উকিল কফিলউদ্দিন বিচিত্র কান্নাটি শুনতে পেয়েছিল বলেই সর্পদষ্ট মানুষের মতো বজরা থেকে পা তুলে নিয়েছিল, সেজন্যেই তার চোখ বিস্ফারিত এবং মুখ রক্তশূন্য হয়ে পড়েছিল-সে-বিষয়ে নিঃসন্দেহ হলে কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের মনে পূর্বের। আশঙ্কাটি ফিরে আসে, কী-একটা কথা অস্পষ্টভাবে মনের প্রান্তে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে।
পরদিন ফজরের নামাজের পর হবু মিঞা মুহুরি বাইরের ঘরে বসে ছিল। নিত্য এ সময়ে সে বাইরের ঘরে এসে বসে, রোগ-ব্যাধিতে শয্যাশায়ী না হলে, এ-নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না কোনোদিন। শীতের দিনে গায়ে আলোয়ান, গ্রীষ্মের দিনে নগ্ন গা, মাথার চুল এলোমেলো, ঈষৎ স্ফীত চোখে-মুখে গভীর প্রশান্তি, কিছু বিমনস্কভাব। দিন রাতের মধ্যে এ-সময়টাই তার সবচেয়ে প্রিয়। বাইরের ঘরে তখন ভালোমতো আলো প্রবেশ করে না, তবে যে-অন্ধকার তখনো জমে থাকে তা যেন রাতেরও নয় দিনেরও নয়; সে-অন্ধকার অনেকটা দিঘির গভীর তলদেশের অন্ধকারের মতো। সে-সময়ের নির্জনতাও বিশেষ ধরনের যা মনপ্রাণ দিয়ে উপভোগ করা যায়, কারণ সে-নির্জনতাও যেন রাতের বা দিনের অংশ নয়; সে-নির্জনতার মধ্যে মানুষের মন ধীরে-সুস্থে কোথাও কোনো তাগিদ-তাড়া বোধ না করে দিঘির পানির গভীরে মাছের মতো শ্লথগতিতে অনায়াসে সঞ্চরণ করে। বস্তুত ফজরের এই সময়ে কিছুই সে ভাবে না, এমন কি যে ছেলেটি কোনোদিন আরোগ্য লাভ করবে না তার আসন্ন, অনিবার্য মৃত্যুও তার মনে কোনো ছায়া সঞ্চার করে না।
তবে আজ হবু মিঞা মুহুরির মনে গভীর অশান্তির জ্বালা; কী-একটা কথা সে সমগ্র মন দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করে, কিন্তু সক্ষম হয় না বলে মনে অস্থির-অস্থির বোধ করে।
যখন সে পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে সজ্ঞান হয় তখন সূর্য উঠেছে, ক্ষুদ্র বারান্দা অতিক্রম করে দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে রোদ লুটিয়ে পড়েছে ধুলাচ্ছন্ন ফাটলধরা মেঝের ওপর। নির্জন ঘরেই সে উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে, কান্নাটি শোনামাত্র উকিল সাহেব তার অর্থ বুঝতে পেরেছিল।
উকিল কফিলউদ্দিন কান্নাটির মধ্যে কী দেখতে পেয়েছিল সে-কথা অন্যেরা যখন জানতে পারে তখন তারা বিস্মিত হয় না। সে-কথা তারা নিজেরাই কি জানে না? জানে, সব বোঝে, কেবল একদিন নিজেদের ধোঁকা দেবার চেষ্টা করেছে কারণ এমতক্ষেত্রে আর কী করা যায়? তারা ভাবে কান্নাটি শুনবার জন্যে তাদের আগ্রহের সীমা নেই, তা শুনবার জন্যে অধীর হয়ে রয়েছে, কিন্তু আসলে তা শুনতে পাবে এই ভয়ে তারা কি সদা-সন্ত নয়? তারা ভাবে কান্নাটি শুনতে পেলে কী-একটা অপরূপ ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে, বা মেজর মোছলেহউদ্দিনের মেয়ে সকিনা খাতুন যা বলে তা নিতান্ত উদ্ভট হলেও সম্ভব, বা কান্নাটি কোনোরকমের কানের ভুল কিম্বা বড়জোর একটি দুঃস্বপ্ন। কিন্তু এ-সব কি একটি নিদারুণ সত্য ঢেকে রাখার ফিকিরফন্দি নয়? কিন্তু কতদিন আর ঢেকে রাখা যায়? এ-সব কলাকৌশল বা মন ভুলানোর কারসাজিতে এ-কথা কি ঢেকে রাখা সম্ভব যে শীঘ্ৰ কুমুরডাঙ্গায় ভয়ানক কিছু ঘটবে এবং কান্নার আওয়াজটি তারই পূর্বসঙ্কেত?
