আবার বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর সহসা সে দেখতে পায় অন্ধকারের মধ্যে সামনে বৃহৎ ঘন-কালো কিছু একটা দাঁড়িয়ে : কালোর ওপর কালোর প্রলেব-এমন কালো যার চেয়ে আর কালো কল্পনা করা যায় না। তবে বস্তুটি তার চিনতে দেরি হয় না। সেটি মুক্তাগাছি গ্রামের প্রসিদ্ধ বটগাছ। চাঁদবরণঘাটে বাস করার সময় সমবয়সী বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মধ্যে-মধ্যে দুই ক্রোশ পথ হেঁটে ঐ গাছটি দেখতে আসত। গাছটি যে প্রকাণ্ড শুধু তাই নয়, লোকদের ধারণা তার বয়স কয়েক শত বছরের কম নয় : কত রাজরাজ্যের উত্থানপতন হয়েছে, কত নদী পুরাতন খাত ছেড়ে নূতন খাতে ধারা স্থানান্তরিত করেছে, যত ঝড়ঝঞ্ঝা তুফান বয়ে গিয়েছে, সে-গাছটির কিছু হয় নি, সময়কাল উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থেকেছে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে। গাছটির প্রাচীনতাই ছেলেদের আকর্ষণের কারণ ছিল। স্কুলে পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পাঠ্য পুস্তকে পড়েছিল, গাছপালাউদ্ভিদ জড়পদার্থ নয়, তাদের প্রাণ আছে, তার জীবজন্তুর মতো ক্ষুধাতৃষ্ণা বোধ করে, নিবৃত্ত করে, নিদ্রা যায়, নিঃশ্বাস নেয়। মুহাম্মদ মুস্তফা এবং অন্যান্য ছেলেদের মনে হত, গাছপালার চোখ-কানও থেকে থাকবে, এবং ঘনপল্লবের আব্রুর ভেতর থেকে তারা নীরবে সব কিছু দেখে, শোনে। যে গাছ শত শত বছর ধরে জীবিত সে-গাছ যুগে-যুগে কত কিছু না দেখেছে শুনেছে। বৃহৎ বটগাছটির স্নিগ্ধশীতল গভীর ছায়ার নিচে এসে দাঁড়ালে তাদের মন নিমিষের সুদূর অতীতে চলে যেত, ঘনপাতার অস্ফুট মর্মরধ্বনির মধ্যে শুনতে পেত সে-সব মানুষের হাসি-কান্না যারা কবে কোন কুক্কটিকাময় রঙ আকারহীন দিনে জীবনের খেলা সাঙ্গ করে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। তারপর গাছটি দেখার সুযোগ হয় নি, কারণ বাপ খেদমতুল্লার মৃত্যুর পর। চাঁদবরণঘাট ছেড়ে চলে গিয়েছিল বলে এ-পথে আর আসে নি। তবু অনেকদিন সেটি তার মনে কেমন ছায়া বিস্তার করে রেখেছিল।
বৃষ্টি তখনো থামে নি, তবে ধারাটি মিহিন হয়ে উঠেছে। হয়তো বটগাছটি তাকে তার বাল্যজীবনের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয় বলে অনেকটা যন্ত্রচালিতের মতো গাছটির দিকে এগিয়ে যায়, তারপর তার তলায় পৌঁছে অল্প সময়ের জন্যে সেখানে দাঁড়াবার লোভ সম্বরণ করতে পারে না বলে একটু ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে পড়ে, এ-সময় ভিজে কাপড়চোপড় সহসা ক্ষিপ্রগতিতে যতখানি সম্ভব নিঙড়েও নেয়।
