মুদিখানার কিছু দূরে পথের ডান ধারে সে-পথের একমাত্র ঔষধালয় দেখা যায়। নানা রঙের রহস্যময় পানিতে ভরা বড়-বড় কতগুলি কাঁচের পাত্র, দাওয়াইর শিশি প্যাকেট ইত্যাদিতে সজ্জিত পুরানো কয়েকটা আলমারি, দেয়ালে বিভিন্ন ওষুধের বিজ্ঞাপন-একটি বিবর্ণ ঈষৎ ছেঁড়া বিজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল বিদেশিনী নারী দাঁত বের করে হাসছে আজ ক-বছর ধরে তার ইয়ত্তা নেই-এবং সে-সবের মধ্যে বসে যুগপৎ কম্পাউণ্ডার-ওষুধবিক্রেতা রুকুনুদ্দিন শেখ সকিনার দিকে যখন তাকায় তখন কখনো কখনো তার কথা নয় তার মায়ের কথা সে ভাবে; মুদি যেমন মানুষের হাঁড়ির খবর রাখে সে তেমনি মানুষের নাড়ির খবর রাখে। সে জানে মেয়েটির মায়ের শরীর বড়ই খারাপ, পায়ে ভর দিয়ে একদিন উঠে দাঁড়ায় তো তিন দিন শয্যাশায়িনী হয়। ইদানীং সে-বাড়ি থেকে ওষুধপত্রের জন্যে কেউ আসে নি। মোক্তারের স্ত্রীর চিকিৎসার অবহেলাই হয়ে থাকবে। সে যে সহসা আরোগ্য লাভ করেছে তা সম্ভব নয়; তার ব্যাধি একটি নয়, এবং সর্দিকাশির মতো তুচ্ছ জিনিসও নয়; কোনো-কোনোদিন মুদির দোকানের মালিকের মতো সে সকিনা খাতুনের স্বাস্থ্যের কথাও ভাবে, তবে তার মাজা ভাঙ্গা ধরনের হাঁটার ভঙ্গির মধ্যে দোষের কিছু দেখতে পায় না। সে জানে দৈহিক গঠনের ওপর মানুষের হাঁটার ভঙ্গি নির্ভর করে, কিন্তু মেয়েটি যেভাবে ধীরে-ধীরে নিস্তেজভাবে হাঁটে তাই দেখে তার ধারণা হয়, এখনো সে সুস্থতার বাহ্যিক রূপ নিয়ে চলাফেরা করলেও সহসা একদিন তার স্বল্পপুঁজি স্বাস্থ্য নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং তখন তার মায়ের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে তেমনি নানাপ্রকার রোগব্যাধি দ্বিরুক্তি না করে তাকে আক্রমণ করবে।
তবে সেদিন রুকুনুদ্দিন মেয়েটির স্বাস্থ্যের কথা বা তার অসুস্থ মায়ের কথা ভাবে, বস্তুত ঔষধালয়ে বসে থাকলেও মানুষের জীবন-মরণ ব্যাধি-যন্ত্রণার কথা তার স্মরণ হয় না, কারণ সহসা এমনই স্থানে তার মন নিক্ষিপ্ত হয় যেখানে সবই যেন দুর্বোধ্য, যেখানে কোথাও কুলকিনারাও নজরে পড়ে না।
কুমুরডাঙ্গার একটি লোকই গভীর স্নেহমমতার সঙ্গে সকিনা খাতুনের প্রতি তাকায়: সে মোহনচাঁদ। চা-মিষ্টির দোকানের পর রতন নামক বোবা লোকটির কাঠগোলার পাশে কাপড়ের দোকানগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় যেটি, সেটি মোহনচাঁদের। অনেক দিন আগে ইংরেজ-হিন্দুদের আধিপত্যের সময়ে পশ্চিমের কোনো অঞ্চল থেকে তার পূর্বপুরুষ এ-মফস্বল শহরে এসে গুড়ের ব্যবসা খুলেছিল যা পরে কী-করে থানকাপড়ের ব্যবসায় পরিণত হয়। বংশানুক্রমে তাদের ভাষা স্থানীয় জবানের সঙ্গে এমনভাবে মিশ্রিত হয়ে পড়েছে যে আজ তা না-দেশী না-বিদেশী, না-বাঙলা না-বিহারি মাড়োয়ারী। তবে ভাষাটা জগাখিচুড়ির মতো হলেও মোহনচাঁদ যখন হাঁপর-হাসি হেসে শ্লেষ্মঘনকণ্ঠে কিছু বলে তখন তার মনোভাব বুঝতে কারো বেগ পেতে হয় না এই কারণে যে প্রতিটি শব্দ যেন গোলাবারুদের মতোই নিঃসৃত হয় তার মুখ থেকে। যে মানুষের পিতা-পিতামহ হরি-হরি করে ভাজন গান ধরে সকালে দোকান খুলত, তাদেরই বংশধর কোনো-কোনোদিন সে-গানের সুরে বা কথায় কোনো