কীভাবে, কী বিচিত্র যুক্তির সাহায্যে এমন একটি বিশ্বাস তাদের মনে বাসা বেঁধেছিল কে জানে, কিন্তু এবার তারা সহসা একেবারে নিশ্চিত হয়ে পড়ে যে নদীর দিক থেকে অনেকে যে-কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় তা ভয়ঙ্কর কোনো বিপদের পূর্বসঙ্কেত। হয়তো দুঃখকষ্টে জর্জরিত নিপীড়িত মানুষ তারই অগোচরে কেয়ামত বা এমন কিছু সর্বনাশী প্রলয়কাণ্ডের জন্যে অপেক্ষা করে কারণ চতুর্দিকে যা সে দেখতে পায় তার অস্তিত্বের মধ্যে কোনো অর্থ খুঁজে পায় না, এবং তাই তার ধ্বংসই কমনা করে।
৯. কুমুরডাঙ্গায় শীঘ্র ভয়ানক কিছু হবে
কুমুরডাঙ্গায় শীঘ্র ভয়ানক কিছু হবে, কিন্তু কী হবে? যে-ভয়ঙ্কর বিপদ গুটিগুটি পায়ে কুমুরডাঙ্গার দিকে এগিয়ে আসছে, সে-বিপদের রূপটা কী রকম? তা কি এমন কোনো মহামারী যা সমগ্র শহর উজাড় করে দেবে? বা কোনো মহাপ্লাবন যা দুরন্তবেগে ছুটে এসে মানুষের ঘরবাড়ি গোলা-গোয়াল ভাসিয়ে নিয়ে যাবে? অথবা কোনো প্রচণ্ড ভূমিকম্প যা নিমেষের মধ্যে পায়ের নিচের শক্ত জমিকে বিশালকায় কোনো জন্তুর মুখগহ্বরে পরিণত করবে? কী হবে তা কারো পক্ষে পরিষ্কারভাবে ভাবা সম্ভব হয় না, এবং হয় না বলে আশঙ্কাটি কোনো নির্দিষ্ট আকারের মধ্যেও ধরে রাখা সম্ভব হয় না; সে-আশঙ্কা সকলের মনে যে-গভীর ভীতির সৃষ্টি করে তার মধ্যে সমস্ত চেতনা শুষ্ক ছোবড়ার মতো নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠে।
তারপর কেউ কান্নার কথাটি আর উল্লেখ করে নিঃ কেউ শুনে থাকলেও কথাটি গোপন করে রাখে। এক সময়ে যা শুনতে পাওয়া কারো-কারো নিকট সৌভাগ্যের বিষয় মনে হয়েছে, যা শুনলে গর্বের সঙ্গে সকলকে বলেছে, না শুনলেও শুনেছে বলে মিথ্যা দাবি জানিয়েছে-তা এখন গোপন করে রাখাই তাদের সমীচীন মনে হয়। কে শুনতে চায় সে-কান্নার কথা যে-কান্না কোনো অভাবনীয় প্রলয়কাণ্ডের অগ্ৰধ্বনি, কোনো ধ্বংসলীলার পূর্বাভাস? কেবল কান্নার কথা ঢেকেও কেউ ঢাকতে পারে নি, কারণ সবাই বুঝতে পারে সে-বিষয়ে আকস্মিক নীরবতার মানে এই নয় যে তা থেমে গিয়েছে : বস্তুত কান্নার বিষয়ে আকস্মিক নীরবতায় কান্নাটির আওয়াজ যেন আরো উচ্চতর হয়ে ওঠে, যা ছিল সবিরাম ধ্বনি, যা মধ্যে-মধ্যেই কেবল শোনা যেত, তা অবিরাম ধ্বনিতে পরিণত হয়।