কয়েক মুহূর্ত এমনিভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর সহসা একটি কথা তার মনে পড়ে, যে-কথা তাকে প্রচণ্ড আঘাতই দেয়। তবে সে কি কালু মিঞার বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হয় নি? বটগাছটি, তারপর পাঁচ-কোণা পানিতে টুইটুম্বর পুকুরটি, ওপাশে যে বাহিরঘর এবং তার পশ্চাতে যে-আটচালা অঘর এবার অন্ধকারের মধ্যেও পরিষ্কার দেখতে পায়, সে-সব কি কালু মিঞার সম্পত্তি নয় যে-কালু মিঞার নাম বাপ খেদমতুল্লার মৃত্যুর পর প্রায়ই শুনতে পেত? লোকেরা, বিশেষ করে বাড়ির লোকেরা বলত কালু মিঞাই বাপ খেদমতুল্লাকে খুন করেছিল এই কারণে যে লোকটি কলাকৌশলে অসদুপায়ে অন্যায়ভাবে যে-সব জায়দাদ জোতজমি আত্মসাৎ করেছিল। সে-সব জায়দাদ-জোতজমি থেকে তাকে বঞ্চিত করতে উদ্যত হয়েছিল বাপ খেদমতুল্লা।
মুহাম্মদ মুস্তফা বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে, তার মনে হয় কিছুই যেন বুঝতে পারছে।। তবে সে কি তারই অজান্তে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল? সে যে ভেবেছিল ঠিক পথেই হাঁটছে, এমন-কি এক-সময়ে হাতলিয়া গ্রামটিও চিনতে পেরেছে-সবই কি ভুল? তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখে সে। না, নিঃসন্দেহে সে ঘোর ঝড়-বৃষ্টিতে এবং দ্রুতগত রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছিল, কারণ কালু মিঞার বাড়িঘর পুকুর সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ থাকলেও সমগ্র অঞ্চলের সুপ্রসিদ্ধ বটগাছটি সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র দ্বিধা অনিশ্চয়তার অবকাশ নেই।
আরো কয়েক মূহুর্ত দাঁড়িয়ে থাকার পর মুহাম্মদ মুস্তফা কিছু প্রকৃতিস্থ হয়, এবং তখন একথাও বুঝতে পারে যে সে স্থানে এমনভাবে আর দাঁড়িয়ে থাকা সমীচীন হবে না। চতুর্দিকে নীরবতা, বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। এবার ভেজা মাটির ভেজা ঘাস লতাপাতার সোঁদালো গন্ধ তার নাকে এসে লাগে। সে সহসা সজোরে একবার নিঃশ্বাস নেয়।
বটগাছের আশ্রয় ত্যাগ করবে এমন সময়ে মুহাম্মদ মুস্তফা হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পায়। কখন তারই অজান্তে সে পুকুরের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, যেন ওপাশে বাড়িঘরের দিকে তাকাবার সাহস নেই। এবার সভয়ে ওপাশে তাকালে প্রথমে অন্ধকারের মধ্যে শূন্য মাঠে আলেয়ার মতো কিছু দেখতে পায়, তারপর মানুষের মূর্তির মতো অস্পষ্ট কী-একটা ছায়াও নজরে পড়ে। ততক্ষণে আকাশটা কিছু পরিষ্কার হয়ে উঠে থাকবে, কারণ আকাশের মধ্যখানে কতকগুলি ঝর্মকে তারা দেখা দিয়েছে যেন। তবে নীরবতা মাত্রাতিরিক্তভাবে গম্ভীর হয়ে উঠেছে। মুহাম্মদ মুস্তফা সে-নীরবতার মধ্যে এর খসরুদ্ধ করে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শূন্য মাঠে আলেয়ার দিকে, মানুষের মূর্তির মতো ছায়াটির দিকে। হয়তো বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটে আলেয়াটি এবং ছায়াটি নিশ্চল। তারপর এক সময়ে সে বুঝতে পারে সামনে কোনো শূন্য মাঠ নেই। এবার কালু মিঞার বাহিরঘর, পশ্চাতে মস্ত আটচালা বাড়ি-সে-সব সহসা অতি নিকটেই মনে হয়। আলেয়াটি আলেয়াও নয়, কুপি মাত্র, এবং কুপিটি ধরে একটি লোক দাঁড়িয়ে।