পরিবর্তন না এনে কেবল হরির স্থলে খোদার নাম বসিয়ে শুভকাজ শুরু করে। সেদিন তার উদাত্ত কণ্ঠ দোকানপাটের রাস্তার এ-মাথা থেকে সে-মাথা পর্যন্ত শোনা যায়। মধ্যে-মধ্যে মস্ত মস্ত ফোকলা দাঁত দেখিয়ে দিলদরিয়াভাবে হেসে সে বলে, লোকেরা যেন তাকে মোহনচাঁদ নয়, মামুনচাঁদ বলেই ডাকে। কিন্তু সে-নাম কারো মুখে আসে না : লোকটির বিশাল দৈহিক আকারে এবং তার মুখের খাঁজে-খাজে যে-শাশ্বত প্রাচীনতা অপনেয়ভাবে লিখিত-তা উপেক্ষা করা সহজ নয়।
সকিনা খাতুন যখন দোকানের সামনে দেখা দেয়, তার ঘণ্টাকয়েক আগেই মোহনাদ লোহার বেড়ি-দেয়া কাঠের মস্ত দরজা খুলে বহুব্যবহৃত শীতলপাটিতে আবৃত প্রশস্ত চৌকিতে আসনাধীন হয়ে বসেছে। মধ্যে-মধ্যে বেশ সকালেই তার দোকানে খদ্দেররা এসে উপস্থিত হয়। মামলা-মকদ্দমার জন্যে শহরে উপস্থিত গ্রামবাসীদের অনেকে আদালত বসার আগে কেনাকাটা করে ফেলতে চায়। তবে খদ্দের-পরিবেষ্টিত থাকলেও সকিনা খাতুন থানকাপড়ের দোকানের মালিকের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে না। দেড় বছর আগে মেয়েটি যখন প্রথম এ-পথে দেখা দেয় তখন মোহনাদের মনে হয়েছিল, সে যেন ইঁদুরের ছা, এবং পরদিন মোহনচাঁদ যখন জানতে পারে সে স্কুলে পড়তে না গিয়ে পড়াতে যায় তখন তার বিস্ময়ের অবধি থাকে নি। কথাটি সে যথাসময়ে তার স্ত্রীকেও বলেছিল, এবং দোতলা-বাড়ির ওপর তলার জালি-ঢাকা জানলা থেকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তার স্ত্রীও বিস্মিত না হয়ে পারে নি, হয়তো স্বামীর মতো মেয়েটির প্রতি একটা দরদভাবও সে বোধ করে তখন। মোহনচাঁদের স্ত্রী তার স্বামীর মতো বিশালকায় নারী; তার উচ্চপ্রশস্ত কাঠামোর ওপর নিয়মিতভাবে অকৃপণ। মাত্রায় মেদের সঞ্চার চলছে বলতে গেলে আজন্ম থেকে, যার মাত্রা যৌবনোত্তরকালে আরো বেড়ে যায়। তার বিশাল নরম দেহে কিন্তু স্নেহের অন্ত নেই।
একদিন মোহনচাঁদ স্থির করে মেয়েটিকে একটি শাড়ি উপহার দেবে। মধ্যে-মধ্যে শহরের নেতৃস্থানীয় লোকদের দু-একটা শাড়ি বা কিছু থানকাপড় দিয়ে থাকে। কখনো সরাসরিভাবে উপহার হিসেবে দেয়, কখনো আবার বাকিতে দিয়ে পয়সার কথা আর তোলে না; কোনো-কোনো মানুষের বিবেকের জন্যে শেষোক্ত উপায়ে উপহার গ্রহণ করা সহজ। একদিন মোহনাদ সকিনা খাতুনের জন্যে একটি টুকটুকে লাল শাড়ি তুলে রাখে এবং বিনা মতলবে নিঃস্বার্থভাবে কাউকে কিছু উপহার দেবে এ-কথায় গোপনে গোপনে বেশ পুলকিত বোধ করে। তবে কীভাবে মনষ্কামনাটি পূর্ণ করে তা বুঝতে না পারলে শেষ পর্যন্ত শাড়িটা দেওয়া হয় নি। মেয়েটা যদি কিছু মনে করে, বা ফিরিয়ে দেয়? অকারণে উপহার দেওয়া যেন শক্ত কাজই। কারণ যে নেই তা নয়, কিন্তু কারণটা বলা যেন কঠিন : মেয়েটিকে এ-পথ দিয়ে যেতে দেখি প্রতিদিন। আহা, ছোট এইটুকু মেয়ে মাষ্টারনিগিরি করে, কেমন মায়া হয়। তারপর গ্রাম থেকে এক জোতদার এসে শাড়িটা কিনে নিয়ে গেলে সেখানেই ব্যাপারটা শেষ হয়। তবে সাময়িকভাবে, কারণ সম্প্রতি আবার খেয়ালটা ফিরে এসেছে। একটা শাড়িও হাতে পেয়েছে যা মেয়েটির কথা মনে করে খদ্দেরের সামনে বের করে নি এখনো : মিহিন সুতার শাড়ি, হাল্কা নীল রঙ, রক্তজবার মতো লাল পাড়।
