসরপ্রাপ্তি ভয়াবহ রূপই ধারণ করে।
যখন খতিব মিঞার মনে হয় যাবার কোনো জায়গা নেই তখনই সহসা সে ভাবে, কোথাও যাবে না, কুমুরডাঙ্গাতেই থেকে যাবে। এ শহরে তার জন্ম হয় নি, বাড়িঘর নেই, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব বলেও কেউ নেই, তবু একনাগাড়ে পাঁচ-পাঁচটি বছর কাটিয়েছে। এ-শহরে থেকে গেলে ক্ষতি কী?
রাতের গুমোট ভেঙে হঠাৎ ঝিরঝিরে হাওয়া বইতে শুরু করে, যে-হাওয়া চিন্তায় টা-হয়ে-থাকা কপালে এসে লাগলে সহসা খতিব মিঞার মনে হয় জ্বর ছেড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আপন মনে বলে, না, কোথাও যাবে না, কুমুরডাঙ্গায় থেকে যাবে, এ-শহরেই কোথাও একটু জমি কিনে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করবে। পূর্বাকাশে যখন প্রত্যুষের ক্ষীণ ধূসর আলো দেখা দেয় তখন খতিব মিঞা মনে-প্রাণে শান্ত বোধ করে, অবসরপ্রাপ্তি আর ভয়াবহ মনে হয় না।
তখন বেশ বেলা হয়েছে। কী খেয়ালে ঈদ-মিলাদের জন্যে শোভনীয় পোশাক পরে, কানের পেছনে একটু আতর লাগিয়ে খতিব মিঞা বেরিয়ে পড়ে কাছারি-আদালত এবং বাজার অভিমুখে, মাথায় ছাতা, পদক্ষেপ ধীরস্থির; অবসরপ্রাপ্ত মানুষের আবার তাড়াহুড়া কিসের? নদীর ধার দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পর পথটি নদীর তীর ছেড়ে হঠাৎ সোজা হয়ে পাকা সড়কের রূপ ধারণ করে, নদীর দিকে কয়েকটি বাড়িঘর দেখা দেয়। তবে কাছারি-আদালতের সামনে পৌঁছুলে সে-সব বাড়িঘর আবার অদৃশ্য হয়ে পড়ে; অদিগন্ত দৃষ্টি ছুটে যেতে আর বাধা থাকে না। তবে নদীর পানে সে তাকায় না; বহুদিন নদীর তীরে বসবাস করেছে বলে নদীতে তার কৌতূহল নেই। তাছাড়া নদীর সঙ্গে তার সম্বন্ধ কি চিরতরে ছিন্ন হয় নি? নদীর দিকে নয়, এবার যে-কাছারি-আদালত এবং তার সামনে যে মাঠটি দেখতে পায় সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে সে এটু ইতস্তত করে থেমে পড়ে, যেন এগুতে কেমন ভয় হয়। তবে শীঘ্র আবার হাঁটতে শুরু করে। মাঠে নাবার আগে আরেক দফা থেমে একটি পান-সিগারেটের দোকান থেকে পান কেনে, একটু ভেবে এক বাণ্ডিল বিড়িও খরিদ করে নেয়। এ-সময়ে সে কয়েক জোড়া কৌতূহলী দৃষ্টি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে, কিন্তু কেউ কিছু না বললে মাঠে নেবে কাছারি আদালতের দিকে রওনা হয়। সে জানে, কাছারি-আদালতের সামনে পরিচিত লোকের অভাব হবে না। এ-শহরে পাঁচ বছর কাটিয়েছে, কত লোক তার হাতে টিকিট কিনেছে, কত লোক তারই সঙ্গে স্টিমারের জন্যে অপেক্ষা করেছে। তবে সে যে-কোনো বিশেষ লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্যে কোনো ইচ্ছা বোধ করে তা নয়। তার মনে হয় কুমুরডাঙ্গার যে-কোনো লোক হলেই চলবে, যা তার বলার সাধ জেগেছে তা কোনো বিশেষ কারো জন্যে নয়, সমস্ত শহরের জন্যে; এ শহরের সকলের মধ্যেই সে কি বাস করবে না? সে। আর কোম্পানির লোক নয়, বিদেশীও নয়, তাদেরই একজন।
বার-লাইব্রেরির নিকটবর্তী হলে খতিব মিঞা বুঝতে পারে তাকে দেখে অদূরে কে যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মুখ ফিরিয়ে দেখে, উকিল আরবাব খান। বয়স বেশি নয়, তবে ইতিমধ্যে আরবাব খান বিচক্ষণ উকিল হিসেবে নাম অর্জন করেছে। কেমন অন্তরবিদ্ধ-করা ধারালো দৃষ্টিতে উকিল তার দিকে তাকিয়ে, স্বাভাবিক নীরস গম্ভীর মুখে একটা বিরূপভাব সুস্পষ্ট। তাকে দেখেই যে উকিলের মুখে বিরূপভাব দেখা দিয়েছে সে-বিষয়ে খতিব মিঞার সন্দেহ থাকে না। স্টিমার-কোম্পানি তাদের প্রতি একটি গুরুতর অবিচার করেছে-এমন একটি ভুল ধারণার জন্যে স্টিমার-কোম্পানি এবং কোম্পানির কর্মচারীদের ওপর শহরবাসীদের মনে যে-রাগ দেখা দিয়েছিল সে-রাগ হয়তো সম্পূর্ণভাবে কাটে নি।
